ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

গত পরশুর একটি খবর মনটাকে যুগপৎ আনন্দিত এবং ক্ষুব্ধ করল। খবরটা হল গত মাসে (ডিসেম্বর ২০১১) আমাদের দেশে এযাবতকালের সবচাইতে বেশি (রেকর্ড) রেমিট্যান্স এসেছে, যার পরিমাণ ১১৪ কোট ৪৪ লাখ ডলার। আনন্দিত হবার কারণটা সবাই অনুমান করতে পারছেন নিশ্চয়ই; ক্ষুব্ধ হবার কারণটা এবং পোষ্টের শিরোনামে কথ্য প্রবচনটা কেন লিখেছি সেই ব্যাখ্যা করছি পরে।

আমরা সবাই জানি এই দেশের বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের প্রধান খাত রেমিট্যান্স। যার পরিমান রেডিমেড গার্মেন্টসের চাইতেও বেশ খানিকটা বেশি। একটা তথ্য কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে দেশের জন্য গার্মেন্টসের চাইতে রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলার অনেক বেশী মূল্যবান। এর কারন – মূল্য সংযোজনের পরিমাণ। খরচ/বিনিয়োগ বাদ দিয়ে এই হার গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ; আর রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে এটা ৭৫-৮০ শতাংশ পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় ধরে এই খাতটি আমাদের গরীব দেশের গরীব অর্থনীতিটাকে রক্তসঞ্চালন করে বাঁচিয়ে রেখেছে।

গ্রামের সাথে আমার যোগাযোগ খুব কম। তিন বছর আগে (আগের বারের প্রায় ৭/৮ বছর পরে) আমি গ্রামের বাড়ি গিয়ে অবাক বিষ্ময়ে দেখি আমাদের গ্রামে অনেক নতুন পাকা-আধাপাকা বাড়ি, বাজারে দারুন সব নতুন দোকানে নানা রকম পণ্য। বিকেলে বাজারে আসা মানুষদের পোষাক, মোবাইল ফোন নিশ্চিতভাবেই মানুষদের স্বচ্ছলতা প্রকাশ করছিল। একটা এলাকায় মধ্যবিত্ত/নিম্নমধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক উন্নতির ফল (কম হলেও) স্বাভাবিকভাবেই হত দরিদ্র মানুষগুলোর কাছেও পৌঁছায়। আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম দিনমজুররাও এখন ভাল মজুরি পান; এমনকি ফসল কাটার মৌসুমে নাকি দিনমজুর পাওয়াও বেশ কঠিন হয়। না, ৭/৮ বছরের ব্যবধানে আমাদের গ্রামের এই আশ্চর্যজনক অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোন এনজিওকে দিয়ে হয়নি; হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া মানুষদের টাকায়। আমার গ্রামের এই চিত্র এই দেশের অজস্র গ্রামের। বৈদেশিক মূদ্রার হিসাবের বাইরেও এই দেশের গ্রামীন অর্থনীতি কী অসাধারনভাবেই না পালটে দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী এই মানুষগুলো!

এতো গেলো প্রাপ্তির কথা; কিন্তু আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি যে এই প্রাপ্তি কী ভীষণ বড় মূল্যে কেনা? এই দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ দেশের বাইরে থাকেন। আশেপাশের অনেক দেশের তুলনায় ৪/৫ গুন বেশী টাকা খরচ করে, ধার-দেনা করে, জমিজমা বেচে (এমনকি অনেক সময় ভিটেমাটিও) তাঁরা বিদেশে যান। ওখানে গিয়ে বেতন কম পাওয়া, সঠিক সময়ে না পাওয়া, মালিকদের দিয়ে অত্যাচারিত হওয়া, মানবেতর পরিবেশে বসবাস করা, চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়া, বিকলাঙ্গ হলে ক্ষতিপূরণ না পাওয়া, মৃত্যু হলে লাশ পেতে সমস্যা হওয়া – তাঁরা কোন সমস্যাটার মুখোমুখি হন না? এটা আর বিস্তারিতভাবে লিখছি না – এসব আমরা কম বেশী সবাইই জানি।

কিন্তু দেশের এই মানুষগুলোর প্রবাস যাপন করার সামাজিক প্রভাব কি আমরা ভেবে দেখেছি কখনো? পরিবার পরিজন ছেড়ে এই মানুষগুলো বহু দূরে থাকে – এদের দাম্পত্য জীবন বলে কি কিছু আছে? আছে ন্যুনতম স্বাভাবিক যৌন জীবন? বিয়ে করে কিছুদিন থেকে চলে যান বিদেশে – বছরে/দুই বছরে একবার দেশে আসেন। দেশে এঁদের কারো কারো স্ত্রী জড়িয়ে পড়েন অনৈতিক সম্পর্কে; বেশীরভাগই জড়ান না – কিন্তু এই ‘অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা’ তাঁদের নানা রকম শারীরিক-মানসিক ব্যাধি সৃষ্টি করে।

এদিকে বিদেশে কর্মরত কর্মীদের অনেকেই যৌনকর্মীদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে এইডস সহ নানা যৌনবাহিত রোগ নিয়ে দেশে আসেন। তারপর সেটা ছড়িয়ে দেন স্ত্রীদেরকেও। বিশেষ করে এই বিদেশে কাজ করা কর্মীদের দ্বারা এইডস ছড়ানোতো আমাদের দেশের জন্য ভবিষ্যতে বিরাট মাথাব্যাথার কারন হয়ে উঠতে পারে। আর বেশীরভাগই হয়তো যান না যৌনকর্মীদের কাছে, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রেও ‘অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা’ একই রকম প্রভাব ফেলে। আর একটা সংসার জীবনের মানসিক সুখের কথাতো বলাই বাহুল্য।

বাবা দূরে থাকায় এঁদের সন্তানেরা বাবার স্নেহ পায় না। বাবার নিয়ন্ত্রন এবং শাসনের বাইরে থেকে অনেকেই বখে যায় পুরোপুরি। বিদেশ থেকে পাঠানো নগদ টাকা এদের অনেককে মাদক আর জুয়ায় আসক্ত করে তোলে। অনেকেই অকর্মন্য হয়ে যায় – নিজের উপযোগী একটা ক্যারিয়্যার তৈরী করতে পারে না অনেকেই। এমন আরো অনেক সামাজিক সমস্যার উদাহরণ দেয়া যায়।

আমাদের এই রাষ্ট্র এঁদের পাঠানো প্রতিটা ডলার কী ভীষণ মূল্য দিয়েই না পায়! নিজেদেরকে আক্ষরিক অর্থেই উৎসর্গ করছেন তাঁরা। আমাদের দেশের সত্যিকারের হিরো তো এঁরাই। কিন্তু না, এই রাষ্ট্রের কোন সরকারের এটুকু ন্যুনতম মানবিকতা ছিল না যে তারা সেটা বুঝবে, অনুভব করবে। তাই, অনেক কিছু দিয়ে ভরিয়ে দেয়া তো দূরেই থাকুক, তাদের প্রতি ন্যুনতম সহানুভূতি, সহমর্মিতাও দেখানো হয়নি, হয় না।

বিমানবন্দর দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় তাদের নানা হয়রানির কথা আমরা প্রতিনিয়ত শুনি, বিদেশে সমস্যার সময় ন্যুনতম সহযোগীতা পান না বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে, যদিও এদেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় ভীষণ ব্যায়বহুল এই দূতাবাসগুলো চলে প্রবাসীদেরকে ‘সেবা’ দেয়ার জন্য। তারা দেন হয়তো চেহারা দেখে, ধনীদের; এদেরকে দেন না। দূতাবাস কর্মকর্তারা তো আবার বিসিএস এ প্রথম দিকে থাকা মানুষ; এদের কথা ভাবতে তাদের বয়েই গেছে! বিদেশে যাওয়ার খরচ কমানোর দাবী তো ভীষন কল্পনাবিলাসীতা।

মজার ব্যাপার হোল এত বঞ্চনার পরও এই মানুষগুলো কিন্তু এখন ব্যাংকিং চ্যানেলেই প্রায় সব টাকা পাঠান। হুন্ডিতে পাঠালে দেশের ক্ষতি হলেও তাঁদের নিজেদেরতো লাভ হোত। কিন্তু নিজের ক্ষতি করে এই ‘বোকা’ মানুষগুলো ব্যাংকিং চ্যানেলেই টাকা পাঠান। আর এতেই তো কাজ হয়ে যায় আমাদের সরকারগুলোর। হাতে মহামূল্য বৈদেশিক মূদ্রা পাওয়া তো হয়েই গেছে; এবার ওরা মরুক আর বাঁচুক, গোল্লায় যাক তাতে সরকারের কি আসে যায়? গাঙ তো পার হওয়া গেছেই; এবার মাঝি তো শালা হবেই।

পুনশ্চঃ এই লিখাতে আমি ইউরোপ, আমেরিকা-কানাডা প্রবাসীদেরকে যুক্ত করিনি, কারণ সামাজিক মানদন্ডে অনেক উঁচুতে অবস্থান করেন বলে এতো বঞ্চনার শিকার তাঁরা হন না। আর এঁদের অনেকে দেশে টাকা পাঠালেও অনেকেই বরং দেশের শেষ সম্পদটি বিক্রি করে পরিবার নিয়ে বিদেশে স্থায়ী হন – দেশে সম্পদ আসা তো দূরেই থাকুক এঁদের কারণে দেশের সম্পদ বিদেশে চলে যায়।