ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব বিভাস চন্দ্র সাহা দুই দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন তাৎক্ষনিকভাবে। এমনিতেই সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কোন কিনারা না করতে পেরে সরকারের লেজেগোবরে অবস্থা; সাংবাদিকদের তোপের মুখে আছে সরকার – তার ওপর আরেকজন বিখ্যাত সাংবাদিকের মৃত্যু সরকারকে তো বিপদে ফেলে দেবে আরো। তাই ওই শোকবার্তায়ই প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষনিক শক্ত নির্দেশ দিয়েছেন বাস চালক মফিজকে গ্রেফতার করার জন্য।

জাদুমন্ত্রের মত আজ ধরাও পড়ে গেছেন সেই বাসের চালক মফিজ। আমাদের বিখ্যাত মানুষদের মৃত্যুতে আমাদের এই অতি সংবেদনশীলতা, আর অবিখ্যাত এবং ‘নীচুশ্রেণী’র মানুষের মৃত্যুতে অসংবেদনশীলতাকে আমার কাছে আমাদের ব্যক্তির, সমাজের, রাষ্ট্রের চরম এক অমানবিকতা বলে মনে হয়। এটা দেখে এই ব্লগের প্রথম দিকে আমি একটা পোষ্ট লিখেছিলাম – আরও অনেক ‘তারেক মাসুদ’ এর মৃত্যু এবং অনেক ‘রুমানা মঞ্জুর’ এর অন্ধত্ব চাই। অবশ্য আমার আজকের এই পোষ্টের বিষয় ভিন্ন।

তো ওই দুর্ঘটনা ঘটানো বাসের চালক মফিজকে আজ সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হল – অনুমান করি বিক্ষুব্ধ সাংবাদিকদের শান্ত করার জন্য। তো সেখানে জানা গেল লিখতে পোরতে না পেরেও, ট্রাফিক সংকেত না চিনেও তিনি লাইসেন্স পেয়েছেন শুধু একটা কাগজে সই করেই। তাঁকে কোন পরীক্ষাই দিতে হয়নি।

খবরটার সাথে মফিজ সাহেবের যে ছবিটা দেয়া হইয়েছে তাতে দেখা যায় তিনি কাঁদছেন সংকেত না চিনলেও লাইসেন্স পান চালক মফিজ। অনুমান করি তাঁকে গ্রেফতার করার পর আমাদের পুলিশ বাহিনী তাঁকে চিরাচরিত নিয়মে ‘আতিথেয়তা’ দিয়েছেন (এর পর আবার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে)। এটা দেখে অনেকেই খুশী হয়েছেন নিশ্চয়ই – একটা ‘মূল্যবান’ প্রাণ নষ্ট করে দেবার জন্য এই লোকের শুধু উত্তম-মধ্যম ই না ফাঁসী/যাবজ্জীবন কারাদন্ডই হয়ে যাওয়া উচিৎ।

মানূষটাকে দেখে আমার কিন্তু ভীষণ মায়া হয়েছে। এই মানুষটার তো ড্রাইভিং লাইসেন্সই পাবার কথা ছিল না – সেটা হলে তো আজ তিনি এমন একটা ঝামেলায় পড়তেন না। করতেন কিছু একটা যেটা করে হয়তো কোন রকমে দিন গুজরান করতে পারতেন। তাঁকে লাইসেন্স তো তিনি নিজে দেননি। তো তিনি যদি অপরাধী হন, অপরাধী কে না?

লাইসেন্স ইস্যু করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বি আর টি এ। দুই নম্বরী লাইসেন্স আর গাড়ির দুই নম্বর কাগজ বানিয়ে ওই সংস্থার অতি ছোট কর্মচারীও কোটিপতি বনে গেছে – এমন মানুষকে আমি নিজেও চিনি। আমাদের বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী শুরুতে ২/১ বার খলিফা হারুনুর রশিদের মত হঠাৎ করে ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন অনিয়ম ধরতে – কিন্তু ফলাফল কী? সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বরি থোড়। সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে ওইসব সস্তা হাততালি পাবার কাজ দিয়ে কিছু হয় না। তো ওই প্রতিষ্ঠানের এই ভয়ংকর খেলার দায় কি যোগাযোগমন্ত্রীর না?

আবার ওখানে যদি শক্ত হতে চাওয়া হয় তবে সেটা বন্ধ করার জন্য তো আমাদের প্রবল পরাক্রমশালী নৌ পরিবহনমন্ত্রী আছেনই। তাঁর এমনই প্রতাপ যে তাঁর মন্ত্রনালয় বাদ দিয়ে তিনি এই সেক্টর নিয়ে পড়ে থাকেন। অবশ্য কয়েকদিন আগে নিজে দূর্ঘটনায় পড়ে মরতে মরতে বেঁচে যাবার পর ওই চালককে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করিয়েছিলেন। নিজের জীবন বলে কথা – তখন পরিবহণ শ্রমিকের প্রতি মায়াকান্না কাজ করেনি।

এখন প্রশ্ন জনাব মফিজের ভয়ংকর অযোগ্যতা সত্ত্বেও লাইসেন্স কেন পেলেন? আমাদের সামনে দিনে দুপুরে কীভাবে লাইসেন্স দেয়া হয় আমরা জানি না আমরা? তো সেই ভয়ংকর অপরাধের মূল অপরাধী যোগাযোগমন্ত্রী, বি আর টি এ এর কর্মকর্তা, আর এটার সংস্কারে বাধা দানকারী নৌপরিবহনমন্ত্রীকে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি কেন? এদের তুলনায় জনাব মফিজের দায় কতোটা?

ঘটনার পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী হুংকার দিয়ে চালককে ধরালেন। বাহ! খেয়েছেন অনেকে – আমি খাইনি। আমি এটা দেখলে খুশী হতাম যদি তিনি যোগাযোগ আর নৌপরিবহনমন্ত্রীকে ডেকে অবিলম্বে মানুষের জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে বলতেন, হুমকি দিতেন যে এই সেক্টরে এসব ফাজলামো বন্ধ না হলে দুই জনেরই চাকুরী থাকবে না। কিন্তু না তিনি সেটা বলেননি, এঁরা এসব বলেন না। এঁরা এই দেশে রাজনীতি করে এদেশের মানুষের হাড়-মজ্জা চেনেন – জানেন মানুষ কোনটা খায়।

ভয়ংকর মূল অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে দিয়ে, অপরাধ তৈরি হবার মূল জায়গাটাকে পরিশুদ্ধ না করে (এই অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা এই জায়গাটা স্পষ্টভাবে জানি, অপরাধীদেরকে চিনি) একজন মফিজ সাহেবকে পিটিয়ে হাড় মাংস এক করে দিলে অনেক সাংবাদিকদের প্রতিশোধপরায়ণতা হয়ত মিটবে, সমস্যার সমাধান হবে না কিছুতেই। কারন আরো অজস্র ‘মফিজ’ এর হাতে মানুষ মারার লাইসেন্স তুলে দেয়া হয় প্রতিদিন। আর যারা সেটা তুলে দিচ্ছে প্রতিদিন তাদের কিছু হয় না – বরং তারা থাকতে পারেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর অতি কাছে।

আমাদের দেশে সব অপরাধের ক্ষেত্রেই (মাদক ব্যবসায়ী বা চোরাকারবারী) এই চুনোপুঁটি ‘মফিজ’ রাই ধরা পড়ে মার খায় – মূল হোতারা হয়ে থাকেন সমাজের গণ্যমাণ্য ব্যক্তি। কারন এঁরা তো নীচুতলার মানুষ – আমাদের যাবতীয় চোটপাট এঁদের ওপর হওয়াটাই নিয়ম। চালক মফিজ অপরাধ করেননি আমি সেটা বলছি না; কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি মূল দায়ী মানুষকে বাদ দিয়ে গৌন ভূমিকা পালনকারী মানুষকে শাস্তি দেবার কোন যৌক্তিক, নৈতিক অধিকার রাষ্ট্র রাখে না। তাই আমি মূল অপরাধীরা শাস্তি পাবার আগ পর্যন্ত চালক মফিজ সাহেবের মুক্তি চাইছি – কথার কথা না; সজ্ঞানে, শান্ত মাথায় চাইছি।