ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

সব হারানো শেয়ার ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা এবার থানায় গেলেন। গ্রেফতার হয়েছেন আটজন, অভিযোগ ভাংচুর। বাসর রাতে বিড়াল মারেনি সরকার বাহাদুর, সেই ভুল এবার তারা শোধরালেন। বেশ কিছুদিন থেকেই দরপতনের পর রাস্তায় নেমে ওই লোকগুলো চ্যাঁচামেচী করতো, কখনো কখনো গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিত, কখনো কখনোবা কাঠ-কাগজে আগুন লাগিয়ে দিত। প্রথম দিনই এই লোকগুলোকে লাঠিপেটা করে খেদিয়ে দিলেই আজ ওদের এতো বাড় বাড়তো না। এখন আবার এরা হরতালও ডাকে! কত বড় স্পর্ধা! থানায় নিয়ে ‘জামাই আদর করে, বুঝিয়ে সুঝিয়ে’ (!?) তাদেরকে দিয়ে হরতাল প্রত্যাহার করানো হল।

কিছুদিন আগে শেয়ার বাজারের প্রচন্ড ধ্বসের প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটা আমি একটা পোষ্ট লিখেছিলাম (লিঙ্ক – )। ওই লিখায় হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলাম শেয়ার বাজারকে কেন্দ্র করে শাপলা চত্বর এদেশের তাহরির স্কোয়ার হয়ে উঠবে না। তবে ভেবেছিলাম ওই অবস্থার পর অন্তত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। ভেবেছিলাম বহু হাজার কোটি টাকা পকেটে পোরার পর লুটপাট, আর নিরীহ মানুষের রক্ত শুষে নেয়া হয়তো আপাতত বেশ কিছু দিনের জন্য শেষ হল। কিন্তু না, লুটেরাদের ভয়ঙ্কর চেহারার পুরোটা আমি অনুমানও করতে পারিনি।

আজ দেখলাম ডিএসই এর সূচক গত ২৫ মাসে মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। কাল ওই আটজনকে আটক করে নিয়ে যাওয়া ‘বিড়াল মারা’র মত কাজ করেছে অবশেষে – আজ আর মতিঝিল ‘উত্তাল’ হয়ে ওঠেনি।

এখন আবার টিভিতে নসিহত শুরু হয়ে যাবে মন্ত্রীদের, বাজারের হর্তাকর্তাদেরঃ শেয়ার বাজার ঝুঁকি পূর্ণ ……… শেয়ার বাজারে উত্থান-পতন থাকবেই ……… ঘটিবাটি বিক্রি করে সবাই আসলো কেন ……… এটা শিক্ষিত, জানাশোনা থাকা মানুষের বাজার ……… ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আমি নিজে শেয়ার বিনিয়োগকারী নই। কিন্তু চারপাশে খুব কম মানুষ খুঁজে পাই যারা এই ‘জুয়া’য় যায়নি। চারদিকে দেখি জুয়ায় অনেক কিছু/প্রায় সবকিছু হারানো মানুষের মুখ। টিভিতে দেখি। এই বাজারকে জুয়া বলা নিয়ে ওই বাজারের হর্তা-কর্তারা ক্ষেপে যান। কিন্তু আমাকে বাদই দিন রেহমান সোবহানের মত মানুষইতো এটাকে ‘ন্যাশনাল ক্যাসিনো’ বলেছেন। এটা অবশ্যই আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা – সঠিকভাবে পরিচালিত শেয়ার বাজার অবশ্যই ‘ক্যাসিনো’ নয়।

শুনি গ্রামের হাট-বাজারের জুয়ার আসরে যখন নতুন একজন আসে তখন পাকা জুয়াড়ীরা ইচ্ছে করে হেরে কিছুদিন তাকে জিততে দেয়। ওই নতুন বোকা খেলোয়াড় তো লোভে পড়ে যায়, তার পর সে যেদিন অনেক টাকা নিয়ে আসে সেদিন সে মুখোমুখি হয় ‘আসল খেলা’র আর সব হাতিয়ে নেয় পাকা জুয়াড়ীরা।

এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বোকা লোকগুলোকে পরিকল্পনা করে, রাষ্ট্রের সব যন্ত্র ব্যাবহার করে (এসইসি, অর্থ মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক) লোভে ফেলা হোল। সবাই সব ছেড়ে ছুড়ে শামিল হোল জুয়ায়, প্রথম কিছু দিন জিতলো সবাই – অর্থমন্ত্রী আর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বগল বাজালেন – দেশের অর্থনীতি শনৈ শনৈ উন্নতি হচ্ছে!!

অথচ দীর্ঘ দিন থেকে শেয়ার বাজারে কিন্তু আইপিও আসছিল না। আসবে কীভাবে, সরকারতো বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সংযোগ শিল্পে দূরে থাকুক, বাড়িতেও দিচ্ছিলো না। টাকা নিয়ে বিনিয়োগের জায়গাতো ছিল না। বাজারে শেয়ারের সরবরাহ না বাড়িয়ে টাকার সরবরাহ বাড়নোর অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অল্প কিছু মানুষ কিন্তু সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

অথচ শেয়ার বাজার সম্পর্কে যাঁর ন্যুনতম ধারণাও আছে তিনি জানেন সেকেন্ডারী শেয়ার বাজারের রমরমা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য তেমন কোন বড় ব্যাপার না – ওখানে একজনের টাকা আরেকজনের হাতে যায়। ভাল একটা সেকেন্ডারী বাজার প্রাইমারী বাজারে বিনিয়োগকারীদেরকে উৎসাহ দেয় মাত্র। কিন্তু এই আগুন নিয়ন্ত্রন না করে ঘি ঢালা হোল। তাই যা হবার তাই হোল।

কিছুদিন আগের ধ্বসের পর সূচক অনেক নীচে নেমে আবার এটা আবার ভীষনভাবে পড়তে শুরু করেছে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে। এখানেও নোংরা খেলা। বাজার ভাল করার জন্য আদেশ হয়েছে কোম্পানীর ডিরেক্টরদের কোম্পানীর মোট শেয়ারের ৩০% ধারন করতে হবে। তাই বাজারকে যতোটা নীচে নামিয়ে শেয়ারগুলো কেনা যায় আর কী।

টেকনিক্যাল বিষয় এড়িয়ে এটুকু বলি এখন, এই শেয়ার বাজারকে বেলুনের মত ফোলা বন্ধ করা কোন ব্যাপার ছিল না, কিন্তু করা হল না। তারপর ধ্বসের পর দায়ীদের শাস্তি দিয়ে মানুষের আস্থা ফেরানো যেত যাতে বাজারটা ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসে। কিন্তু করা হল উল্টো – লুটেরাদেরকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাজারকে স্থিতিশীল করার।

কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বসলেন সবাইকে নিয়ে – শেয়ার মার্কেটের ব্যাপারে। বহু কথা হোল, বহু সিদ্ধান্ত নেয়া হোল – কিন্তু অবস্থা ভাল হওয়া দূরে থাকুক একই জায়গাতেও নেই, দিনে দিনে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। এতে কী বুঝলাম আমরা? সত্যিকার সদিচ্ছা না থাকলে, শেয়ার মার্কেটের টাউট বাটপারদেরকে শাস্তি দিয়ে মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে না আনলে এই বাজারের কপালে, আর এই বাজারের লক্ষ লক্ষ মানুষের কপালে আরো খারাবী আছে।

প্রধানমন্ত্রীতো বসলেন শেয়ার বাজারের সমস্যা নিয়ে, হোল না কিছুই, বরং আরো খারাপ হোল। একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী যদি এখন প্রশ্ন করে এবার তাহলে কে? নাকি মানুষের সব আশা-ভরসা শেষ?