ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় একটা সুপার শপের নানা জিনিষের দাম জানানো হচ্ছে ফেষ্টুন-ব্যানার দিয়ে। গরুর মাংস কত, রুই মাছ কত, সয়াবিন তেল কত। আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল মিনিকেট নামের চিকন চালটির দাম – ওটা ওরা ৩৩ টাকায় দিচ্ছে! এই নগরের মধ্যবিত্ত নিশ্চয়ই খুব খুশী হয়েছে এই দাম দেখে – আয়েশ করে সস্তা চালের ভাত খাওয়া যাবে এবার। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম পাইকারী বাজারে চালের দাম কমে যাচ্ছে ভীষণ। মোটা চালের দাম এখন কমবেশী ২৪ টাকা, আর মাঝারি থেকে চিকন চাল ২৮ টাকা থেকে ৩৬ টাকা। কিন্তু ভীষন আতঙ্ক বোধ করলাম চালের এই দাম শুনে।

বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছিল একমাসেরও বেশী সময় আগে। অনেক বছর থেকেই বোরো আমাদের দেশের প্রধান ফসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মোসুমে শতভাগ সেচ নির্ভর, আর প্রচুর সার আর কীটনাশক ব্যবহার করা এই ফসলটি বাংলাদেশকে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দেবে – একটা লিখায় পড়েছিলাম কিছুদিন আগে। শুধু একটা তথ্য দেই সেই লিখা থেকে – এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে চার হাজার লিটার (আপনি ভুল পড়ছেন না) পানি লাগে। আর আমাদের সেচের শতকরা আশি ভাগ এখন ভূগর্ভস্ত পানি ব্যবহার করে হয়। এর ফলে পানির স্তর প্রতি বছর আশংকাজনকভাবে নীচে নামছেই। একদিকে ভারতে সাম্রাজবাদের কারণে আমাদের একের পর এক নদী মরে যাচ্ছে, অন্যদিকে আমরা আমাদের অমূল্য সম্পদ, মাটির নীচের পানির সীমাহীন ‘অপচয়’ করে যাচ্ছি! যাই হোক আজকের আলোচনা এই বিষয়ে না।

আসি বোরো ধানের কথায় – আগেই বলছি শুষ্ক মৌসুমের ধান বলে এই ধানে প্রচুর সেচ লাগে, সাথে আর সব উফশী জাতের মত এতে প্রচুর সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার করতেই হয়। তাই এই ধানটির উৎপাদন ব্যয় অন্যান্য ধানের চাইতে বেশী। তার ওপর গত বাজেটে সারের ভর্তুকি কমানো হয়েছে, বেড়েছে সেচের বিদ্যুৎ আর ডিজেলের দামও। আমাদের কৃষকরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঋণ নিয়ে এই ব্যয় সামাল দেয়। আবার কেউ কেউ সেটা করে বাঁকিতে – অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় সেচওয়ালা তাকে সেচ দিয়ে দেয় সারওয়ালা সার দিয়ে দেয় – ফসল ওঠার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেটা শোধ করে দিতে হয় – নগদ টাকা দিয়ে বা ধান দিয়ে।

বোরোর এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই এর পেছনে আমাদের কৃষিমন্ত্রীর বড় কৃতিত্ব আছে। প্রতিবার ফসল ওঠার সময় একসাথে অনেক ধান বাজারে আসার কারণে ধানের দাম কমে যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকেই। সাথে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম তো আছেই। তারা অনেক ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেট তৈরি করে ধানের দাম কমিয়ে দিয়ে সস্তায় ধান কেনে। ওদিকে ধানের দাম কমে গেলেও একজন কৃষকের পক্ষে ধান বিক্রি না করে থাকা প্রায় অসম্ভব – এনজিও থেকে নেয়া ঋণ বা বাঁকিতে নেয়া সেচ, সার, কীটনাশকের টাকা ফেরত দেবার চাপ তার ওপর থাকে প্রচন্ড।

এই পরিস্থিতিতে ধানের দামকে খুব বেশী নীচে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য সরকার একটা ভাল দামে চাল সংগ্রহের ঘোষণা দেয় ফসল কাটা শুরু আগেই, এবং ফসল ওঠা শুরুর পর পর সেটা সংগ্রহ করতে শুরু করে। সরকার চাল কেনে মিল মালিকদের কাছ থেকে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে না। এতে সরকারের চাল সংগ্রহের মূল লাভ পায় মিলমালিক; তবে এর প্রভাব খুচরা ধানের বাজারের ওপর কিছুটা পড়ে তো বটেই – কৃষক কিছুটা লাভবান হয়। কৃষক যদি সরাসরি সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে পারতো তবে সে অনেক লাভবান হতে পারত। ১৪% আর্দ্রতা রক্ষার এক জটিল প্যাঁচে পড়ে প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সেটা হয়ে ওঠে না – সে আরেক গল্প।

এবার সরকার গত ৩ মে চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছিল কিন্তু সংগ্রহ শুরু করেনি। কারণ হিসাবে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় গুদাম খালি না থাকার কথা। এই দেরীর সময়টা আমাদের কৃষক ভাইদের পক্ষে অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না – তাই ধান এর মধ্যেই ‘পানির দামে’ ফড়িয়া আর মিল মালিকদের হাতে চলে গেছে। গড়ে ৫৫০ টাকা খরচে উৎপাদিত ধান প্রায় সব কৃষক বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন ৪০০ থেকে ৪২৫ টাকায়!

এখন প্রশ্ন বোরো ধান কি আকাশ থেকে পড়ল একদিন হঠাত করে যে সরকার বুঝে ওঠেনি? চাল সংগ্রহের এই রুটিন কাজটার ব্যবস্থাপনাতেও এত সমস্যা হল কেন? গুদাম খালি করার ব্যবস্থা আরো আগেই করে ফেলা হয়নি কেন? বলা হয়েছে ওএমএস এ চাল বিক্রি কম হয়েছে, কারণ বাজারে চালের দাম এমনিতেই কম ছিল। আমি বলি আরও কম দামে দিতেন – এই দেশেরই দরিদ্র মানুষেরা সেটা খেত সস্তায়, সমস্যা কী? এখন তো অন্তত চালের দাম নিয়ে এই বিপর্যয় হত না। নাকি সরকার ইচ্ছে করেই চেয়েছে চালের দাম পড়ে যাক – বেশিরভাগ মানুষ খুশী হবে; মানুষের তো আর সময় নেই এদেশের ‘চাষা’ দের কী হল সেটা দেখার।

চালের যৌক্তিক দাম নির্ধারন করা খুব জটিল একটা ব্যাপার। যারা মানুষকে ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা হয় আহাম্মক, নয় তো ভয়ঙ্কর মিথ্যেবাদী, প্রতারক। চালের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষ ক্রেতা; সেই তুলনায় উৎপাদক অনেক কম। এমনকি একজন প্রান্তিক কৃষকও মৌসুমের শেষে চালের ক্রেতা হয়ে যায়। দাম কম হলে অনেক বেশী মানুষ খুশী হয়, কিন্তু এটা উৎপাদককে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করে।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এজন্য খাদ্য উৎপাদনে সামগ্রিকভাবে বিরাট ভর্তুকি দিয়ে দুই পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখতে পারে। আমাদের অত সামর্থ নেই – সারে বা ডিজেলে ভর্তুকি দিয়েই অনেক চাপ পড়ে যায়। তাই ফসল ওঠার সময় চাল কিনে রেখে পরে ওএমএস, কাবিখা এবং অন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচীর মাধ্যমে কমদামে বা বিনামূল্যে বিতরনের ব্যবস্থা করে সমাজের সবচাইতে অসমর্থ অংশকে সুবিধা দেয়া যায়। সাথে কৃষকে ধানের ন্যায্য মূল্য দেবার একটা চেষ্টা করা যায়।

কৃষক যদি ধানের ন্যায্যমূল্য না পায় তবে সেটা দেশের জন্য একটা বিরাট অশনি সংকেত। কৃষক নিরুৎসাহিত হয়ে ধান চাষ কমিয়ে দেবে – এটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে। কেউ কেউ বলবেন আমরা অন্য ফসল উৎপাদন করে চাল কেনার টাকা পেলে দরকার হয় চাল বিদেশ থেকে কিনে নিতে পারব। কিন্তু না, সেই পরিস্থিতিও দিনে দিনে আর থাকবে না। আমাদের মনে আছে সম্ভবত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় হাতে টাকা নিয়েও আমদানী করার মত চাল পেতে ভীষণ সমস্যা হয়েছিল। জ্বালানী তেলের দাম বাড়ার ফলে খাদ্যশস্য দিয়ে অ্যালকোহল উৎপাদন করে সেটা দিয়ে গাড়ি চালানোকে যতোই ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলা হোক না কেন, ওটা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে এবং কেনার মত খাদ্যশষ্যের প্রাপ্যতা কমতে থাকবেই দিনে দিনে। তাই নিজের দেশের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ফলাতে হবে নিজ দেশেই।

বেশ কয়েক বছর আগে একবার ভীষণ শিলা বৃষ্টি হয়েছিল, দারুন উপভোগ করছিলাম, ফিরে গিয়েছিলাম শৈশবের স্মৃতিতে – সময়টা ছিল বোরো ধান কাটার আগে। পরদিন পত্রিকায় দেখলাম ওই শিলা বৃষ্টি অজস্র এলাকার পাকা বোরো ধানের বারটা বাজিয়ে দিয়েছে। এদিকে আমার শিলা বৃষ্টি দেখার আনন্দ – আর উল্টো পিঠেই অসংখ্য অতি দরিদ্রে মানুষের পথে বসার গল্প।

আজ আমরা, মধ্যবিত্তরা ৩৩ টাকায় মিনিকেট চালের ভাত আয়েশ করে খাব, চালের খরচ কমে যাওয়ায় মধু মাসের পাকা টসটসে আম, লিচু কেনার বাজেটও বাড়বে – খাব দারুন আয়েশে। ভয়ংকর রকম আত্মকেন্দ্রিক, সমাজবিচ্যুত, ভোগবাদী আমরা কি একবারও বুঝব যে এই সস্তায় চিকন চালের ভাত আর বেঁচে যাওয়া টাকায় টসটসে ফল খাওয়া মানে আমাদের দেশের সবচাইতে দরিদ্র মানুষগুলোর রক্ত পান করা?