ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আজ সকালে আমাদের সহব্লগার সুলতান মির্জার পোষ্ট (সোহেল তাজ কাপাসিয়ার উন্নয়ন বঞ্চিত জনগণের সাথে প্রতারণা করেছেন!) এসেছে সংসদ সদস্যের পদ থেকে সোহেল তাজের পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে। ওর পোষ্টটি আর মন্তব্যগুলো পড়ে মনে হল কিছু কথা লিখা দরকার। মন্তব্যটি দীর্ঘ হয়ে যাবে তাই একটা পূর্ণাংগ পোষ্ট লিখে ফেলার সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললাম। কারন আমার মনে হয় আমরা অনেকেই কোন ঘটনা দেখা এবং বিশ্লেষণ নিরপেক্ষভাবে করতে পারি না। আমি এটা অবশ্যই দাবি করি না যে আমি এক মহা নিরপেক্ষ, প্রকান্ড বিশ্লেষক হয়ে গেছি। আমি আসলে নিজেকে বিশ্লেষকই মনে করি না। সমাজ, রাজনীতির একজন মনোযোগী ছাত্র আমি; তাই চেষ্টা করি আশপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিজের মত করে নিরপেক্ষভাবে বুঝতে।

আসা যাক মূল প্রসঙ্গে – প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সোহেল তাজের পদত্যাগের ঘটনা অনেকদিন আগের। আর অল্প কিছুদিন আগে তো তিনি সংসদ সদস্যের পদ থেকেই পদত্যাগ করলেন। এমনকি রাজনীতি থেকেও (তাঁর লিখা চিঠির একটা অনুচ্ছেদ শুরু হয়েছে এভাবে – সক্রিয় রাজনীতিতে পুনরায় আসার সম্ভাবনা না থাকলেও………)। তাঁর এই সব ঘটনা আমাকে কিছু বার্তা দিয়ে গেছে; সেগুলো নিয়েই আজকের লিখাটা।

বার্তাঃ ১
এই দেশের রাজনীতি এখন শুধু কোটি কোটি টাকার ব্যাপার না, এটা এখন হাজার হাজার কোটি টাকার একটা ইন্ডাষ্ট্রি (বানিজ্যের ভাষায়)। এই লুটপাটের হিস্যা নিয়ে তো পরষ্পরের মধ্যে ঠোকাঠুকি আছে, চলবে। তবে লুটেরা রাজনীতিবিদদের কাছে বেশী ভয়ঙ্কর কিন্তু তারা যারা আখের গোছাতে রাজনীতিতে আসেনি। কারণ এদের সংখ্যা বেড়ে যাতে থাকলে তাদের নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখা আখেরে কঠিন হয়ে উঠবে। তাই এদেরকে যেভাবেই হোক রাজনীতি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। আর এই পথে দুই দলের দুই প্রধান সবসময় টাউটদের পক্ষেই। তা না হলে তাঁর নেত্রী তাঁর সমস্যার সমাধান করে তাঁকে রাখলেন না কেন? নরসিংদীর মেয়র লোকমানকে হত্যা করার পর আমি এই বিষয়টা নিয়ে একটা পোষ্ট লিখেছিলাম – আরো অনেক লোকমান খুন হবে; খুব বেশি দেরি নেই আর!

বার্তাঃ ২
উপরের বার্তার আলোকে বলা যায় আমরা যারা মনে করি রাজনীতিতে ভাল মানুষদের আসা উচিৎ, বা আমাদের মধ্যে যেসব ভাল মানুষ রাজনীতিতে আসতে চান মানুষের প্রকৃত কল্যান করতে, তাঁদের এই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে যে সামনে ভীষণ কঠিন যুদ্ধ অপেক্ষা করছে। কপালে জুটে যেতে পারে কোন সম্রাজ্ঞীর আত্মীয় বা চ্যালাচামুন্ডার চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে প্রাণহানি পর্যন্ত। তাই নামতে হবে ভীষণ আঁটঘাট বেঁধে।

বার্তাঃ ৩
পরিবার-পরিজন বিদেশে ফেলে রেখে রাজনীতি করা যাবে না। অনেকের দৃষ্টিতে অনেক ‘সৎ’ মানুষ সোহেল তাজ কিন্তু মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের আগে থেকেই স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ছুটে গেছেন দফায় দফায় এবং সেটা দীর্ঘ সময়ের জন্য। এটা কি অনৈতিক নয়? বর্তমান ডাইনেষ্টির রাজপুত্রও (ভবিষ্যতের সম্রাট) তাঁর স্ত্রী-সন্তানের মায়া ছেড়ে দেশে কদাচিৎ ই আসতে পারেন – তবে যখনই আসেন তখনি আমাদের জন্য থাকে ‘নসিহত’। আমাদের উচিৎ বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদদেরকে সাফ বলে দেয়া আমাদেরকে ‘নসিহত’ আর ‘সেবা’ করতে চাইলে (অর্থাৎ রাজনীতি) এই ‘নোংরা’, ‘পচা’ দেশে থেকেই সেটা করতে হবে।

বার্তাঃ ৪
এটা নিয়ে সবাই লিখেছেন – যুদ্ধে নেমে ময়দান ত্যাগ করা। এটা এই জাতির মানুষদের চিরকালীন সমস্যা। এই দলের মধ্যে থকে তিনি যুদ্ধ করতে পারতেন, না পারলে দলের বাইরে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক পরিকল্পণা করতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি পদত্যাগ করেছেন রাজনীতি থেকেই (এই ব্যাপারে আগেই তাঁর চিঠি থেকে উদ্বৃতি দিয়েছি)। তাঁর দলের যে মানুষটা তাঁর জায়গাটা নেবেন প্রায় শতভাগ সম্ভাবনা আছে সেই মানুষটা অসৎ। অন্তত এই একটা থানায় এই ঘটনাটা ঘটেছে সোহেল তাজের ‘অভিমান’ এর কারণে।

বার্তাঃ ৫
যাবতীয় সব ‘তুঘলকি’ কান্ডের দেশ এটা। প্রতিমন্ত্রীত্বের পদ থেকে পদত্যাগের পরও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাঁর পদত্যাগ নিয়ে যা করেছেন সেটা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে (পড়ুন – মন্ত্রিসভার বৈধতা ও শহীদ সোলেমান পরিবারের প্রার্থনা)সংবিধান লঙ্ঘনের পর্যায়ে। আর একই রকম ‘খেলা’ শুরু হচ্ছে এখন সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ নিয়েও। তাই আমরা আবারও নিশ্চিত হলাম এই দেশ শাসিত হয় সম্রাজ্ঞীদের দ্বারা – আইন, সংবিধান এসব শুধু প্রজাদের জন্য, তাঁদের জন্য প্রযোজ্য না।

বার্তাঃ ৬
দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখলাম আমরা। সোহেল তাজ লিখেছেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আমার বাবা তাজউদ্দীন আহমদের আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগই আমার শেষ ঠিকানা’। কিন্তু তিনি যদি বলতেন তিনি এই আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করছেন কারণ এটা তাঁর বাবার আদর্শের আশেপাশেও নেই – এটাও এখন আপাদমস্তক লুটেরা আর সন্ত্রাসীদের দল হয়ে গেছে, তাহলে আমরা তাঁর সততা আর সত্য বলার সৎ সাহস দেখে মুগ্ধ হতাম।

বার্তাঃ ৭
সোজাসাপ্টা কথা বলতে পছন্দ করে না এদেশের রাজনীতিবিদরা। কী কারণে সোহেল তাজের এই অভিমান সোজাসুজি জনগনকে জানালেন না কেন তিনি? আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি সরকারের এবং প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ কেউ তাঁর সাথে ভয়ঙ্কর রকম অন্যায় করেছেন। তিনি বলেছেন “কথার পেছনে অনেক কথা থাকে। অনেক লুকায়িত সত্য থাকে। যা দেশ, জনগন ও দলের বৃহত্তর স্বার্থে জনসমক্ষে বলা উচিৎ নয়”। অথচ তিনি খোলাখুলিভাবে সব বলে দিলে এটা তাঁর দলকে চাপের মধ্যে ফেলত এবং আখেরে তার দলটিই উপকৃত হত – তাঁর দল আর নেত্রী এতোটা যাচ্ছেতাই করে ফেলতো না সব ক্ষেত্রে।

বার্তাঃ ৮
সরকারের ‘হাত’ এত বড় যে সুদূর আমেরিকায় থাকার পরও সেটা মানুষকে ভীত করে! তাঁর বক্তব্যের যে অংশটা আগের অনুচ্ছেদে দিয়েছি তার পরের বাক্যটিই হল – “আর তা সম্ভবও না”। তো কেন সেই সত্য বলা সম্ভব না? সরকার ভীষণ ধমক দিয়েছে? সরকার কি তার ‘হাত’ এর দৈর্ঘ্য দেখিয়ে দিয়েছে?

জানি এসব বার্তা পুরনো; তবুও লিখলাম আবার কারন এগুলো আবার মনে করিয়ে দেয়া হল। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব দুঃখ পেয়েছি তার মত মানুষকে এভাবে সরে যেতে দেখে। তিনি তাঁর এলাকার সব জনগনকে সাথে নিয়ে সব প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকতে পারলে আমরা নারায়ণগঞ্জের আইভির মত আরেকজন রাজনীতিবিদ পেতাম যিনি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জনগনের সত্যিকার কল্যাণকামী রাজনীতিবিদদের মশাল খুব ক্ষীন শিখাযুক্ত হলেও ধরে রেখেছেন।