ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

পৃথিবীর অনেক দেশেই কোটা ব্যবস্থার প্রচলন আছে। তবে সেটা বাংলাদেশের মতো নয়। কোন জাতি দেশের অভ্যন্তরে শিক্ষা বা প্রশাসনিক অংশীদারিত্বের জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়লে রাষ্ট্রকে একটা সময় পর্যন্ত প্রণোদনা দিতে হয়। এই প্রণোদনা থেকেই কোটা ব্যবস্থার প্রচলন। কিন্তু এটা ভেবে পাচ্ছিনা একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা আসলে কোন দিক থেকে অনগ্রসর! যদি অনগ্রসর জাতি না হবে তাহলে তাদের কোটাভুক্তির প্রয়োজন হলো কেনো? আবার পাহাড়ি বা অন্যসব জাতিগুলোর মধ্যে চাকমা-মারমা বা ম্রোদের জন্য কি একই স্কেলে সুবিধা রাখা হবে? এমন অনেক প্রশ্নই জমা হয়ে আছে বর্তমান কোটা ব্যবস্থা নিয়ে। কোটা ব্যবস্থার গলদ দীর্ঘ দিন ধরেই বয়ে বেরাচ্ছে আমাদের চাকরিপ্রার্থী তরুণ সমাজ। অনেক প্রশ্নের পর ছোট ছোট আন্দোলন। প্রশাসনের টনক নড়েনি এতোদিন। তবে ৩৪তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর কিছুটা ঝাকুনি দেয়া গেছে। আন্দোলনে হয়তো এখন স্তিমিত পরিস্থিতি। কিন্তু যে ক্ষোভ জমা হয়ে আছে সমাজে তা একদিন আছড়ে পড়বেই পড়বে। কারণ একটা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির মধ্যে। কোন সমাধানের দেখাতো মেলেইনি বরং রাষ্ট্রীয় মদদে হামলা করা হয় আরো আন্দোলনকারীদের উপর।

ক্ষোভ বাড়ছে জনমনে, এদিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক হয়ে আর কতো! যেদিকে যাই সেখানেই কোটা। এই কোটা সেই কোটা। কোটায় একেবারে অতিষ্ট জীবন। শতকরা হিসেবে দেখলে অর্ধেকেরও বেশি আসন বা পোস্ট চলে যাচ্ছে কোটায়-কোটায়। তারপরও কোটার আসন পূর্ণ হয়নি বলে আবার বিশেষ নিয়োগ। রীতিমতো প্রহসন যেনো! পাবলিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা চাকরি, কোটা ব্যবস্থার ফলে একরকম জিম্মি অবস্থায় আমাদের সাধারণ জনগণ। অনগ্রসর জাতিকে প্রতিযোগিতায় রাখতে যে কোটা ব্যবস্থার প্রচলন। আজ দেশের বৃহৎ অংশ জনগণ সেই কোটা ব্যবস্থা দ্বারাই বঞ্চনার শিকার। এভাবেই একটা ভুল পদ্ধতির পেষণে পিষ্ট বাংলার লাখ-কোটি যোগ্যতা সম্পন্ন তরুণ প্রাণ, তাদের স্বপ্ন।

ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে বিষয়টা খুব চোখে পড়ে। কোটা থাকার ফলে মেধা তালিকার অনেক পেছন সারির কেউ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে কোটার জোরে। তুলনামূলক সিরিয়ালে সহস্রজনের সামনে, কিন্তু সাক্ষাৎকারেই ডাক পরেনি তার। এই হচ্ছে বছর বছর। ফলে কোটার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। উচ্চ শিক্ষায় যা চাকরির ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা। দীর্ঘকাল ধরে একই ব্যবস্থা চলমান। অনন্তকালের জন্য কি তাহলে কোটাগুলো সব পাকা হয়ে গেলো!

কোটার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আগে ছিলো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এখন তালিকা নাতি-নাতনি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। একইসাথে বিস্তৃত হয়েছে সাধারণের যন্ত্রণা। যদি পাহাড়ি বা অন্যসব জাতির ক্ষেত্রে বলি, ম্রোদের তুলনায় চাকমা-মারমা-ত্রিপুরারা অনেক বেশি অগ্রসর। এই ত্রুটিপূর্ণ কোটা ব্যবস্থাকে চাকমা-মারমা বা ত্রিপুরারা যেভাবে কাজে লাগাতে পারছে ম্রোদের পক্ষে কিন্তু তা সম্ভবপর নয়। বরং একটা অসম প্রতিযোগ তৈরি হয়েছে। আবার চাকমা-মারমা-ত্রিপুরাদের যে অংশটা শহরে থাকে। সাধারণ কিছু সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে বড় হয়। মূলত তারাই কোটা ব্যবহার করে তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে। আসল বঞ্চিতরা পাহাড়ের গহীনে। ওখানে মানসম্মত কোন স্কুল নেই, কলেজ নেই। স্কুল থাকলে শিক্ষক নেই। সরকারি বরাদ্দ নেই। ফলে এই অবস্থার পরিবর্তন না করে এভাবে যুগ-যুগান্তর ধরে কোটা দিয়ে রাখা জাতির জন্য মঙ্গলজনক তো নয়ই। দুরভিসন্ধিমূলকও।

কোটার উদ্দেশ্যের কথা আগেই বলেছি। কোটা চিরকালব্যাপী ভোগ্য কোন বস্তু নয়। এটা অন্তর্বর্তীকালীন একটি ব্যবস্থা। কিন্তু এদেশের দালাল শাসকগোষ্ঠী তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থে কোটা ব্যবস্থাকে ক্রমশ দীর্ঘস্থায়ী করছে। গত চার দশক ধরে তারা এর হার কেবল বাড়িয়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে আজ জরুরি হয়ে পড়েছে বর্তমান কোটা বিরোধী আন্দোলনটাকে জোরদার করার। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সাধারণ শিক্ষার্থী বা চাকরি প্রার্থীদের এই কাজটি করতেই হবে। এছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় পাবলিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তির দুঃসাধ্য কাজটি অর্জিত হলে হতেও পারে। কিন্তু বেকারত্ব ঘুচানো অতটা সহজ হবেনা। যেখানে অর্ধেকেরও বেশি আসন চলে যায় কোটা পূরণে সেখানে সাধারণের চাকরি পাওয়াটা একরকম দুস্কর্মই বলতে হবে।

১৯.০৫.২০১৪