ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

(এই পোষ্টটি সত্যমে-ব-জয়তে/মেহেদি হাসান এর পোষ্ট “সাইবার যুদ্ধ দেশ বিরোধীতা তো বটেই!!!” এর জবাবে লিখা)।

আসলে আমি ওই লিখাটা পড়ে একটা মন্তব্য লিখার পরিকল্পনা করছিলাম, কিন্তু দেখলাম মন্তব্যটা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই একটা পুরো পোস্ট লিখে ফেলার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললাম। আর সহব্লগার আবু সুফিয়ান_অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এর এই বিষয় নিয়ে একটা পোষ্টে তাঁর অনুরোধের জবাবে বলেছিলাম এই ব্যাপারটি নিয়ে লিখবো কিছু। আমি ব্লগ কর্তৃপক্ষকে শুরুতেই ধন্যবাদ দেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘সাইবার যুদ্ধে’র বিপক্ষের একটা লিখা প্রকাশ করেছেন এবং সেটাকে ব্লগ হাইলাইটসে রেখেছেন। এতে অনেকেই লিখাটা পড়ছেন এবং মন্তব্য করছেন। যদিও কেউ কেউ লেখককে অযৌক্তিক ভাষায় আক্রমন করেছেন; এটা আমার ভাল লাগেনি। লেখকের লিখা যুক্তির দিক থেকে যথেষ্ট দুর্বল, ইতিহাসবোধহীন – ওটাকে যুক্তি দিয়েই খুব সহজেই বাতিল করে দেয়া যেত।

এই যুদ্ধের বিপক্ষে প্রধান যুক্তি লেখক দেখিয়েছেন আইনকে। অনেকেই এটাকেই প্রধান বিষয় হিসাবে দেখাচ্ছেন, আমাদের অত্যন্ত অযোগ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রীসহ। আচ্ছা পৃথিবীর কোন আন্দোলন, বিদ্রোহ আইনের মধ্যে থেকে হয়েছে? কাল ২১ শে ফেব্রুয়ারী। আমরা জানি ওইদিন ১৪৪ ধারা জারী করা হয়েছিল। ওইদিন মিছিল বের করা মানে ছিল রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করা। আইন ভেঙ্গেছিলেন সালাম, বরকত, রফিকেরা। তো আজ কি জনাব মেহেদী তাঁদেরসহ যারা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গেছিলেন তাদেরকে অপরাধী মনে করেন?

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কি পাকিস্তানের আইনী কাঠামোর মধ্যে হয়েছিল? আজ আমরা স্বাধীন হয়েছি বলে ওই সময়ের ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেই। কিন্তু ধরা যাক ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেল, ২ লক্ষ নারী ধর্ষিতা হোল, কিন্তু যুদ্ধের শেষে বাংলাদেশ আর স্বাধীন হোল না। তখন কিন্তু পাকিস্তানের আইন ভেঙ্গে এই সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য বঙ্গবন্ধুসহ হাজার হাজার মানুষের ফাঁসী হোত রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে। সেটা আইনের মাধ্যমেই; আপনি সেটা সমর্থন করতেন? রাষ্ট্রের আইন ভেঙ্গে অহেতুক একটা যুদ্ধ শুরু করে দেশের এতো ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য বঙ্গবন্ধুর চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করতেন মনে মনে? আর বলুনতো ভারত কোন আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পূর্বপাকিস্তানের ‘বিদ্রোহী’দের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল যারা একটা রাষ্ট্র, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব এবং অখন্ডতাকে বিনষ্ট করছে?

এখনকার ভারতে মাওবাদীদের ন্যায়সঙ্গত সশস্ত্র আন্দোলনকেও তো তাহলে সমর্থন করা যাবে না। তো এদেরকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে, এদের এলাকায় গিয়ে এদেরকে উৎসাহিত করে কবীর সুমন, অরুন্ধতি রায় রা তো মহা অন্যায় করছেন; এদের সবাইকেতো জেলে পোরা উচিত। তাই না?

আলোচিত পোষ্টের লেখক এবং যারা এই ‘যুদ্ধ’ এর বিরোধীতা করছে তারা ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হবার কথা বলছেন। বলেছেন ভারতের সাথে আমাদের দেশের বন্ধুত্বের(!?) কথা। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হবার আর কী বাঁকি আছে? ভারতের সাথে আমাদের কি আদৌ কোন বন্ধুত্ব আছে? কিন্তু আমাদের সরকারের সাথে সাথে জনাব মেহেদী ভারতের ব্যাপারে মনে মনে “হয়তো কিছুই নাহি পাবো, তবুও তোমায় আমি দূর থেকে ভালবেসে যাবো” গান গেয়ে যান হয়তো। কিন্তু ভারতের প্রতি সরকারের এই আচরন দেখলে আমার মত এই দেশের প্রায় সব মানুষের বিবমিষা হয়। এমন বন্ধুত্বকে আমরা ঘেন্না করি যেটায় শুধু দিয়ে যেতে হয়, পাওয়া যায় না কোন ন্যায্য অধিকারও।

আমাদের রাষ্ট্রের সায় আছে কিনা সেই প্রশ্নও উঠছে। একটা সরকার যখন বিশেষ একটা রাষ্ট্রের প্রতি মেরুদণ্ডহীন আচরন করে, যখন সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের ২য় ব্যক্তিটি বলে সীমান্তে হত্যা কোন ব্যাপার না, তখন জনগনকে সরকারের ওপর আস্থা রাখতে বলাটা হাস্যকর এবং বিরক্তিকর।

এই সাইবার যুদ্ধ আমাদের কী লাভ করতে পারে বা কি ক্ষতি করতে পারে সেটা ভীন্ন আলোচনা। কিন্তু আমাদের সরকারকে এবং সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে এটা বুঝতে হবে এটা ঘটার পেছনে কী কারন আছে, কাজ করতে হবে সেটা নিয়ে। তাহলে সেটা দুই দেশের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। শুধু আইনের হুমকি দেখালে লাভ নেই।

এবার কয়েকটা কথা আমাদের ‘সাইবার গেরিলা’দেরকে নিয়ে। এদের কাজ দেখে আমার ভীষন মনে পড়ছে ফিলিস্তিনের কিশোরদের কথা। টিভিতে বহুবার দেখেছি পৃথিবীর সবচাইতে দক্ষ সেনাবাহিনীর একটি, ইসরাইলী বাহিনীর রাইফেলের মুখে দাঁড়িয়ে ওদেরকে ইট পাটকেল মারে। তারপর মাঝে মাঝে মরে পাখির মত গুলি খেয়ে। ওরা কি যাচ্ছেতাই রকম বোকা? ওরা কি দেখেনি যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে মরেছে? তাও ওরা এমন করে কেন? আসলে অত্যাচারিত হতে হতে দেয়ালে পীঠ ঠেকে গেলে একসময় এমন ভয়ঙ্কর বিপদ জেনেও মানুষ প্রতিবাদী হয়, মরে।

হয়তো ভারতের দিক থেকে অনেক বড় সাইবার আক্রমন আসছে। আমার এটা বোঝার টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই এটা বোঝার যে, আমাদের আদৌ কতোটা ক্ষমতা আছে এই আক্রমন ঠেকাবার। কিন্তু ওরা ভারতে, বহির্বিশ্বে তো একটা নাড়া দিতে পারল, যেটা পারেনি আমাদের সরকারী দল, বিরোধীদল, ‘সুশীল’ সমাজ। ওরা দেশ বিরোধিতা করছে, একথা যারা বলে, তারাই আসলে দেশবিরোধী।

গত তিন বছর সরকার ভারতের পা চেটেছে; কিছু হয়নি। ব্যক্তিগত বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কারনে বিরোধী দল হরতাল দিলেও হরতাল দেয়নি সরকারকে এই ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য করতে – সব শেয়ালের একই রা। এমন অবস্থায় একটু ‘অন্যভাবে’ চেষ্টা করার জন্য আমাদের ‘সাইবার গেরিলা’দেরকে আমি স্যালুট জানাই। ওদের ‘বেআইনি’ কাজকে সমর্থন জানিয়ে কি আমিও আইন ভাঙলাম? আমারও কি বিচার হতে পারে এজন্য? হোক, তাও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এই ‘অপরাধী’ গুলোর জন্য অনেক শুভকামনা।