ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

নানা কারনে ডাঃ দিপু মনি এই দেশে একটা সমালোচিত নাম। যার অনেকগুলোই যথেষ্ট যৌক্তিক। তাঁর মন্ত্রনালয় নানা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেননি, এটা বাস্তবতা। তবে আজকের লিখাটা তাঁর একটা সাফল্য নিয়ে যেটা আমাদের জাতির জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

আমি আজকের শিরোনামটা লিখেছিলাম আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারনের জন্য আজ যে রায় দেয়া হোল সেটা নিয়ে। মায়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে আজকের রায় আমাদের পক্ষে গেছে। এটা আমাদের জন্য যে কত বড় সুসংবাদের ব্যাপার সেটা কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না!

পটভূমিটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। আন্তর্জাতিক সমূদ্র আইনে দু’টো দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা এবং স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্ধারিত হয় দুইটি মাধ্যমে – একটি হোল সমদূরত্বের ভিত্তিতে, আর অপরটি হোল ন্যায্যতার ভিত্তিতে। এর মধ্যে কিছু ভীষন টেকনিক্যাল ব্যাপার আছে, সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে এটুকু জানা আমাদের জন্য জরুরী যে মায়ানমার এবং ভারত চেয়েছিল সমদূরত্বের ভিত্তিতে সমাধান। আর আমরা চাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান। এই লক্ষ্যে মায়ানমারের সাথে আমরা মিমাংসার জন্য গিয়েছিলাম সমূদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালত (ইটলস) -এ।

সমদূরত্বের মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তি হলে (অর্থাৎ মায়ানমার এবং ভারত জয়ী হলে) আমাদের সমূদ্র এলাকার আয়তন হোত ১৩০ নটিক্যাল মেইল আর এখন সেটা হবে ২০০ নটিক্যাল মাইল। আর পাশাপাশি ৪৬০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার দাবিদার হবে বাংলাদেশ। সমদূরত্বের নীতিতে সমস্যাটার সুরাহা হলে সমস্যা শুধু কম সমূদ্র এলাকাই না, আমাদের সমূদ্র এলাকা ভারত আর মিয়ানমারের দ্বারা দুই দিক থেকে আবদ্ধ হয়ে পড়তো।

প্রশ্ন হোল কেন আমরা সমূদ্র এলাকা নিয়ে এতো উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। এটা শুধু মৎস্য সম্পদের ব্যাপার না। আমরা অনেকেই হয়তো জানি নানা গবেষনায় দেখা গেছে আমাদের বঙ্গোপসাগর প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলের এক বিরাট খনি। এত টেকনিক্যাল আলোচনার সুযোগ এখানে নেই, কিন্তু এটুকু জানলেই হবে যে আমাদের এই সমূদ্র এলাকার কিছু কিছু জায়গায় এমনভাবে গ্যাস তৈরি হয় যে এখানে গ্যাসের মজুদ শেষ হবার আগেই ক্রমাগত গ্যাস তৈরি হতে থাকবে। আর বলাই তো হয় যে সমুদ্রের সম্পদের হদিস মানবজাতি এখনো প্রায় পুরোটাই পায়নি। তার ওপর এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার ব্যাপার তো আছেই।

এই রায় আমাদের পক্ষে আসায় সমুদ্রে আমাদের গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকের মধ্যে ১৭টি রক্ষা পেয়ে গেল (কয়েকটি বাদ গেলেও যেতে পারে)। এই রায় আমাদের পক্ষে না গেলে ওই ব্লকগুলোতে আমাদের অধিকার থাকতো না – সমদূরত্বের ভিত্তিতে রায় হলে এগুলোতে মায়ানমারের দাবী প্রতিষ্ঠিত হোত। আমরা অনেকেই জানি এই সমস্যার কারনে আমরা সমূদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করতে পারছিলাম না এই ভীষন জ্বালানির সমস্যার মধ্যেও। এবার সেটা শুরু করা যাবে।

এই রায় আমাদের পক্ষে যাওয়াতে ভারতের সাথেও রায় আমাদের পক্ষে যাবার সম্ভাবনাই খুব বেশী। অর্থাৎ এই রায় আমাদের পক্ষে না গেলে সেটা ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানকে দুর্বল করে দিত। প্রসঙ্গতঃ ভারতের সাথেও আমাদের এমন একটা মামলা চলছে নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশ ট্রাইবুনালে যেটার রায় পাবার কথা আছে ২০১৪ সালে।

শুনতে অদ্ভুত শোনাবে যে এই যাবতীয় গবেষনা করা কাগজ পত্র তৈরী করার মূল কাজটি কিন্তু হয়েছে গত তিন বছরে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে। যদিও এই সমস্যা আকাশ থেকে হঠাৎ করে নাজিল হয়নি – চলছে স্বাধীনতার পর থেকে এবং এই সময় যে শেষ ডেডলাইন তাও জানত আগের সব সরকার। কিন্তু না, কেউ এটা নিয়ে কাজ করেনি তেমন একটা। এই পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কর্মদক্ষতায় শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমাদের দেশ তার দাবী পেশ করতে সক্ষম হয়। এই কাজের টেকনিক্যাল দিকটি দেখেছেন এবং দীপু মনির ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মোঃ খুরশেদ আলম (অবঃ)। এই মানুষটির আছেও আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা।

আমরা অনেকেই মানুষের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে জানি না। যাকে দেখতে পারিনা, থাকুক বা নাই থাকুক তার সব কিছুতেই খারাপ খুঁজে বেড়াই। অপর দিকে যাকে পছন্দ করি তার অনেক নোংরা কাজেরও সাফাই গাই। এই ব্লগের বেশীরভাগ ব্লগারের মধ্যেও আমি এই ধরনের আচরন দেখি। আমি নিজে ডাঃ দিপু মনির একজন কড়া সমালোচক, তাঁর সমালোচনার বিস্তারিত আরেকদিন হবে। কিন্তু আজকের এই ঐতিহাসিক রায় বাংলাদেশের পক্ষে আসার কৃতিত্বের জন্য তাঁর প্রতি রইলো অনেক কৃতজ্ঞতা। শুধু তাঁর প্রতি নয় যে দলটি এর পেছনে কাজ করেছে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

কৃতজ্ঞতাটা জানিয়েই মনে হোল এগুলো তো তাঁদের দায়িত্ব, এটাই তো তাঁদের চাকুরী – এর জন্য তাঁরা অনেক বেতন-ভাতা, সুবিধা পান, তাই কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ কেন? পরিহাসের ব্যাপার হোল আমাদের নোংরা রাজনীতিবিদদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ভীড়ে দায়িত্ব পালন করাটাও আমাদের সমাজে আজ ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা পাবার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, তাঁকে এবং তাঁর দলটিকে দেয়া ধন্যবাদ আর স্বীকার করা কৃতজ্ঞতা উঠিয়ে নিচ্ছি না। অনেক অনেক ধন্যবাদ ডাঃ দিপু মনি আর আপনার দলটিকে। আপনাদের এই অবদান এই দেশের মানুষ মনে রাখবে যুগ যুগ ধরে।

পূনশ্চঃ খনিজ সম্পদের এলাকা হাতে থাকা মানেই এটা না যে খনিজের ওপর নিজেদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। নাইজেরিয়া এর জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই আমাদের দেশের সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে যেন আমাদের অধিকার রক্ষিত হয় সেই সংগ্রাম জারি রাখতে হবে।