ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১২ মার্চ আসছে আর কয়েক দিন পরেই। পত্রিকা, টিভি, ব্লগ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা এটা নিয়ে। কী হবে? ঢাকা কি দখল হয়ে যাবে? বি এন পির সমাবেশ কি হয়ে উঠবে এদেশের তাহরির স্কোয়ার? জামাত-শিবির আর জঙ্গীরা কি ঢাকায় লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে? বাধাগ্রস্ত করে ফেলবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার? সরকার কি সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে ‘জনগনের জান-মাল রক্ষা করা’র জন্য? আওয়ামী লীগ কাছাকাছি সময়ে তাদের কর্মসূচী দিয়েও প্রত্যাহার করাটা কি ঠিক হোল? রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দিতে গিয়ে বি এন পি কে ফাঁকা মাঠ দিয়ে দেয়াটা ভুল হয়ে গেলো না তো?

না, আমি এসব নিয়ে লিখতে যাচ্ছি না, জবাব খুঁজতে যাচ্ছি না এসব প্রশ্নের। আমার লিখার প্রসঙ্গ একটু ভীন্ন। তবে এই প্রসঙ্গগুলো তুললাম এটা দেখাতে কী চমৎকারভাবেই না আমাদের ‘বড়’ দুই দল আমাদেরকে বোকা বানিয়ে যায়, ফাঁদে ফেলে যায়। নির্বাচনের দীর্ঘ দুই বছর বাঁকি থাকতেই আমাদেরকে ফেলে দ্যা হোল এক জটিল সমস্যায়, নির্বাচন হবে কী হবে না – আমরা এবার এটা পেছনেই দৌড়াবো আর সব সমস্যা ফেলে।

আসছি বি এন পির বর্তমান আন্দোলন প্রসঙ্গে। তাদের যাবতীয় সব আন্দোলন একটি দাবী কেন্দ্রিক – তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন। এটা ছাড়া জনগনের ‘ভোটের অধিকার’ নিশ্চিত হবে না। আবার আওয়ামী লীগও দেখাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও ‘অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ’ নির্বাচন করা সম্ভব। এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা আর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে বারংবার। আলোচনার বিষয় আরো আছে – নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা দরকার কিনা, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন থাকবে কিনা ইত্যাদি।

একটা মজার ব্যাপার খেয়াল করছি ইদানিং – আমার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং পরিচিতজনদের মধ্যে এটাই এখন প্রধান রাজনৈতিক আলোচনা যে আগামী নর্বাচন কার অধীনে হবে? বা আদৌ হবে তো? আমি একটা নির্দিষ্ট রুটে দীর্ঘদিন চলাচলের কারনে অনেক রিকশা চালকের সাথে ভাল পরিচয়, আলাপ আছে। কিছুদিন আগে এমন একজনও আমাকে জিজ্ঞেস করলো নির্বাচন কি হবে? কার অধীনে হবে? কেউ কেউ বলবেন এটা আমাদের দেশের সব শ্রেনী-পেশার মানুষের দারুন রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমান। আমি মনে করি কথাটা আসলে ভীষন ভুল।

সেই ১৯৯১ সাল থেকে আমাদের ‘বড়’ দুই দল জনগনকে গনতন্ত্রের কথা বলে বলে গনতন্ত্র একেবারে শিখিয়ে ছেড়েছে। অবশ্যই সেটা প্রকৃত গনতন্ত্র না, তাদের নিজস্ব ধারার গনতন্ত্র। তারা উভয়ে মিলে জনগনকে শিখিয়ে ছেড়েছে যে, গনতন্ত্র মানে প্রতি ৫ বছর পর পর সেজে গুজে ‘উৎসবের আমেজে’ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে পরবর্তী সরকার (পড়ুন লুটেরা) নির্বাচিত করা। অশিক্ষিত মানুষদের কথা বাদই দিলাম, ‘শিক্ষিত’ অনেক মানুষকেও দেখেছি, তারাও এভাবেই ভাবেন।

মজার কথা হোল এই ‘গনতন্ত্রের সবক’ দেয়া রাজনৈতিক দলগুলোই কিন্তু বিরোধী দলে গেলে আর সংসদে যায় না। আবার সরকারী দলে থাকলে বিরোধী দলকে সংসদে আসার ক্রমাগত আহ্বান। সরকারি দল ও কি যায়? প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনের অধিকারী এবারের সরকারী দলের দলের সদস্যরা সংসদে অনেকদিন কোরাম পূর্ণ করতে পারেননি, তাই সংসদ দেরীতে শুরু করতে হয়েছে। মন্ত্রীরা যায় না। সরকার একটার পর একটা চুক্তি করে যায়, কোন আলোচনা হয় না সংসদে। প্রতি মিনিটে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় করে কী হয় ওর ভেতরে সেটার হিসেব নেয়াও যে গনতন্ত্র সেটা অবশ্য তারা শেখায় না।

জনগনের ম্যান্ডেট পেয়েও (বিরোধী দলে গেলে) সংসদে গিয়ে কথা না বলা যে প্রতারনা, বছরের পর বছর সংসদে না গিয়ে বেতন-ভাতা নেয়া যে নোংরামী সেই জবাব চাওয়াও যে গনতন্ত্র সেই শিক্ষাও তারা দেয় না। তারা শেখায় তারা যেহেতু জনগনকে আর গনতন্ত্রকে ‘উদ্ধার’ করছে, তাই শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি দিয়ে তাদের নধর তুলতুলে শরীরকে আরাম দেয়া মানে গনতন্ত্র।

তারা আমাদেরকে এটা শিখতে দেয় না, দলে গনতন্ত্রের চর্চা সবার আগে। দলের মধ্যেও প্রতিটা পদ নিয়ে সুস্থ প্রতিযোগীতা হবে, নির্বাচন হবে। আমাদেরকে শেখানো হয় দলের প্রধান সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে যে কোন পদে নিয়োগ দিতে পারেন, পারেন সরাতেও। তাদের পর তাদের সন্তানেরা আসবেন তাদের যায়গা নিয়ে নিতে। আমরা বলবো এটাইতো সঠিক; একজনের মাতামহ আর আরেকজনের পিতা দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন না! এটা তো তাদের নৈতিক অধিকার। বাদ যাবেন কেন অন্য নেতারাও – প্রায় প্রত্যেকের সন্তানরাও প্রস্তুত পিতা-মাতার যায়গা নিতে।

ডাকসু সহ দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে। ‘গনতন্ত্রের’ ২১ বছরে হয়নি। আমাদেরকে শেখানো হয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন তাদের সময়ে রাজত্ব করবে আর খাবে সব এটাই গনতন্ত্রের নিয়ম। আর নির্বাচিত হলেই বা কী – আমরা শিখি নির্বাচিত হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান পাজেরো নিয়ে ঘুরে আরামে বেড়াবেন আর তার ওপর ছড়ি ঘুরাবেন অনির্বাচিত সরকারি আমলা। আমরাতো আবার খুশি – যাক উপজেলা নির্বাচনতো হোল! গনতন্ত্র ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ রূপ পেল।

ওরা আমাদেরকে শেখায় নির্বাচনে ভোটটা ঠিকমত দিতে পারা হোল গনতন্ত্র। কিন্তু এটা শেখায় না নির্বাচনে কাকে ভোট দেয়া হচ্ছে সেটাও গনতন্ত্র। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের কথা উঠতে না উঠতেই যে কোটি কোটি টাকার খরচ শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা, সেটার হিসাব নেয়া গনতন্ত্র না। আমরা শিখেই উঠি গনতন্ত্রের নির্বাচন বলে কথা! কোটি কোটি টাকা খরচ তো হতেই পারে। আর এই নির্বাচনের রাজনীতিতে বাধে না যার তার সাথে জোট বাধতে – একজন বেধেছেন বিশ্ববেহায়া এরশাদের সাথে, আর আরেকজন আরো ভয়ংকর, নোংরা জামাতের সাথে।

আর লিখতে ইচ্ছে করছে না, বিবমিষা হচ্ছে। আমার ধারনা আমার লিখায় আমার বক্তব্য আমি গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু এই লিখাটার এই পর্যায়ে এসে মনে হোল এই লিখাটা এলোমেলো হয়েছে। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম লিখাটা লিখতে গিয়ে ক্ষোভে, বিরক্তিতে, ক্রোধে পরিকল্পিতভাবে লিখার স্থিরতাটাই নেই আর। একবার ভেবেছিলাম একবার পড়ে একটু ঠিকঠাক করি। কিন্তু পরে বাদ দিলাম সেই চিন্তা। ভাবলাম, থাকুক না এই লিখাটা এদেশের নষ্ট রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের প্রতি আমার ক্ষোভ, বিরক্তি, আর ক্রোধের প্রমান হয়ে।

পুনশ্চঃ কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন এসব লিখার মানে কি? আমি কি রাজনীতির ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি করে আরেকটা এক এগারোর স্বপ্ন দেখছি? না সেটা না মোটেও, আমি স্বপ্ন দেখি একটা সত্যিকারের কল্যাণমুখী ‘নতুন’ রাজনীতির।