ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ডঃ ইউনূসকে নিয়ে সরকারের নানা কর্মকান্ডে, বক্তব্যে আবার ইউনূসপন্থীদের পাল্টা বক্তব্যে দেশের মিডিয়া এখন সরগরম; পিছিয়ে নেই ব্লগগুলোও। সরকারী দলের নানা পর্যায়ের নেতারা (এবং প্রধানমন্ত্রীও) তাকে নিয়ে যা যা বলছেন সেটায় কিছু সত্যতা নেই যে তা না, কিন্তু কথাগুলো নেহায়েতই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বশে বলা এবং অনেক স্ববিরোধীতা আছে তাদের বক্তব্যে। আবার ইউনূসপন্থীদের বক্তব্যেও শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধী অন্ধ দলবাজী – তারা ইউনূসকে দেখাতে চাইছেন দেবদূত হিসাবে। তাই ওই দুই পক্ষের কথাগুলোকে পাত্তা না দেয়াই উচিৎ।

সরকারের বক্তব্যের স্ববিরোধীতার একটা উদাহরণ দেই। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছুদিন আগে ইউনূসকে ‘গরীবের রক্তচোষা’ বলেছিলেন – কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সঠিক বলে মনে করি আমি। কিন্তু এই তিনিই আগে মাইক্রোক্রেডিটের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে তিনি ইউনূসকে প্রমোট করেছিলেন বলে বাহবা নিয়েছিলেন। আর মাইক্রোক্রেডিট যদি গরীবের রক্তচোষাই হবে তবে ওটা দেশে চলতে দিচ্ছেন কেন তিনি? এমনকি গ্রামীন ব্যাংকের চাইতেও অনেক বেশী সুদে অনেক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোক্রেডিটের কারবার করছে। কী ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার তাদের বিরুদ্ধে?

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইউনূস এবং মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে আবার তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই ব্যাপারে একটা চমৎকার একাডেমীক আলোচনা শুরু করেছেন এই ব্লগের শ্রদ্ধেয় ব্লগার হৃদয়ে বাংলাদেশ; তিনি লিখেছেন ‘সহি ইউনূছনামা’; লিখা হয়ে গেছে এর প্রথম পর্ব এবং শেষ পর্ব। আমার এই পোষ্ট ওই অর্থে একটা পরিকল্পিত পোষ্ট না। আসলে হৃদয়ে বাংলাদেশ এর প্রথম পোষ্টে আমি দীর্ঘ একটা মন্তব্য করেছিলাম। কিন্তু এই ব্লগের অত্যন্ত বিরক্তিকর সমস্যায় ওই পোষ্টটা আমার মন্তব্য পর্যন্ত খোলেই না (অনেকবার চেষ্টা করেও ওই পর্যন্ত যেতে পারিনি)। ওই মন্তব্যের একটা কপি থাকায় ভাবলাম মন্তব্যটা নিয়ে একটা পোষ্ট দেয়া যাক।

ব্যক্তিগতভাবে, টিভিতে, পত্রিকায়, ব্লগে আগেও দেখেছি এখনও দেখছি ইউনূসপন্থীরা চরম কলোনিয়াল মানসিকতা দেখিয়ে ইউনূসের পক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর পুরস্কার, পদক, উপাধী আর স্বীকৃতি নিয়েই খুব মাতামাতি করে। তাই, পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা ইউনূসকে কেন এত মাথায় তুলে নাচায় সেটা আমাদের জানা দরকার।

পুঁজিবাদ যতই উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলুক না কেন, সুষ্ঠু বন্টনের অভাবে যে সেটা মানুষের মধ্যে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে সেটা মানুষের চোখে পড়েই। যেটা ধীরে ধীরে তৈরি করে সামাজিক অসন্তোষ। তার ওপর গত কয়েক বছর থেকে আমেরিকায় শুরু হওয়া মন্দা ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়া মানুষের মধ্যে পুঁজিবাদের ভয়ংকর সমস্যার প্রতি দৃষ্টি প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছে। আবার শুরু হয়েছে ‘মৃত’ সমাজতন্ত্র নিয়ে আলোচনা। ওদিকে দঃ আমেরিকার অনেক দেশে একেবারে আদি ফর্মে না হলেও সমাজতন্ত্রীরা ক্ষমতায় এসেছেন অনেকদিন হয়। এমনকি হালে খোদ ইউরোপের ফ্রান্সে দীর্ঘ ১৯ বছর পর একজন সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়া কিন্তু পুঁজিবাদকে ভয়ের বার্তাই দেয়।

দীর্ঘদিন থেকেই পুঁজিবাদী (এবং সাম্রাজ্যবাদী) দেশগুলোর এটা দেখানোর দরকার ছিল যে তাদের ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো সম্ভব। সেই প্রশ্নেই ইউনুস তাদের কাছে সাক্ষাৎ ‘দেবদূত’ হয়ে এসেছেন। মাইক্রোক্রেডিট দিয়ে মানুষের দারিদ্র্য দূর করা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন করা যায় এসব কথা অনেক দেশে খাওয়ানো যাচ্ছে খুব। আর তার সাথে তো এখন যুক্ত হয়েছে ‘সামজিক ব্যবসা’। এই দুইয়ের মাধ্যমে নাকি দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো হবে। এই ব্যাপারে তার ‘নসিহত’ শুনছে এখন সারা পৃথিবীর সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর নীতি নির্ধারকেরা। তাই নোংরা বৈষম্য সৃষ্টিকারী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটা ‘মানবিক’ মুখোশ তৈরির কাজটা ইউনুস করেছেন, করছেন – তাই এই লোকটা এখন তাদের কাছে মহা গুরুত্বপূর্ণ।

তার নির্দেশিত মাইক্রোক্রেডিট দিয়ে আদতে দারিদ্র্যমুক্তি হয় কিনা, নাকি মানুষকে আরো দারিদ্র্য আর নতুন নতুন ঋণ নিয়ে আগের ঋণ শোধের চক্রে আবদ্ধ করে ফেলা হয়, যার ফলে অনেকে ভিটেমাটি ছেড়ে পালানো এমনকি আত্মহত্যার মত পথও বেছে নেন আশা করি সেই ব্যাপারে আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখক হৃদয়ে বাংলাদেশ তাঁর পোষ্টের পরবর্তী কিস্তিতে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

মজার ব্যাপার হল এই মুখোশের সাথে ওই লোকটা আরেকটা নোংরা ব্যবসা দেখিয়ে দিল পৃথিবীকে – সবচাইতে প্রান্তিক, দরিদ্র মানুষের সাথেও সুদের ব্যবসা করা যায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। এবং এরা যেহেতু অতি প্রান্তিক তাই হোমড়া চোমড়াদের মত ঋণের টাকা না দিয়ে থাকতে পারবে না – চালের টিন খুলে হলেও সেটা উসুল করা যাবে। আর সেটাও না থাকলে তারা অন্তত রুখে দাঁড়ানোর শক্তি রাখে না – ‘বাঁচতে’ গলায় দড়ি দিয়ে দেবে। মজার ব্যাপার আজকের পৃথিবীর অনেক দেশের ব্যক্তিমালকানার অনেক মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান বিশাল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। আর এই লাভের খনিটির সন্ধান দিয়েছেন ইউনূস। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি মরল – পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটা ‘মানবীয়’ চেহারা দেখানোর চেষ্টা করা গেল, আর পাওয়া গেল একটা বিশাল লাভের খনি (এটাই প্রধান লাভ)। তো ইউনূসকে নিয়ে নাচবে না কেন তারা?

এই পৃথিবীর সবচাইতে নোংরা, ভয়ংকর একটা ব্যবস্থা আবিষ্কার/প্রসারের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচাইতে দরিদ্র মানুষদের জীবনকে আরো দূর্দশাগ্রস্ত করে ফেলার দায়ে দায়ী ইউনূস – এটা মানবতার বিরুদ্ধে আপরাধ বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। এর মাশুল মাইক্রোক্রেডিটের গ্রহীতারা দিতে শুরু করেছেন এর মধ্যেই। পরিহাসের ব্যাপার হল এই ভয়ংকর মানুষটিকে আমাদের অনেকে ‘গরীবের রক্তচোষা’ হিসাবে না চিনে নানা প্রোপ্যাগান্ডার মুখে পড়ে চেনেন ‘দেবদূত’ হিসাবে। খুব বেশীদিন লাগবে না মাইক্রোক্রেডিটকে (এবং তার আবিষ্কারক/প্রসারককেও) সব পৃথিবীবাসী একদিন প্রচন্ড ধিক্কার দেবেই। যারা বোঝেন তারা এখনই দেন, যেমন দেই আমিও।