ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

মানুষ বিচিত্র প্রানী – কাকে সে সন্মান করবে, শ্রদ্ধা করবে বা করবে না; করলে কেন করবে, আর না করলে কেন করবে না সেটা অনেক সময় ন্যুনতম যুক্তিবোধ, মানবিক চিন্তা দিয়ে চালিত হয় না। আর সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিষয়গুলোকে আমরা অনেকেই একরকম তর্কাতীত, সঠিক ব্যাপার বলে ধরেই নেই।

শকুন আর হায়েনা আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে এক রকম ঘৃণিত প্রাণী হিসাবে বিবেচিত। কারণটা হোল, এই প্রানী দু’টি নোংরা, ভয়ঙ্কর – এরা মরা, পচা প্রাণী খায়। এজন্য এরা অনেক সময়ই ব্যবহৃত হয় গালি হিসাবে; ব্যবহৃত হয় অমঙ্গলের প্রতীক হিসাবে দৈনন্দিন জীবনযাপনে, সাহিত্যে, সিনেমায়।

কিন্তু এরা কি আমাদের সন্মানের প্রানী হবার কথা ছিল না? এরা কি আমাদের জন্য ভীষণ প্রয়োজনীয় একটা কাজ করে দেয় না? এরা প্রাকৃতিক ‘স্ক্যাভেঞ্জার’ – মরা-পচা প্রাণী খেয়ে বেঁচে থেকে এরা আমাদের পরিবেশ রাখে পরিচ্ছন্ন। কিন্তু পরিনামে এদের কপালে জোটে শুধুই ঘৃণা, ধিক্কার।

আমি স্কুলে পড়ার সময় বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন গ্রামে যেতাম তখনো আমাদের গ্রামে বেশ কিছু শকুন দেখা যেত পুকুর পাড়ের বড় বড় গাছগুলোতে। আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ে যে প্রথম যখন আমাকে এই পাখিগুলো চেনানো হয়, তখন এদেরকে নোংরা, ভয়ঙ্কর প্রাণী হিসাবে আমার কাছে পরিচিত করানো হয়। এখন আর এদেশে শকুন দেখা যায় না খুব একটা – গরুর এক ব্যাথানাশকের জেরে আজ এরা বিলুপ্তপ্রায়। কোন জোর চেষ্টাও নেই ওই ওষুধ নিষিদ্ধ করার জন্য। নাকি এদের মরে যাওয়ায় আমরা খুশিই হচ্ছি – আমাদের চারপাশ এই ‘নোংরা’ প্রানিমুক্ত হয়ে উঠছে! শকুন নিয়ে লিখবো আরেকদিন; আজকের লিখায় ওদের কথা আসলো ‘দলিত’দের কথা প্রসঙ্গে।

কবীর সুমনের একটা গান আছে “দশ ফুট বাই দশ ফুট”। দশ ফুট বাই দশ ফুট একটা কামরায় একটা পুরো পরিবারের জীবন-যাপন করা নিয়ে গানটা। ভীষণ অবাক হয়ে গানটা শুনতাম আর ভাবতাম এমন জীবনযাপনও করতে হয় ওখানকার কিছু মানুষকে! কিন্তু এই গল্পতো আছে আমাদের দেশেও। হ্যাঁ, আমি দলিত (অচ্ছুৎ) দের কথা বলছি – আমাদের চারপাশে কাজ করা ‘সুইপার’ আর ‘মেথর’এর কাজ করা মানুষ এঁরা। এঁদের সম্পর্কে জানতাম ভাসা ভাসা, বিস্তারিত না; কয়েকদিন আগে একটা পত্রিকায় পড়লাম একটু বিস্তারিতভাবে, জানলাম নতুন কিছু তথ্য। এই দেশের প্রতি ক্ষেত্রে জমে আছে কত ভয়ঙ্কর সব বঞ্চনার গল্প! আমাদের সময় কৈ তার খবর নেবার?

ঢাকায় ‘সুইপার কলোনী’র বাসার মাপটা অবশ্য ‘দশ ফুট বাই দশ ফুট’ নয়; একটু বেশী – ‘দশ ফুট বাই বার ফুট’। এই ২ ফুট জায়গাও কতোটা অমূল্য সেটা বুঝবো আমরা যদি এটা জানি যে এমনও অনেক কামরা রয়েছে যেখানে পিতা-মাতা, অবিবাহিত সন্তান, আর বিবাহিত পুত্র তার স্ত্রী নিয়ে থাকেন! কেউ কেউ যদি কোনভাবে কিছুটা বাড়তি আয়ের ব্যাবস্থা করে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া করতে চান, সত্যিকার পরিচয় দিলে তাঁরা সেটা পান না। এমনকি এঁদের বাড়িতে কোন ‘ভদ্রলোক’ গেলে বসেনও না।

এঁদের সন্তানদের জন্য কিছু এনজিও স্কুল পরিচালনা করে; ওরা পড়তে পারে না বাইরের কোন স্কুলে। অবশ্য আমরা অনেক চালাক, ওই শিশুগুলো ভাল শিক্ষায় শিক্ষিত, যোগ্য হয়ে উঠলে আমরা কৈ পাবো আমাদের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার লোক? সেই বৃটিশ আমল থেকে এরাইতো এই কাজ করে যাচ্ছে বংশ পরম্পরায়; করে যাবেও। প্রশ্নটা এই কাজ করা নিয়ে নয়, প্রশ্নটা অন্য জায়গায় – সেখানে পরে আসছি।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় এই দলিত (অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য) মানুষের সংখ্যা এই দেশে প্রায় অর্ধ কোটি, যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সারা দেশের সব জেলায়ই। বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক সব চাহিদা পূরনের ক্ষমতা এঁদের নেই বললেই চলে। এঁদের সবাই যে এখন ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে নিয়োজিত সেটা নয়; অনেকেই পেশা বদলেছে। বলা বাহুল্য তাঁদের নতুন পেশার সবগুলোই ‘নিচু’ পেশা।

আমি যে এলাকায় থাকি তার কাছেই ঢাকা শহরের সবচাইতে বিখ্যাত স্কুলগুলোর একটা আছে। আমার বাসার আশপাশেই ওই স্কুলের অনেক শিক্ষক স্টুডেন্টদেরকে ব্যাচে পড়ান। কিছুদিন আগে বাসা থেকে বেরিয়ে দেখি এলাকার স্যুয়ারেজ লাইনটিতে সমস্যার কারণে কাজ করা হচ্ছে। দুর্গন্ধের জন্য হাঁটাও কঠিন, আর ওটার মধ্যে গলা পর্যন্ত নেমে এই ‘নিচু’ কাজ করে চলেছে কিছু ‘নিচু’ মানুষ। আমার পেছনে শুনতে পাচ্ছিলাম ওই বিখ্যাত স্কুলের কিছু স্টুডেন্টের কথোপকথন, যারা টিচারের ব্যাচে পড়ে বেরিয়েছে। তাদের কথাবার্তার বিষয় ছিল সারা গায়ে ‘মনুষ্য বর্জ্য’ মেখে স্যুয়ারেজ লাইনে কাজ করে যাওয়া ঐ ‘নোংরা’ লোকগুলো – তাঁদেরকে দেখেই নাকি তাদের ভীষণ বমি পাচ্ছে, আর ছি ছি করছে।

ওদেরকে দোষ দেই না আসলে। ওদেরকে পরিবার, সমাজ এভাবেইতো শেখায়; আমরাওকি এভাবে জেনেই বড় হয়ে উঠিনি? আমাদের সমাজ কি শিশুদেরকে শেখায় “এঁরা তোমার বর্জ্য গায়ে মেখে ওই লাইন পরিষ্কার করে বলেই তোমার বর্জ্য তোমার নিজ গায়ে মাখামাখি হয়ে যায়না”? না, শেখায় না। সমাজ এটাও কোন শিশুকে শেখায় না যে – এই ‘নোংরা’ কিন্তু ভীষন জরুরী কাজগুলো যারা আমাদের জীবনকে সুন্দর, আনন্দময় করে রাখার জন্য করছে তাঁরা মহৎ কাজ করছেন; তাঁদের উচিৎ অন্য সব পেশার মানুষের চাইতে বেশী (অন্তত সমান) পারিশ্রমিক, সন্মান পাওয়া। পরিহাসের ব্যাপার হোল, আমরা বরং শেখাই ঐ মানুষগুলো ‘নোংরা’, ‘নীচু’, ‘ঘৃণ্য’। এদেরকে নিয়ে হাসাহাসি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে হবে, কাউকে খেপানোর জন্য ‘সুইপার’ ‘মেথর’ বলতে হবে।

সরকার কি বোঝে? না। বাসস্থানের কথাতো বললামই, এঁদের যাঁদের সিটি কর্পোরেশনে চাকুরী করেন তাঁদের বেতন শুরু হয় ৬০০০ টাকা থেকে। আর যাঁরা অন্য কোথাও চাকুরী করেন তাঁদের বেতন শুরু হয় ২০০০ টাকা থেকে। সরকার চালানো মানুষগুলোওতো এই ভীষণ অমানবিক সমাজের প্রোডাক্ট (বরং সাধারণ মানুষের চাইতে তারা আরো বেশি অমানবিক), তাঁদের কাছে ন্যায় আশা করাটাও হাস্যকর।

লিখাটি শুরু করেছিলাম শকুন আর হায়েনার কথা দিয়ে। আমাদের এই দুঃখী দলিত (অচ্ছুৎ) ভাই-বোনদের অবস্থা, পরিণতিও কি শকুন আর হায়েনার মত না? কী ভীষণ মিল আছে না এদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে? এঁদেরকেও কি আমরা বংশপরম্পরায় আমাদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতিদান দেই না অসীম বঞ্চনা, অভাব, আর ঘৃনা দিয়ে? এই না হলে আমরা ‘সৃষ্টির সেরা জীব'(?!) মানুষ!