ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

আজকের লিখাটা ধর্ষনের একটা দিক নিয়ে। বিষয়টা নিয়ে লিখবো বলে ভাবছিলাম বেশ কিছুদিন থেকেই। এর মধ্যেই অন্য অনেক লিখা লিখতে গিয়ে সময় করে উঠতে পারছিলাম না। তবে মার্চ মাসে ব্যাপারটা এতো বেশী কানে এলো যে ভাবলাম লিখেই ফেলা যাক।

মার্চ মাসে স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে অনেককে বলতে শুনেছি, আমরাও অনেকে বলি “ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত/সম্ভ্রমের বিনিময়ে” আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এখানে লক্ষ্যনীয় শব্দ হোল ইজ্জত/সম্ভ্রম।

যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন ধর্ষণ শব্দটা পত্রিকা থেকে শিখেছিলাম। বন্ধুরা কেউ কেউ সিনেমা হলে বাংলা সিনেমা দেখে গল্প বলার সময় ধর্ষনের ঘটনা থাকলে সেটাকে বলতো ‘নষ্ট করা’। ধীরে ধীরে দেখলাম আমাদের সমাজে মানুষ ধর্ষনকে একটা নিষিদ্ধ শব্দ হিসাবে ধরে নিয়েছে। তাই এই শব্দের নেগেটিভিটি কমাতে তৈরি করেছে নানা ইউফেমিষ্টিক শব্দ – সম্ভ্রমহানি, বেইজ্জতি হওয়া, শ্লীলতাহানি, ইজ্জত লুট হওয়া ইত্যাদি। যেহেতু ইউফেমিষ্টিক নয়, তাই ‘নষ্ট’ শব্দটা বাদ দেই। তাই আমার আলোচনা অন্য শব্দগুলোকে নিয়ে, কারন এই শব্দগুলো এখনো আমাদের ‘ভদ্র/শিক্ষিত’ সমাজে অনেক ব্যবহৃত হয়। তো ঐ শব্দগুলো ব্যবহার করার সময় আমরা কি ভেবে দেখি যে এই শব্দগুলো আদতে কেমন? এই শব্দগুলো ধর্ষণ নামক ভয়ানক অমানবিকতাকে কতোটা ‘শালীন’ করেছে? ধর্ষিতাকে সমাজের চোখে কতোটা সন্মান দিয়েছে?

ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইউফেমিজম বিরোধী মানুষ। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ভাষায় ওসব মারপ্যাঁচ মেনেই নেই। কিন্তু ধর্ষনের ক্ষেত্রে আমার প্রথম প্রশ্ন হল এটার ইউফেমিষ্টিক শব্দ লাগবে কেন? শব্দটা কি খুব কর্কশ? খুব নোংরা? এটা হওয়াইতো ভাল। পৃথিবীর সবচাইতে ভয়ঙ্কর, নোংরা অপরাধের একটিকে প্রকাশকারী শব্দটির ভেতরেই তো ঐ কাজটির নোংরামী, ভয়ঙ্করতা প্রকাশিত হওয়া উচিত। তো আমরা ধর্ষণকে বোঝাতে অন্য শব্দ আমদানী করছি কেন? শব্দগুলো ক্ষতিকর না হলে না হয় গুরুত্ব নাই দিতাম; কিন্তু আমার বিবেচনায় এই শব্দগুলো ভীষণ রকম নোংরা এবং ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর!

অনেক আগে শোনা শব্দটি দিয়ে শুরু করি (শব্দটি যদিও তথাকথিত ইউফেমিষ্টিক শব্দ নয়) – ‘নষ্ট হওয়া’। গ্রামাঞ্চলে এখনো শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একজন নারী ধর্ষিত হলে তিনি ‘নষ্ট’ হয়ে যান! আর বাংলায় সম্ভ্রম, ইজ্জত আর শ্লীলতা শব্দগুলো প্রায় সমার্থক হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যার মানে সন্মান বা মান-মর্যাদা। অর্থাৎ যিনি ধর্ষিত হন তাঁর সন্মান বা মান-মর্যাদার ‘হানি’ হয় বা ওসব ‘লুন্ঠিত’ হয়।

প্রশ্ন আসতে পারে শব্দ নিয়ে এই ‘কপচাকপচি’ কেন? আমি বিশ্বাস করি এই অত্যন্ত অবমাননাকর শব্দগুলো আমাদের দেশে ধর্ষণজনিত আত্মহত্যা আর প্রচন্ড মানসিক বৈকল্যর জন্য অনেকাংশে দায়ী। একজন নারী বেড়ে ওঠার সময় কৈশোরে, তারুন্যের শুরুতে এই শব্দগুলো যখন শুনে থাকে তখন তার মধ্যে এই শব্দগুলো একটা ভীষন ভয়ঙ্কর ধারনা তৈরী করে দেয় না? আর গ্রামের মেয়েটিতো শোনে ধর্ষিত হওয়া মানে ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া। শুধু নারী হবে কেন, সমাজের পুরুষ মানুষগুলোও ধর্ষিতাকে দেখে সম্ভ্রম/ইজ্জত/শ্লীলতা হারিয়ে ফেলা মানুষ হিসেবে।

এবার ধর্ষিতা নারীটির মনস্তত্ত্ব যদি খেয়াল করি তবে দেখা যাবে, ওই নারী ধর্ষন পরবর্তী শারীরিক এবং মানষিক যন্ত্রনার সাথে ভুগতে থাকে সম্ভ্রম/ইজ্জত/শ্লীলতা হারিয়ে ফেলার গ্লানিতেও। তাই তার ওপর চাপিয়ে দেয়া ভয়ঙ্কর অপরাধটির পর কোথায় সে আমাদের সর্বোচ্চ সহানুভূতি, সহমর্মিতা পাবে, তা না; সে আমাদের কাছে ‘লজ্জায়’ মুখ দেখানোর সাহস পায় না। আজো অজস্র নারী এজন্য আত্মহত্যা করে। অনেকে সেটা না করলেও সম্ভ্রম/ইজ্জত/শ্লীলতা হারিয়ে ফেলার গ্লানিতে ভুগতে থাকে আজীবন।

শুধু তাই না, যেহেতু ধর্ষিত হওয়া মানে সম্ভ্রম/ইজ্জত/শ্লীলতা হারিয়ে ফেলার ব্যাপার তাই এটা হয়ে গেলেও গোপন করে রাখতে হবে, আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে না, এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজ লালন করে যাচ্ছে দীর্ঘকাল থেকে। আর এতে তো ধর্ষণকারীর পোয়াবারো। তার ওপর ধর্ষনের ঘটনা জানাজানি হলে গ্রামাঞ্চলে এখনো ধর্ষিতাকে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়া হয় ইজ্জত রক্ষা করার স্বার্থে। কী মর্মান্তিক!

আমাদের শব্দ ব্যবহার কোন বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে নিঃসন্দেহে। ধর্ষনের ক্ষেত্রে আমাদের ওই শব্দগুলো ব্যবহার করা প্রকারান্তরে ধর্ষন এবং ধর্ষিতা সম্পর্কে আমাদের ভয়ংকর নির্মম মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যার মাশুল আমাদের ধর্ষিতা নারীরা দিয়ছে যুগ যুগ ধরে। আর শুধু এই কারনেই মানুষের প্রতি সবচাইতে ভয়ংকর একটা অপরাধের একটি করেও ধর্ষক পার পেয়ে যায়, সাহস পায় বার বার ঐ অপরাধ করার।

প্রশ্ন হোল শব্দের পরিবর্তন কি ধর্ষন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পালটে দেবে? না, কিন্তু আমি মনে করি এ-টা পরিবর্তনের পথে সাহায্য করবে। নারীরা জানুক কেউ যদি কখনো ধর্ষিত হয়েই যায়, তাতে তার গ্লানির কিছু নেই, তার জন্য মরতে তো হবেই না, বরং মানসিক বৈকল্যে ভোগারও কিছু নেই। আমাদের উচিৎ হবে ধর্ষিতাকে সব রকম সহানুভূতি, সহমর্মিতা দেখিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা যেন আর কোনদিন কোন নারী বা তার পরিবার ধর্ষনের ঘটনা চেপে না যায়, প্রতিবাদী হয়, আইনের আশ্রয় নেয়।

তাই আসুন সবক্ষেত্রেই বর্জন করি ধর্ষনের নির্মম সব ‘ইউফেমিষ্টিক’ শব্দ। ধর্ষনকে ধর্ষনই বলি।