ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

আজ সকালে দেখলাম সর্বজনঘৃন্য গোলাম আজম গ্রেফতার হয়েছে। ভীষন আনন্দের খবর আমাদের জাতির জন্য – ৪০ বছর পরে হলেও এই জাতি এই লোকটিকে অন্তত কারাগারে যেতে দেখলো। আমিও উচ্ছ্বসিত এই ঘটনায়, তবে এই ব্লগের আরো কয়েকজন ব্লগারের মত আনন্দের আতিশয্যে আমি ভেসে যাচ্ছি না। কেন সেটা ব্যাখ্যা করছি পরে।

আমার বাবা কর্ণফুলী পেপার মিলে চাকুরী করতেন। আমি জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি ওখানেই – রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই থানার চন্দ্রঘোনায়। আমাদের স্কুলটা ভাল হলেও, এলাকার কলেজটি ভাল ছিল না একদমই। তাই আমি এইচ,এস,সি পর্যায়ের কলেজে পড়েছি চট্টগ্রাম শহরে। এই ভূমিকাটুকু দরকার ছিল আসলে একটা বাসের কাহিনী বলার জন্য।

চট্টগ্রাম থেকে চন্দ্রঘোনায় আসা যাওয়ার বাসগুলো ছিল একেবারে আক্ষরিক অর্থেই ‘মুড়ির টিন’। মুড়ির টিনের মতোই ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে দাঁড়াবার ন্যুনতম যায়গা ফাঁকা থাকা পর্যন্ত ওগুলোয় যাত্রী তোলা হোত। আবার ওগুলো ছাড়ার নির্দিষ্ট কোন সময়ও ছিল না – একটা ভর্তি হয়ে ছাড়ার পর পেছনেরটা যাত্রী তুলতে শুরু করতো। তো বাসে বেশ কিছু যাত্রী উঠে যাবার পর সবাই মিলে চালককে বাস ছাড়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করতো। মজাটা শুরু হোত তারপর।

ড্রাইভার একবার উঠে বাসের ইঞ্জিন ষ্টার্ট দিতো – লোকজন কিছুক্ষনের জন্য শান্ত হোত। কিন্তু না, বাস চলতে শুরু করতো না। আবার যাত্রীদের চ্যঁচামেচি শুরু হয়ে যেত। চ্যঁচামেচি বাড়লে ড্রাইভার বাসটাকে কিছুক্ষন সামনে পেছনে আনা-নেওয়া করতো। যাত্রীরা একটু শান্ত হোত। কিন্তু না, এবারো বাস চলতে শুরু করতো না। আবার যাত্রীদের চ্যঁচামেচি – এবার বাসটি শম্বুকগতিতে চলে ১৫/২০ ফুট চলতো, তারপর আবারো থেমে পড়তো। আবারো যাত্রীদের …… কী ‘অসাধারণ দক্ষতা’য় ওই বাসের চালকরা যাত্রীতে ‘টইটম্বুর’ হবার আগ পর্যন্ত বাস ছাড়তো না!

আজ গোলাম আজমকে গ্রেফতারের পর আমার অনেক আগের স্মৃতির ঐ ‘মুড়ির টিন’ বাসগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সমস্যা এবং নানা অনিয়ম নিয়ে বেশকিছুদিন থেকে বেশ শোরগোল উঠছিল চারদিক থেকেই। আমি নিজেও একটা পোষ্ট লিখেছিলাম এটা নিয়ে (লিঙ্ক http://blog.bdnews24.com/Zahed/58020) সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম সহ ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটির নেতার এই বিচার নিয়ে নানা টালবাহানা, অদক্ষতা, আর অমনোযোগীতা নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেছিলেন বেশ খোলাখুলিভাবেই। সেই চাপই কি সরকার সামাল দিল গোলাম আজমকে গ্রেফতার করে?

আসলে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে ঐ ‘মুড়ির টিন’ বাসের গল্পই দেখছি শুরু থেকেই। ঐ ‘মুড়ির টিন’ বাসের যাত্রীদের মতোই এই দেশের অনেক মানুষ কিছুদিন পর পরই চ্যাঁচামেচি করে ওঠেন কয়েকদিন পর পর আর ওই চ্যাঁচামেচির পর সরকার একটা করে পদক্ষেপ নেন ঐ বাস চালকের মত। এই যেমন মাত্র কয়েকদিন আগে সিদ্ধান্ত নিল আরেকটি ট্রাইব্যুন্যাল গঠন করার – অথচ আমি জনাব শাহরিয়ার কবীরের মুখে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দাবী শুনে আসছি।

এই বিচার শেষ করার জন্য আর খুব বেশী সময় নেই সরকারের হাতে। বাকী ২ বছর সময়ের শেষ বছরটি কিন্তু নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে হারিয়ে যাবে। সামনের এক/দেড় বছরের মধ্যে এই বিচার শেষ করার মত যথেষ্ট অগ্রগতি এবং দক্ষতা কি এই ট্রাইব্যুন্যালের আছে? নাকি এটা এবার শেষ না হয়ে আবার আগামী নির্বাচনেরও ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

আসলে নানা গুজব চারদিকে ভাসে। নানা কায়েমী স্বার্থবাদীরা তো আছেই এই বিচারকে পন্ড করার জন্য। আর গুজব ডালপালা মেলার জন্য কিন্তু একটা ঘোলাটে পরিবেশ লাগে। এই ঘোলাটে পরিবেশটা কিন্তু সরকারের ব্যার্থতায়/অবহেলায়ই তৈরি হয়েছে। শুরু থেকেই সব কিছু নিয়ে সরকারের স্বচ্ছতা, কর্মোদ্দীপনা জনগন দেখলে গুজব এমন ডালপালা মেলতো না।

তাই আমি মনে করি এই মুহুর্তে আমাদের আসলে সরকারকে ধন্যবাদ দেয়ার সাথে সাথে সরকারের ওপর এই বিচার শেষ করার চাপটা জারি রেখে যেতে হবে। আমি ঠিক এই কারণেই আনন্দের আতিশয্যে ভেসে যাচ্ছি না – ভাসবো সেদিন যেদিন এই ঘৃন্যতম অপরাধীগুলোর বিচার সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে এটা দেখবো। আমাকে হতাশাবাদী মানুষ মনে হচ্ছে? না, আমি হতাশাবাদী মানুষ নই, তবে ব্যাপারে হতাশ বোধ করি অনেক সময়ই। আর হতাশার যৌক্তিক কারন থাকলেও যারা হতাশা বোধ করেন না, তারা স্বপ্নবিলাসী মানুষ। স্বপ্নবিলাস ব্যক্তিকে শান্তি দিতে পারে, সমস্যার সমাধান কিন্তু করে না।

আমার গল্পের ‘মুড়ির টিন’ বাসের চালক যাত্রীদের ক্রমাগত চ্যাঁচামেচিতে বাসকে সামনে-পেছনে নাড়াচাড়া করে যাত্রীদের কিছু সময়ের জন্য শান্ত রাখতো – বাস ছাড়তো কিন্তু তার সময় মতোই, তার স্বার্থ/ইচ্ছে মতোই। আমার ভীষন আশংকা আমরা যতোই চ্যাঁচামেচি করি না কেন এই বিচার দেরীতে শেষ করা/না করার ক্ষেত্রে সরকারের যদি কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকে তবে সেটা সরকার করবেই।

তাহলে কি আমরা চ্যাঁচামেচি থামিয়ে দেব? না। বরং ওটা আমরা আরো বাড়াবো যেন সরকার এই ইস্যুতে সব দিক থেকে তার ওপর ক্রমাগত চাপ অনুভব করে যায়। সেই চাপ যেন এই বিচারকে শেষ করতে বাধ্য করে সুষ্ঠুভাবে। না হয় গোলাম আজম জেলে যাওয়ার আনন্দ হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে অচিরেই; জেলের ভেতরে মরে না গেলে একদিন বীরদর্পে ফুলের মালা গলায় দিয়ে বেরিয়ে এসে আবার সে দেশের মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেবে যে দেশের জন্ম ঠেকানোর জন্য সে ইতিহাসের ঘৃন্যতম অপরাধগুলো করেছিল।