ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। কিছুক্ষন পর থেকেই এই ব্লগে আসতে থাকবে এটা নিয়ে নানা রকম পোষ্ট, স্মরন করা হবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের, মুক্তিযোদ্ধাদের। দেশজুড়ে কাল হবে নানারকম আনুষ্ঠানিকতা। অন্তত একদিনের জন্য আমরা দারুন ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে উঠবো। গত বিজয় দিবসকে সামনে রেখে এই আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব মাতামাতির বিরুদ্ধে আমি একটা পোস্ট লিখেছিলাম, সেটা এই দিবসেও প্রাসঙ্গিক। তাই লিঙ্কটা দিলাম – বিজয় দিবসঃ বন্ধ হোক স্বাধীনতা, দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি এবং বিক্রি। তবে আজকের লিখাটা ভিন্ন একটা প্রসঙ্গে।

আমি জানি না আজকের এই দিনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের তরুন প্রজন্মের কয়জন জানে – পাকিস্তান নামের কেমন একটা দেশের কেমন পরিস্থিতিতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম স্বাধীনতার কথা চিন্তা করতে? কেমন একটা নতুন জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা জীবন দিয়েছিলো? আজকের ৪১ বছর পরের বাংলাদেশের সাথে আমাদের স্বপ্নের সেই রাষ্ট্রটির কতোটা মিল? অমিলই বা কতোটা?

পরবর্তী আলোচনার আগে ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশ থেকে দুটো অনুচ্ছেদ উদ্বৃত করতে চাই। এটা কিছুটা হলেও আমাদের সেই সময়ের স্বপ্ন সম্পর্কে ধারণা দেবে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি হোল, “আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগনকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদ দিগকে প্রানোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল – জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরেপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে”;

তৃতীয় অনুচ্ছেদটি হোল “আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা – যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে”

আদৌ কি কোন মিল আছে আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রটির সাথে সেই স্বপ্নের জাতিরাষ্ট্রটির? না নেই। কিন্তু কেন হোল এমন? কই সে আলোচনা তো দেখিনা টিভিতে, পত্রিকায়, ব্লগে? কেন? জনগন এসব জেনে গেলে খুব সমস্যা হয়ে যাবে তাই? কিন্তু চলছে নানা রকম বিতর্ক। কে স্বাধীনতার ঘোষক, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ যদি স্বাধীনতার ঘোষণাই করে থাকবেন তবে আবার দীর্ঘ সময় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে আলোচনা করলেন কেন, বা বঙ্গবন্ধু কেন গ্রেফতার হতে গেল পাকিস্তানিদের হাতে এই ধরনের কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিতর্ক আছে। আবার খালেদা জিয়া ওই সময় ক্যান্টনমেন্টে কী করেছেন, বা কোথায় ছিলেন হাসিনা, কী করেছেন এসব নিয়ে ফালতু তর্কও আছে।

আসলে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আর তাদের কাছে নানা ধান্দায় মগজ বিক্রী করে দেয়া ‘বুদ্ধিজীবীরা’ চায় জনগন ব্যস্ত হয়ে থাকুক এসব প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় আলোচনা নিয়ে। এতে জনগনকে সুস্পষ্ট দুইভাগে ভাগ করে ফেলার তাদের চিরকালীন উদ্দেশ্য সফল হয়। আর জনগণ এসব নিয়ে মেতে থেকে আর শক্ত করে হিসেব চায় না স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেখা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বপ্ন নিয়ে কেন ছিনিমিনি খেলা হোল, হচ্ছে। আবার ‘সাধারণ’ মানুষদের মধ্যেও ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্ত অংশটার বেশীরভাগই চায় না এসব প্রশ্ন সবাই তুলুক – স্বাধীনতার ‘সুফল’ এরা তো পেয়েছে অসাধারণভাবে। অথচ এরাই পারতো মানুষকে সচেতন করে গড়ে তুলতে।

আমার শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে ওই সময়কার ইতিহাস, ঘটনাপ্রবাহের আলোচনা করা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। না সেটা না, এটা চলতেই হবে (ফালতু তর্কগুলো ছাড়া); আমাদের নতুন প্রজন্ম এসব আলোচনা শুনে, দলিলপত্র/ভিডিও দেখে, বুকে ধারন করে বেড়ে উঠবে – আমি ভীষণভাবে এর পক্ষে। একটা জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের তো বটেই, অন্য সব ক্ষেত্রের নৈর্ব্যক্তিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ। কিন্তু এই আলোচনা কি স্বাধীনতার চেতনা এবং তার বাস্তবায়নের আলোচনার চাইতে বড়? তার চাইতে বেশী অগ্রাধিকার দাবী করে? আর যখন দেখি আমাদের এই আলোচনাগুলো আমাদের সবাইকে মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে তখন এই আলোচনার আতিশয্য মাঝে মাঝে বিরক্তিও উদ্রেক করে।

আজকের একজন কিশোর বা তরুনকে জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে তারা ওইসব ঐতিহাসিক বিতর্ক সম্পর্কে হয়তো জানে কিছুটা। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা কেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলাম সেটা কিন্তু প্রায় সবাই জানে না। ওদের আসলে কোন দোষ নেই – ওদেরকে আমরা যা জানিয়েছি সেটাই তারা জেনেছে; যা জানাইনি সেটা জানেনি তারা। একচল্লিশ বছর পার হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির, কিন্তু এখনো আমরা এই বিজয়ের হ্যাংওভার কাটিয়ে উঠে, ওই অনাবশ্যক বিতর্কের উর্দ্ধে উঠে আমাদের স্বপ্নের জাতিরাষ্ট্রটি গঠনের কাজ করতে পারিনি – এটা হাস্যকর রকম ব্যর্থটা। আর ভয়ঙ্কর ব্যাপার হোল কাজ করা দূরে থাকুক সেই জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখাটুকু পর্যন্ত সবাইকে জানতে দেইনি। তার ফল আমরা আমাদের রাষ্ট্রটিকে দেখলেই বুঝতে পারি।

১৯৭১ এর আগে আমরা শোষিত হতাম পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে দিয়ে। এখন আমাদেরকে দিয়েই – আমাদের রাজনৈতিক দল, আমলা, লুটেরা ব্যবসায়ীদের দিয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের এই অবস্থা দেখে খুব মনে পড়ে এডওয়ার্ড সাঈদ, আর গায়ত্রী দেবী স্পিভাক দের কথা। তাঁরা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন সশস্ত্র যুদ্ধ বা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর ‘স্বাধীনতা’ আসলে স্বাধীনতা না; তাঁরা চমৎকারভাবে বলেছেন ওটা আসলে ‘ট্রান্সফার অব পাওয়ার’ – ভিনদেশী মানুষকে শাসনের আসন থেকে সরিয়ে নিজে সেখানে বসে পড়ার চেষ্টা।

আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পরে। বেড়ে ওঠার পর থেকে যে বাংলাদেশ আমি দেখেছি, দেখছি এখনো, তাতে এটাকে আমি স্বাধীনতা বলতে প্রস্তুত নই – এটা আসলে আমাদের দেশের ‘ট্রান্সফার অব পাওয়ার’। আগে উল্লেখ করা ১৯৭২ এর সংবিধানের প্রস্তাবনার ওই দুই অনুচ্ছেদ দেখলে ঠিক সেটাই স্পষ্ট হয়। হ্যাঁ আমাদের দেশে শুধু ‘শোষকের পরিবর্তন’টাই হয়েছে। আর শোষনের টাকা যেহেতু দেশেই থাকছে, পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে না, তাই দেশে অজস্র দালানকোঠা আর দামী গাড়ি দেখা যায়, এই যা। এবার কি অতি ‘দেশপ্রেমীক’(?!) পাঠকরা আমাকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বা ‘রাজাকার’ খেতাবটা দিয়েই দেবেন? দিন, সত্য বলতে গিয়ে ওসব আমলে নেই না। আর মানুষকে সত্য জানানো কোনদিন আমাদেরকে ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ পাবার পথ খুলে দেবে আশা করি।

***
ফিচার ছবি: মুস্তাফিজ মামুন/বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/ঢাকা, মার্চ ২৫, ২০১২