ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

অবশেষে সুরঞ্জিত বাবুকে পদত্যাগ করিতে বাধ্য করা হইল। বিগত কিছুদিন যাবৎ ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হইল সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এপিএস এর গাড়িতে ৭০ লক্ষ টাকা প্রাপ্তি। টাকাটা কি ঘুষের না এপিএস এর শ্যালিকার বিবাহের নিমিত্ত শ্যালক কর্তৃক সুদূর বিলাত হইতে প্রেরিত, সেইটা নিয়া তুমুল বিতর্ক টিভিতে, ব্লগে। আলোচনা এইটাও হইতেছে যে তাঁহার বিরুদ্ধে সম্ভবতঃ বিশাল চক্রান্ত হইতেছে। এই ব্লগের ব্লগার কাহারো মনে অনেক প্রশ্ন জাগে! কাহারো মনে উঁকি দেয় তাঁহার সাথে কোন ষড়যন্ত্র চলিতেছে কিনা!

প্রশ্ন উদিত হইয়াছে টাকার পরিমাণ কি শুধুমাত্র ৭০ লক্ষ? নাকি ৪ কোটি ৭০ লক্ষ? আমি আমার আলোচনার সুবিধার্থে ধরিয়া লইলাম টাকার পরিমাণ একটা ‘রাউন্ড ফিগার’ – ৫ কোটি। এবং ধরিয়া লইলাম এই টাকাটা ছিল ঘুষের টাকা এবং সেটা আমাদের মাননীয় রেলমন্ত্রীর ভাগের টাকা। ঐ রাতে ঐ লোকগুলো ওই টাকা মন্ত্রীকে বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য তাঁহার বাসায় যাইতেছিল। এই পরিস্থিতিটা নিতান্ত কাল্পনিক; সবাইকে ব্যাপারখানা এইভাবেই কল্পনা করিয়া লইতে অনুরোধ করিতেছি আমার পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে।

আমি ভীষণ অবাক হইয়া ভাবিতেছিলাম সুরঞ্জিত বাবুর ঘুষের টাকা টাকা বিষয়ক এই ঘটনা লইয়া এতো শোরগোল হইতেছে কেন? এইটা তো মাত্র ৫ কোটি টাকার ব্যাপার! আমি সুরঞ্জিত বাবুর উপর এই ঘটনায় বিন্দুমাত্রও ক্ষিপ্ত তো হই ই নাই বরং তাঁহার জন্য আমার ভীষণ সহানুভূতি , অনেক করুণা হইয়াছে। বরং আমি মহা ক্ষিপ্ত এবং বিরক্ত বোধ করিতেছি ঐ লোকগুলোর উপর যাহারা এই সামান্য ঘটনা লইয়া সুরঞ্জিত বাবুকে যাহা ইচ্ছা তাহা বলিতেছেন।

তবে এইটা সত্য যে বাবু এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়াছেন কিঞ্চিৎ নিজের দোষেই। তাঁহার ভাষ্যমতেই তিনি এই দেশের বিখ্যাত তীরন্দাজ – ইতোপূর্বে তিনি নানা কারণেই বহু লোকের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিয়াছেন বিস্তর। এখন এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা তীর তাঁহার দিকে নিক্ষিপ্ত হইতেছে একের পর এক। পরিহাসের বিষয় বিখ্যাত তীরন্দাজ আজ নিজেই অসংখ্য তীরের আঘাতে ‘তীরাহত’। তাঁর প্রতি সব তীর নিক্ষেপকারীর প্রতি আমি আহ্বান জানাই, তাঁর এই দুর্দিনে তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ বন্ধ করুন সবাই।

শেয়ার মার্কেটে অজস্র মানুষকে দেউলিয়া করিয়া দিয়া হাজার হাজার কোটি টাকা যাহারা লোপাট করিয়াছিল তাহাদের তো কিছু হয়ই নাই, বরং তাহারা এখনো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশেই আছেন। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে যাহার হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করিল, করিতেছে এখনো, তাহাদেরও অবস্থাও শেয়ার বাজারের খেলোয়াড়দের মতোই। প্রধানমন্ত্রী তনয়, তাঁর সহোদরা, এবং অনেক মন্ত্রীর নামে শত শত কোটি (মতান্তরে হাজার হাজার কোটি) টাকা দূর্নীতির অভিযোগ শুনিতে পাই। কই, ইহাতে তো আমাদের গাত্রদাহ হয় না। ইহার পূর্বের বিএনপির ডাইনেষ্টির সময় রাজপুত্রের নেতৃত্বে তাঁহার ইয়ার-বন্ধুদের হাজার হাজার কোটি টাকার গল্পও তো আমরা বিস্মৃত হই নাই। তো সকল গাত্রদাহ কেন শুধু আমাদের সুরঞ্জিত বাবুর প্রতি হইবে?

পত্রিকান্তরে জানিলাম এই ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সুরঞ্জিত বাবুর উপরে যারপর নাই ক্ষিপ্ত হইয়াছেন। ইহা কি ঘুষ খাওয়ার জন্য? নাকি তাঁহার একজন নেতা সুদীর্ঘ ৫৫ বছর রাজনীতি করিয়াও ঠিকমত ঘুষ খাইতে শিখিল না কেন সেই জন্য? অনুমান করি কারণ পরেরটা। আসলেই তো একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য ভালভাবে, ধরা না পড়িয়া ঘুষ খাইতে না পারাটা একটা অযোগ্যতা, অথর্বতা।

শুনিতে পাই সরকারি অফিসে যে সকল কর্মকর্তা ‘সৎ’ বলিয়া পরিগণিত হন তাঁহারা তাঁহাদের ভাগের টাকাটা খান, তবে তাঁহারা পাবলিকদিগকে নিজে ‘ঠ্যাক’ দিয়া খান না। অসৎ কর্মকর্তাগণ ভাগেরটা তো খানই নিজে আলাদা ‘ঠ্যাক’ দিয়াও খান। আমি কোনভাবেই বিশ্বাস করিতে চাহি না যে আমাদের সুরঞ্জিত বাবু নিজে কেহকে ঠ্যাক দিয়াছেন; আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে তিনি শুধু তাঁহার ভাগের টাকাটাই গ্রহন করিতে চাহিয়াছিলেন। এমনকি আমি এই বিশ্বাসও তাঁহার উপরে রাখি যে তিনি টাকার অঙ্ক লইয়া ন্যূনতম দরাদরিও করেন নাই। খুশী হইয়া তাঁহাকে যাহা দেওয়া হইয়াছে তিনি তাহাতেই খুশী ছিলেন। যতো যাহাই বলি না কেন তাঁহার তো ‘বাম’ ঐতিহ্য আছে।

একটা মানুষের অপরাধ, দোষ সময় এবং স্থানের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হওয়া উচিৎ। আমি এতক্ষন যাহা বলিলাম তাহাতে কি মাত্র ওই ৫ কোটি টাকার জন্য সুরঞ্জিত বাবুকে বিন্দুমাত্র দোষ দেওয়া যায়? তাঁহার উপর যাহা হইতেছে তাহা কি ভীষণ অন্যায় নহে?

অর্ধ শতাব্দীর অধিককাল রাজনীতি করিয়া জীবন এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে আসিয়া প্রথমবারের মত তিনি মন্ত্রী হইয়াছিলেন। তাও মাত্র ২ বছরের জন্য। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি এইবার এই সময়ের মধ্যে মাত্র ২০/৩০ কোটি টাকার মালিক হইতে পারা তাঁহার নৈতিক অধিকার ছিল। কোথায় তাঁহার জাতিসেবা করার জন্য আমরা তাঁহার পক্ষে কথা বলিব, ন্যায্য হিস্যা পাইয়াছেন কিনা তাহার খোঁজ নিব, ভাল মানুষ পাইয়া তাঁহাকে ঠকানো হইলে প্রতিবাদ করিব; সেইখানে আমরা কিনা অকৃতজ্ঞের মত তাঁহার মুণ্ডুপাত করিয়াছি। যার অনিবার্য ফলশ্রুতি হইল তাঁহাকে পদত্যাগে বাধ্য করানো।

আমি তাঁহাকে পদত্যাগ করিতে বাধ্য করানোর তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। এবং অনতিবিলম্বে তাঁহার উপর হয়রানিমূলক সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানাইতেছি। এই ব্লগের ব্লগারদের পক্ষ হইতে তাঁহার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করিতেছি। আমরা তাঁহাকে স্বীয় পদে আবার আসীন করার দৃঢ় আহ্বান জানাইতেছি। সেই সাথে প্রস্তাব দিতেছি এই দাবী আদায়ের জন্য রাস্তায় ব্লগারদের মানববন্ধন করা হউক এবং ব্লগে ব্ল্যাক আউট করা হউক। কোথাকার কোন সাগর-রুনিকে লইয়া আমরা, ব্লগাররা অহেতুক পেরেশানির চূড়ান্ত হইতেছি। কিন্তু এহেন একজন জনদরদী, সৎ, প্রাজ্ঞ, রসিক, বাকপটু, বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান রাজনীতিবিদের বিপদের দিনে কি আমরা কিছুই করিব না তাঁহার জন্য?