ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 
144

একুশে ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যেই নিশ্চয়ই শহীদ মিনার ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ফেব্রুয়ারীর এক তারিখ থেকে দেশের সব পত্রিকা, টিভি চ্যানেল যে বাংলা ভাষাময় হয়ে উঠেছিল, সেটার ইতি ঘটবে আপাতত। সবাই কথা বলছে বাংলা ভাষা নিয়ে। অনেক আবেগাপ্লুত(এবং অযৌক্তিক) এবং অনেক যৌক্তিক লিখা পড়েছি ব্লগে, পত্রিকায়। অনেক আলোচনা, রিপোর্ট দেখেছি টিভিতে। অনেক রথী-মহারথীরা বলেছেন, লিখেছেন – আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আর ওসব নিয়ে নাইবা লিখলাম। শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছেন আশা করি, আমার লিখার বিষয়টা ভিন্ন।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা আমরা ভীষণ আনন্দে, আহ্লাদে আটখানা হয়ে, গর্বে বুক ফুলিয়ে দেখলাম আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারীকে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে। আমরা খুব গর্ব করে বলি আমরাই পৃথিবীতে একমাত্র জাতি যারা তাদের মাতৃভাষার অধিকারের জন্য রক্ত দিয়েছে। হ্যাঁ আমি ‘মাতৃভাষা’র অধিকারের কথাই বলছি।

বাংলা নিয়ে ক্রমাগত কথা বলতে বলতে আমরা ভুলেই যাই এদেশ শুধু বাংলা ভাষার দেশ না – এদেশে বাংলা ছাড়া আরও ৪১ টি ভিন্ন ভাষা আছে। আমরা ভুলে যাই, ওই ভাষাগুলোতে যারা কথা বলে তাদের কাছে ওগুলোই ‘মাতৃভাষা’। কিন্তু আমরা, বাঙালীরা, এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ওসব ‘ক্ষুদ্র’ ভাষাকে গুরুত্ব দেই না। আমরা ব্যস্ত এটা দেখতে আমাদের বাঙালী শিশুরা কীভাবে হিন্দী আর ইংরেজীর আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়ে ‘শুদ্ধ’ বাংলা শিখতে পারে; কিন্তু আমাদের সময়, ইচ্ছে কিছুই হয়না এটা দেখতে যে একটি চাকমা, মার্মা, ম্রো বা গারো শিশু আদৌ তার মায়ের ভাষাটি কোনমতে হলেও বাঁচিয়ে রাখতে পারবে কিনা।

বাঙালিদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক অল্প সংখ্যক আদিবাসীরা কিন্তু তাদের সবার ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মর্যাদা চাননি। নৈতিকভাবে সেটা চাওয়া গেলেও সেটা যে প্রায়োগিকক্ষেত্রে সম্ভব না সেটা তাঁরা বোঝেন নিশ্চয়ই। তাই তাঁদের চাওয়া ছিল সামান্যই – তাঁদের শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাবস্থা করা। যাতে শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করে সেটা ভালভাবে আত্মস্থ করতে পারে; আর এতে যেন চর্চা থাকে তাদের মাতৃভাষার। বাংলার সাথে যেন বেঁচে থাকে তাঁদের মাতৃভাষাটিও।

১৯৫২ এর পর ২০ বছর আমরা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ছিলাম না, তাই বাদ দেই ওই সময়টা। স্বাধীনতার পর তো ৪০ বছর হয়ে গেল, কী করেছি আমরা ওদের জন্য। শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে দিয়ে আর বাঙলা ভাষা নিয়ে দায়সারা গোছের আলোচনা করতে করতে আমাদের সরকারগুলো, এমনকি আমরা, নাগরিকরাও ভুলে গেছি আমাদের আদিবাসী ভাই বোনদের কথা। মাতৃভাষা নিয়ে তাঁদের ন্যুনতম ওই দাবীটা পূরণ করার জন্য ৪০ বছরও কি যথেষ্ট সময় নয়?

শুনলে আমরা অনেকেই অবাক হব যে আদিবাসীদেরকে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করার দিন ঠিক করা হয় স্বাধীনতার ৩৬ বছর পরে, ২০০৭ সালে! আরো অবাক হবার ব্যাপার হোল মাত্র ৩ বছর পরেই, ২০১০ সালেই এই প্রকল্প বাতিল করা হয়! মার্মা আর বম ভাষায় বই লিখা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি। ভীষণ আশা আর আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করা আদিবাসীদের মাতৃভাষায় অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটা নেয়া আর কপালে জোটেনি।

মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নেয়ার গুরুত্ব বোঝার জন্য কোন পন্ডিত হতে হয় না। যদিও এটা নিয়ে অনেক গবেষণা আছে যে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা না নিতে পারলে সেটা শিশুকে পরবর্তীতে সুশিক্ষিত হয়ে ওঠার পথ অনেকটাই রুদ্ধ করে দেয়। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষাটাও তাদের মনের গভীরে যায় না। পরিসংখ্যান বলে আদিবাসীদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক শিশু স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে যেতে পারে। গড়ে এক চতুর্থাংশ আদিবাসী শিশুও স্কুলে যায় না। এর পেছনে আদিবাসী এলাকাগুলোতে সরকারের অবহেলা তো আছেই, এর সাথে মাতৃভাষায় শিক্ষা না নিতে পারাও অনেকটা দায়ী।

তো এখন তাদেরকে শিক্ষিত হতে হলে সেটা করতে হবে বাঙলা ভাষায়। এটা করতে গিয়ে কিন্তু অনেক আদিবাসী ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা অনেকেই শুনলে অবাক হব যে গারো শিশুদের অধিকাংশই তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না। পাহাড়ের আদিবাসীরাও সেই পরিনতির দিকেই যাচ্ছে।

তাহলে আমাদের রাষ্ট্র কি আদিবাসীদের ওপর বাঙলা ভাষা চাপিয়ে দিচ্ছে না? রাষ্ট্র কি তাহলে তার কিছু নাগরিককে ভাষার পীড়ন করছে না? আফসোস হোল আমরা সেই জাতি যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছি বলে গর্বে বুক ফোলাই, ভাষার অধিকার না দিতে চাওয়ার জন্য চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করি পাকিস্তানীদের। তো আমাদের কি নিজেদেরও চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করা উচিত না একই কারণে? ভাষার পীড়নকারী হিসাবে পাকিস্তানীদের সাথে আমাদের কি আদৌ কোন পার্থক্য আছে? আমি তো দেখি না। বরং এমন পরিস্থিতির শিকার হওয়া ভুক্তভোগী জাতি হিসাবে আদিবাসীদের দুঃখ তো আমাদেরই বেশী বোঝার কথা ছিল, আমাদেরই বেশী সহানুভূতিশীল এবং দায়িত্বশীল হবার কথা ছিল।

ষাট বছর আগের এই দিন আমাদের যে জয়, সেটা কি আসলে শুধু বাংলা ভাষার জয় ছিল? মোটেও না। কিন্তু আমরা তাই মনে করেছিলাম, এখনো করি। ওটা আসলে ছিল মাতৃভাষার অধিকারের জয়। কিন্তু আমরা ভুলে গেলাম একুশের চেতনার কথা, যেমন ভুলে গেছি স্বাধীনতার চেতনার কথাও। তাই আজ আমি আমার রাষ্ট্রকে পাকিস্তানের ভূমিকায় দেখি।

কবীর সুমনের ‘এটাই এখন কাজ’ শিরোনামের গানের একটা লাইন এরকম ‘রাষ্ট্র মানি না নিজের ভাষাকে ভুলে’। আমি জানিনা আমাদের আদিবাসী ভাই বোনদের মনে কি এই গানের মত কোন কথা বাজে? তাঁরা কি যা হচ্ছে সব মেনে ভুলে যাবেন তাঁদের মাতৃভাষা? নাকি তৈরি করতে চেষ্টা করবেন তাঁদের নিজস্ব একটা ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস? তাঁদের নিজস্ব একটা ‘একুশ’? ‘আমাদের একুশ’ এ কিন্তু আমরা তাঁদের জায়গা রাখিনি।

পুনশ্চঃ ভাষার মাসে গাওয়া খুব চমৎকার একটা গানের একটা শব্দ পাল্টে দিতে ইচ্ছে করছে খুব।

“মোদের গরব মোদের আশা আ মরি (বাঙলা) মাতৃভাষা”।

***
ফিচার ছবি: প্রিয় ব্লগ -এ শক্তিপদ.ত্রিপুর ‘র পোস্ট থেকে সংগৃহিত