ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

“দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি মোরে দানিয়াছো খ্রীস্টের সম্মান” কথাগুলো বলে কাব্য করেছিলেন নজরুল। এক পেঁচে ধূতি পরে, দরিদ্র বেশে, গান্ধী জাগিয়েছিলেন ভারতবাসীকে। কিন্তু দারিদ্র্যকে সম্মান করে কে, কেই বা দরিদ্রকে পীড়িতে বসিয়ে এক গ্লাস পানি দেয়? প্রায় দু’হাজার বছর আগে খ্রীস্টীয় রোমানরা যখন ইহুদীদের তাড়িয়ে দিয়েছিল ইসরায়েল থেকে, আর ইহুদীরা ছড়িয়ে পড়েছিল জগতময়। তারা তখন জীবন দিয়ে শিখেছে- পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে জয় করতে হবে দারিদ্র্য আর অজ্ঞানতাকে। তাইতো প্রায় দুই কোটি ইহুদীর দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করে সারা বিশ্বের ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান!

আজ বিশ্ব মানচিত্রে ক্ষুদ্র এই বাংলাদেশের যখন নূন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা, তখন গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় প্রতিবেশি দেশগুলোর মধ্যে। ভারত এবং মায়ানমার দু’টিই কর্তৃত্বশীল সাম্প্রদায়িক রাস্ট্র ব্যবস্থা সামাজিক পীড়নের দায়ে দুষ্ট। এসব দেশে বাংলাভাষী মুসলমানরা বৈরী আচরণের শিকার হচ্ছে! শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এরা ভারত এবং মায়ানমারে বসবাস করলেও দু’টি দেশই মনে করে এরা তাদের নাগরিক নয়। দারিদ্র্যকে সম্বল করে এরা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ থেকে। ভারত এবং মায়ানমারের এই রাস্ট্রীয় পীড়ণ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে। এই পীড়নের একটি বড় কারন- ঐ সব দেশের সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং বৈষম্য। কিছু লোক রাস্ট্রীয় প্রেষণে ধনী হচ্ছে, আর কিছু লোক পড়ে থাকছে তলানিতে। তলানির লোকগুলোকে কেউ আর আপন মনে করে না। তাই পুশ ব্যাকের নামে তাদের ঠেলে দিতে চায় বাংলাদেশে। হিন্দু এবং বৌদ্ধবাদী এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে তাই অঞ্চলব্যাপী জনমত গড়ে তোলার বিষয়টি আজ জরুরি।

ফিরে দেখা পুশব্যাক, পুশইন
জানুয়ারি ১৯৯২, এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরে মায়ানমার এবং ভারতের তরফ থেকে পুশব্যাকের ঘটনা ঘটে। অবশ্য মায়ানমার ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকেও একবার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঠেলে দিয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তে। একজন তরুণ রিপোর্টার হিসেবে ১৯৯২ সালের ঘটনা দু’টি কভার করার জন্য সে সময় আমি অবস্থান করেছিলাম টেকনাফে মায়ানমার এবং বেনাপোলে ভারত সীমান্তে। মানুষের দুর্ভোগ কাছে থেকে অনুধাবনের এক দূর্লভ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার।

বাংলাদেশের দুই প্রান্তে মানুষের ভাষা ও জীবন বৈচিত্রে ব্যবধান থাকলেও যাদেরকে পুশব্যাক করা হয়েছিল তারা কেউই বাংলাদেশের অধিবাসী ছিল না। এমনকি জন্মসূত্রেও নয়। তথাপি তাদের ঠেলে দেয়া হয়েছিল, কেবল তারা দরিদ্র এবং মুসলমান ছিল বলে। বাংলা ভাষাভাষী মায়ানমার এবং ভারতের মুসলমানেরা কি ভাবে দেশ দু’টিতে অবস্থান করছে তা নৃতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কিংবা ধর্মগত কারনে তাদেরকে বাস্তুচ্যুত করা যে মানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাফ, তা বোধকরি আর বলার প্রয়োজন নেই।

আমার রিপোর্টার জীবনের শুরুর দিককার ঘটনা। তখন আমি আজকের কাগজে। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করার সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি, এবং পররাস্ট্র মন্ত্রী ছিলেন জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান। আমার মনে পড়ে- তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করছে, কেন তাদের নৌকো ঠেলে আবার ফেরত পাঠাচ্ছে না? এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কাউকে জোর করে ফেরত পাঠাতে পারি না’। খুবই মানবিক উত্তর। কিন্তু এর খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে আজো। অনেক রোহিঙ্গা মিশে গেছে কক্সবাজারের জনপদে। অনেকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে চলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। মানবিক দৃষ্টিতে কিছুই দোষের নয়। কিন্তু বিপত্তি হলো- সম্পদ ভাগাভাগি করা যায়, দারিদ্র্য কখনো ভাগাভাগি করা যায় না।

দারিদ্র্যকে পুঁজি করে মানুষ মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে। যেমনটা করে জামায়াতে ইসলামী। অনেক রোহিঙ্গার হাতে তুলে দিয়েছে অস্ত্র। যাতে এদেরকে সময় মতো ব্যবহার করা যায়, এ জন্য বেসরকারি সংগঠন (এনজিও) গড়ে তুলেও তৎপরতা বজায় রেখেছে জামায়াত। কক্সবাজারে ‘রাবেতা আল আলম ইসলামী’র এ ধরণের তৎপরতার ব্যাপারে সে সময়কালে রিপোর্টও করেছিলাম। আজ জামায়াতে ইসলামী যখন ফাঁদে আটকা পড়েছে, তখন অনুরূপ কোন দুরভিসন্ধি আছে কি না তাও খুজে দেখা জরুরি।

এবার আসি ভারতের পুশব্যাকের ঘটনায়। আমি তখন বাংলাদেশের প্রথম রঙ্গিন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়। মতিউর রহমান চৌধুরী এর সম্পাদক। ১৯৯২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল যশোরের বেনাপোলে ভারতের পুশব্যাকের ঘটনার ওপর রিপোর্ট করার। আমি রাতের বাসে করে রওয়ানা দেই যশোরে। সেখানে বাংলাবাজার পত্রিকার প্রতিনিধি কিরন সাহাকে সঙ্গে নিয়ে বেলা এগারোটার দিকে পৌছে যাই বেনাপোলে। বেলা বারোটার দিকে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশব্যাক করা হয় একটি ভারতীয় মুসলিম পরিবারকে। আমার প্রতিবেদনটির মাল মশলা সগ্রহ করে সেদিন বিকেলে ঢাকাগামী একটি ফ্লাইটের যাত্রীর কাছে ধরিয়ে দিই রিপোর্ট এবং ছবির রীল। পরদিনের পত্রিকায় ছাপা হওয়া রিপোর্টের শিরোনাম ছিল- “অপারেশন পুশব্যাকঃ বিজেপির ইন্ধন আছেঃ তুজাম্বর ফিরে গেছে ইচ্ছের বিরুদ্ধেঃ নাসিমা জানে না স্বামী কোথায়”।

রাতে আবার আপডেট পাঠাই টেলিফোনে। তাও ছাপা হয় পত্রিকায়- “গভীর রাতে যশোর থেকে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, গতকাল তিন দফা পুশব্যাকের চেষ্টা হয়। এর মধ্যে বেলা সোয়া এগারোটায় পনের জন, বারোটায় পনের জন, এবং সাড়ে তিনটায় একান্ন জন। বিকেল পাচটায় বিএসএফ এর পক্ষ থেকে বিডিআর-এর কাছে আলোচনার প্রস্তাব দেয়া হয়। বিডিআর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে”।

রিপোর্টে আমাকে বিশেষ প্রতিনিধি উল্লেখ করলেও আমি ছিলাম আসলে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি। যাই হউক, সে সময় ভারতে ক্ষমতায় ছিল সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি। বিজেপি’র লোকজন মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঢুকে বলতো-“তুম ভি বাঙালি, বাংলা মে চলে যাও। ফের কাল দেখুঙ্গা তো জান মে নিকাল দুঙ্গা”। এরাই ধরে ধরে বাসে করে লোকজনদের নিয়ে আসতো সীমান্তে। অতঃপর বিএসএফ-এর জালে ফেলে একেবারে বাংলাদেশের বর্ডার অতিক্রম! সুখের বিষয় মায়ানমারের ব্যাপারে সরকার উদার হলেও ভারতীয়দের ব্যাপারে উদার হয়নি। তৎকালীন বিএনপি সরকারের এই দ্বিমুখী নীতির পেছনে ছিল জামায়াতের নীল নকশা! রোহিঙ্গাদের দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিণাম অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল জামায়াত নেতারা।

বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারনে রোহিঙ্গাদের আগমন বন্ধ হয়েছে। সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের মাধ্যমেই হয়তো তারা রাখাইন (সাবেক আরাকান) প্রদেশে টিকে থাকার সমস্ত শক্তি অর্জন করবে। তাদের শক্তিশালী অবস্থানের ওপর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্কও শক্তিশালী হবে। মায়ানমারের অগণতান্ত্রিক এবং সামরিকতন্ত্রের স্বরূপ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হবে।

ভবিষ্যতের আশংকা
পাঠক হয়তো লক্ষ্য করেছেন, গত মাসে হিলারী ক্লিনটনের সফরের পরপরই ভারতের প্রধান মন্ত্রী মায়ানমার সফর করে সামরিক জান্তার সঙ্গে কুলোকুলি করেছেন। ঘটনা পরম্পরায় শুরু হলো রোহিঙ্গাদের আগমণ। ভবিষ্যতে ভারত থেকেও আবার পুশব্যাকের ঘটনা ঘটতে পারে। আগ্রাসী পুঁজিবাদের ছোবলে আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার পর্যন্ত যে ব্যাপক সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, তার ফলে একটি বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এখানে বাংলাদেশ দুর্বলতার পরিচয় দিলে দায়ভার এসে পড়বে দুর্বলের উপরই। বাংলাদেশ মেধা ও যোগ্যতায় এই পরিস্থিতি সামাল দেবে এটাই কামনা করি।

নিউইয়র্ক, ১৯ জুন ২০১২