ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

না, ভুল পড়েননি – আমি গাঁজা ব্যবসার লাইসেন্স চাই। আমি সরকারকে এই নিশ্চয়তা দেই যে আমি সরকারকে অনেক টাকা ট্যাক্স দেব, এমনকি আমি হয়ে যেতে পারি দেশের সবচাইতে বড় ট্যাক্স প্রদানকারীও। লিখিত প্রতিশ্রুতি দেব যে সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য স্বেচ্ছায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান সব ক্ষেত্রেই আমি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক সেবা নিশ্চিত করবো। গত কিছু দিন বিভিন্ন পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে আমার মাথায় আইডিয়াটা আসলো।

গত কিছু দিন প্রায় সব বড় বড় জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার প্রায় অর্ধেক জুড়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর একটা বিজ্ঞাপন দেখছি। দেখছি আর পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে হতাশায়। বিজ্ঞাপনটা দেখেছেন হয়তো অনেকেই। যাঁরা দেখেননি তাঁদের জন্য বিজ্ঞাপনটার কিছু তথ্য দিয়ে শুরু করছি।

বেশুমার টাকা খরচ করে, প্রচন্ড ঢাকঢোল পিটিয়ে জনগনকে জানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে জনগণকে তারা কীভাবে উদ্ধার করছে। ‘প্রবাহ’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় তারা দেশের বিভিন্ন আর্সেনিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য ২৭ টি পানি বিশুদ্ধকরন প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে তারা ৭০,০০০ মানুষকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করছে প্রতিদিন। এ সবই করছে তারা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কারনে! (না, আপনি ভুল পড়ছেন না)। অবশ্য তাদের আরও সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজ আছে (আগে দেখেছি) – বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। গাছ লাগিয়ে তারা এদেশকে সবুজ করে দেবে যেমন চমৎকার সবুজ করে দিচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত নতুন নতুন জমিকে – তামাকের চাষ করিয়ে।

পত্রিকাগুলোর ভূমিকা (এর মধ্যে নিজে থেকে জাতির বিবেকের মত আচরনের ভাব ধরা পত্রিকাটিও আছে) আবার নতুন করে দুঃখ দিল – অবাক করেনি যদিও। পত্রিকাগুলোওতো এখন কর্পোরেট পুঁজির দখলে – শুধুমাত্র মুনাফা করা ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য তাদের নেই। আর মুনাফা করার জন্য কিঞ্চিত মানবতা আর কিঞ্চিত বিবেকের ভেক ধরা তো দারুন কাজে লাগেই। অবশ্য তারা তো এটাও বলতে পারে যে তারা যে বিজ্ঞাপন ছেপেছে তাতে তো সিগারেটের কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে “ভূতের মুখে রাম নাম” এর গল্প – তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা।

তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে লিখা এই পোষ্টের উদ্দেশ্য না, ওটা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। আমি দেখাতে চাইছি এই সব কোম্পানীর, বিশেষ করে এদের মধ্যে ‘অভিজাত’ কোম্পানীটির ভন্ডামো দেখানো।

এদেশের কোটি কোটি মানুষকে তামাকের বিষে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে যেতে তারা নানা রকম কথা বলে আমাদেরকে বোঝায় কীভাবে তারা আমাদেরকে উদ্ধার করছে। এখন গ্রামীন ফোন সরকারকে সবচাইতে বড় ট্যাক্সদাতা, তার আগে ছিল ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো। তখন দেখতাম তারা এই কথা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতো। ভাবখানা এমন তাদের ট্যাক্সের টাকা না হলে মনে হয় সরকারই চলতে পারবে না। এবং এদের টাকা খাওয়া মন্ত্রীরা আবার এই মোট ট্যাক্সের যুক্তি দেখিয়ে সিগারেট নিষিদ্ধ করা দূরে থাকুক, সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়াতেও গড়িমসি করে সব সরকারের সময়ই।

এখন আবার তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ নতুন নতুন এলাকায় তামাক চাষের জন্য নানা ধরনের প্রনোদনা দিয়ে তামাক চাষের জমি বাড়াচ্ছে। ফসলী জমি নষ্ট হয়ে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তামাক প্রক্রিয়াজাত করার চুল্লির কারনে কী ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিপর্যয় আর জনগনের স্বাস্থ্যহুমকি সৃষ্টি করছে তারা, তার খবর রাখি আমরা কয়জন? কিন্তু টিভিতে একটা টক শোতে দেখি এরা এখন প্রকাশ্যে এটাও বলছে যে তামাক চাষ করে কৃষকরা বেশী লাভবান হচ্ছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে যে পরিমাণ টাকা সরকার ট্যাক্স হিসাবে পায় তার অন্তত ৪-৫ গুন টাকা জনগনের ব্যয় হয় সিগারেটের কারনে সৃষ্ট অসুস্থতার চিকিৎসায়। সাথে এই কারনে ঘটা মৃত্যুর মূল্য কত? আর তামাকের চাষ এবং প্রক্রিয়াজাতকরনের পরিবেশগত ক্ষতির মূল্য? বাদ দিলাম, সিগারেট কেনার পেছনে ব্যয় হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার কথা।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিজ্ঞাপনটি দেখে পিত্তি জ্বলে যাওয়ার কথা বলেছিলাম। সমাজে একটা নোংরা প্রতিষ্ঠান নোংরা হিসাবেই পরিচিত থাকা উচিৎ। পিত্তি জ্বলে যায় যখন দেখি এই নোংরা, মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা প্রতিষ্ঠানটি বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানো আর বৃক্ষরোপণের কথা বলে সমাজে সাধু সাজার চেষ্টা করে। কোটি কোটি মানুষকে সিগারেটের বিষে বিষাক্ত করে গল্প শোনায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষকে ‘বিষমুক্ত’ পানি খাওয়ানোর। পিত্তি এজন্য জ্বলে যায় যখন দেখি পত্রিকাগুলো এদের এই নোংরা বিজ্ঞাপন ছাপে; তাও আবার প্রথম পাতায়।

আসি আমার পরিকল্পনার কথায়। আমি সরকারের কাছে গাঁজা ব্যবসার বৈধতা চাই। কেউ বলবেন গাঁজা মাদক, নিষিদ্ধ। সিগারেটওতো মাদক – এটা আমার কথা না, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত এটা। গাঁজার মানসিক ক্ষতি তামাকের চাইতে বেশী, কিন্তু শারীরিক ক্ষতি কিন্তু তামাকের চাইতে কম। আমাকে গাঁজা ব্যবসার বৈধতা দিলে এর চাষিরা এর চাষ করে অনেক লাভবান হবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে গাঁজা ব্যবসা করে। আর আমি আমার ব্যবসা থেকে ভ্যাট আর কর্পোরেট ট্যাক্স দিয়ে ভরে দেব সরকারের কোষাগার।

নিশ্চয়তা দিচ্ছি আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর চাইতে অনেক বেশী। গাছ লাগাবো, বিশুদ্ধ পানি খাওয়াবো, হাসপাতাল বানাবো, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার জন্য বৃত্তি দেব, গ্রামে স্বাস্থ্যসন্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করবো, রাস্তার গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবো। আরো কত কী …… ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মতোই আমি আজীবন করে যাব “গরু মেরে জুতা দান”।