ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

আজ ভ্যালেন্টাইন ডে, ভালবাসা দিবস। পরশু রাতের খবরে দেখলাম চীনের কোন এক বিনোদন পার্কে এই বছরের ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছে ‘পেঙ্গুঈনের বিয়ে’। কী ‘সৃজনশীল’ আইডিয়া! দেখলাম দুটি পেঙ্গুঈনকে সাজিয়ে এনে বিয়ে দেয়া হচ্ছে; অনেক দর্শক সেটা দেখছে। আর এটা আবার এতোটা আন্তর্জাতিকতা পেয়ে গেছে যে, আমাদের দেশেও এই খবর দেখানো হচ্ছে। আর দেখানো হবেই না বা কেন? ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করতে প্রস্তুতি নেয়া মানুষেরা এই খবর নিশ্চয়ই ‘খেয়েছে’ খুব। খবরটা দেখেই মনে হোল বিষয়টা নিয়ে লিখি কিছু।

আমি মোটামুটি ভালভাবেই মনে করতে পারি কীভাবে এদেশের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা এই দেশে এই দিবসটি মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে। তারপর ‘হুজুগে বাঙালী’ মেতে উঠলো সীমাহীন হুজুগে – নেমে পড়লো সবাই কোমর বেঁধে ভালবাসা দিবস পালন করতে – ভাবটা এমন যে এই দেশের মানুষ যেন এর আগে ভালবাসেনি, প্রেমে পড়েনি!

বেশ কিছুদিনের প্রস্তুতির পর আজকের দিনটি নিশ্চয়ই হয়ে উঠেছে অনেক ‘ভালবাসাময়’। পরিকল্পনা করে বেশ কয়েকদিন ধরে শপিং চলেছে নিশ্চয়ই। কী নেই তাতে? পোশাক (লাল), চকলেট, কার্ড, ফুল তো আছেই; গত কয়েক বছর ধরে আবার দেখছি উপহার হিসাবে বলা হচ্ছে হীরার কথা – ভালবাসা চিরকালীন হোক না হোক ‘আ ডায়মন্ড ইস ফর এভার’। তারপর সারাদিন ঘোরাঘুরি, সময় হলে দামি রেস্টুরেন্টে,ফাষ্ট ফুডের দোকানে খাওয়া। এর পর বাসায় ফিরে আছে টিভিতে ভালবাসা দিবসের ‘বিশেষ’ নাটক আর লাইভ ভালবাসার গানের অনুষ্ঠান। ভালবাসার সাগরে ভাসতে ভাসতে দিনটি পার!

আচ্ছা, এতোসবের পর কাল, ১৫ ফেব্রুয়ারী থেকে কি আমাদের মনে ভালবাসা অনেক বেড়ে যাবে? বেড়ে যাবে সম্পর্কের উষ্ণতা? আজকের দিনে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্কের মধ্যে ক্যান্সারের মত ঢুকে পড়া অবিশ্বস্ততা (বা পরকীয়া) কমে যাবে? বহু বছর হয়ে গেল তো এই দিবস পালনের; এর প্রভাবে কি বেড়েছে ভালবাসার যাবতীয় সব ‘ভাল’? আর কমেছে যাবতীয় সব ‘খারাপ’? আমি তো স্পষ্টভাবেই দেখছি, হচ্ছে উল্টোটা। কেন?

যাবতীয় সব ‘দিবস’ পালনের মচ্ছব চলছে আজ চারিদিকে। বাবা আর মায়ের জন্যও দিবস আছে! আসবে নিশ্চয়ই আরো নতুন নতুন দিবস। দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা, ফুপু, খালা মামাদের জন্য দিবস। আসবে ‘সন্তান দিবস’, তারপর সেটা আরো বিশেষায়িত হয়ে হবে – ‘পুত্র সন্তান দিবস’ আর ‘কন্যা সন্তান দিবস’। আজকের ভালবাসা দিবসকে হয়তো আরো বিশেষায়িত করে অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা আর বিবাহিত দম্পতিদের জন্য আলাদা দিবস করা হবে। রোমান্টিকতার যাবতীয় ব্যাপার কেনই বা একটা দিনে শেষ করে দেয়া হবে? হোক না হাত ধরা দিবস, আলিঙ্গন দিবস, চুমু দিবস, তারপর ………। হবেও হয়তো একদিন। বেচা আর কেনাই যেহেতু সব দিবসের উদ্দেশ্য, একদিন হয়তো আসবে কেনাকাটা দিবস, সপ্তাহ বা মাস।

প্রতিটি নতুন দিবস আসবে আর তার সাথে সাথে যুক্ত হবে নানা পন্যের অনুষঙ্গ। প্রতিটা নতুন ‘দিবস’ মানে নতুন নতুন পন্য বিক্রি। আবার বর্তমানে উদযাপিত ‘দিবস’ টির উদযাপনের সাথে যুক্ত হবে নতুন পন্য। যেমন এদেশে ফুল আর কার্ড উপহার দিয়ে শুরু হওয়া ভ্যালেন্টাইন ডে এর উপহার এখন এসে ঠেকেছে হীরের গয়নায়। অজস্র তরুনী নিশ্চয়ই ভীষন খুশী হয়েছে আজ প্রেমিকের কাছ থেকে হীরের গয়না পেয়ে; আর অনেক তরুনীর মন হয়তো খারাপ, মনে মনে প্রত্যাশা করেও ওটা না পেয়ে।

একটু শিরোনামের কথা বলি এবার। শিরোনামের নামের একটি, ‘কিউপিড’ হল রোমান মিথোলজিতে প্রেম আর কামের দেবতা। আর অপরটি, ‘প্লুটাস’ হল রোমান মিথোলজিতে সম্পদ আর বানিজ্যের দেবতা। শিরোনামের মধ্যে প্রশ্ন ছিল ভ্যালেন্টাইন ডে কার? যতোই বোঝানোর চেষ্টা হোক এটা কিউপিডের, এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট যে এটা আসলে প্লুটাসের। আমার পরিচিতদের মধ্যে যখন ব্যাপারটি নিয়ে কথা বলেছি তখন অনেকেই বানিজ্যের ব্যাপারটা মেনে নিয়ে বলেছেন, এর মধ্যে বানিজ্য থাকলে ক্ষতি কি? আমরা অনেকেই সম্ভবত ভাবি এভাবেই। আসলে এর ভীষণ ক্ষতির দিক আছে।

ভালবাসা এক বিমূর্ত অনুভূতি, এই বিমূর্ত অনুভূতির সাথে পন্যকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলার ভয়ঙ্কর বিপদের দিক আছে। আজকের পৃথিবীতে সত্যিকার গভীর প্রেম ক্রমশ বিলুপ্ত হতে চলার মূল কারন কিন্তু এটাই। পন্য হয়তো মুহুর্তের জন্য কিছু আনন্দ দেয়, কিন্তু এটা দেখাই গেছে অনেক সুন্দর এবং দামি পণ্যও একটা সময় গিয়ে আনন্দ তৈরি করতে পারে না। পন্য দিয়ে বিমূর্ত অনুভুতিকে লালন করার ভুল চেষ্টা উষ্কে দেয় কনজিউমারিজমকেও, যেটারও অনিবার্য পরিনতি ভয়ঙ্কর মানসিক অস্থিরতা। তাই এই দিবস প্রকারান্তরে সত্যিকার ভালবাসার শত্রুই। কেউ কেউ বলবেন ভালবাসার মানুষটিই তো চায় এসব। অস্বীকার করি না, আসলেই আমাদের চারপাশ এভাবেই আমাদের মগজকে পচিয়ে দেয়।

ভালবাসার মত একটা বিমূর্ত অনুভূতি লালন করতে হয় আরো কিছু বিমূর্ততা দিয়ে – রোমান্টিকতা, বন্ধুত্ব, বোঝাপোড়া, সহমর্মিতা, শেয়ারিং, কেয়ারিং, বিশ্বস্ততা এসব দিয়ে। কঠিন সত্য হোল পন্য কোনদিন এসব তৈরি করে দেয় না। বরং ক্ষতি করে এসবের, পথ রুদ্ধ করে এসব অনুভূতি তৈরি হবার পথ। আর্চিসের একটা স্লোগান আছে “দ্য বেষ্ট ওয়ে টু সে ইউ কেয়ার”। হাহ হা, আপনি কাউকে কেয়ার করছেন এটা বোঝানোর সবচাইতে ভাল উপায় হোল আর্চিসের উপহার, কার্ড দেয়া – ভালবাসার মানুষের হাতে হাত রেখে সেটা বোঝানো যায় না! আমরাও এখন তাই করছি এটা ওটা কিনে দিয়ে, ভাল যায়গায় খেয়ে দেখাতে চাইছি তোমাকে কতোটা ভালবাসি। কিন্তু এতো কিছুর পর ও তো চারিদিকে “ভাঙ্গনের শব্দ শুনি” ভয়ঙ্করভাবে।

ভীষন মন খারাপ হয় এটা দেখে যে, যত দিন যাচ্ছে আমাদের সম্পুর্কগুলো ঠুনকো থেকে ঠুনকোতর হয়ে উঠছে। আমাদের এখনও সব ভেঙ্গেচুরে পড়েনি। কিন্তু পশ্চিমের অতীত আর বর্তমানকে দেখলে স্পষ্টভাবেই দেখতে পারবো আমরাও ঠিক তাদের পথে যাচ্ছি। এই পথ উপোভোগের না, শুধুমাত্র ভোগ আর সম্ভোগের। যার অনিবার্য পরিনতি ভালবাসা দিবসের আরো ফুলে-ফেঁপে ওঠা আর সত্যিকার ভালবাসার বিলুপ্তি।