ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমাদের এ অঞ্চলে, অর্থাৎ পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশে ভোটের রাজনীতি কতটা জঘন্য ও অমানবিক তার একটি অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল প্রায় কুড়ি বছর আগে। ভারত থেকে মুসলিম অধিবাসীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার এক হঠকারী রাজনীতির সূচনা করেছিল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)। সম্প্রতি মায়ানমারে ছদ্মবেশী গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে এই উগ্রপন্থী রাজনীতির অস্তিত্ব থাকলেও এরা নিজেদের মুখোশ পুরোপুরি প্রকাশের সুযোগ পায়নি। তবে আশঙ্কা রয়েছে- ভারতে বিজেপি আবার ক্ষমতায় এলে তাদের দাবী মতো দুই কোটি বাংলাভাষী মুসলমানকে তারা দেশ ত্যাগে বাধ্য করবে! তাদের তথ্যানুযায়ী এই দুই কোটি লোক বসবাস করে দিল্লি, মুম্বাই আর কলকাতার বস্তিতে।

প্রায় কুড়ি বছর আগে বাংলাদেশকে শরণার্থীর দেশে পরিণত করার একটি কূটচাল এঁটেছিল বিজেপি। সে সংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধানে প্রায় সপ্তাহ খানেক আমি কাটিয়েছিলাম সীমান্তে। আজ স্মৃতি হাতড়ে এবং নিজের কাছে থাকা রিপোর্টের পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে তার খানিকটা তুলে ধরছি।

যশোরের কিরণ সাহা, বাংলাবাজার পত্রিকার প্রতিনিধি। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ রিপোর্ট পাঠালেন সীমান্তে ভারত তাদের বাংলাভাষী নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করতে শুরু করেছে। দু’এক জনকে ধরে ধরে আগে পুশব্যাক করেছে, কিন্তু এবার ব্যাপক এবং এর পেছনে আছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য!

সন্ধ্যায় যথারীতি অ্যাসাইনমেন্ট এবং রিপোর্ট সংগ্রহ করে অফিসে গেলাম। বাংলাবাজার পত্রিকার অফিস তখন ৯২/১ গ্রীন রোডে। বার্তা সম্পাদক আহমেদ ফারুক হাসান চলে এলেন মতি ভাইয়ের কাছে কিরণ সাহার রিপোর্টটি নিয়ে। মতি ভাইয়ের নিজস্ব সম্পাদকের কক্ষ থাকলেও বেশির ভাগ সময় বসতেন রিপোর্টারদের কক্ষে। প্রধান প্রতিবেদক বদি ভাইয়ের (বদিউর রহমান) টেবিলের পাশে আরেকটি টেবিল ছিল মতি ভাইয়ের। সেখানে বসে রিপোর্টারদের গতিবিধি চোখ-কান খোলা (খাড়া) রেখে পর্যবেক্ষণ করতেন। মোস্তফা ফিরোজ, আমিনুর রশিদ থেকে শুরু করে কারো কাছেই ব্যাপারটি খুব সুখদায়ক ছিল না। এমনকি বদি ভাইয়ের কাছেও না। কারন সন্ধ্যায় রিপোর্টিং কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র মতি ভাই মুখের ওপর বলতেন ‘কি নিয়ে এলেন ব্রাদার আজকে?’ তার মানে এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছাড়া অফিসে এলেন কেন? এ প্রশ্নে চীফ রিপোর্টারের সার্বভৌমত্বও ক্ষুণ্ণ হতো। তথাপি বাংলাবাজারের শুরু মাত্র তিন মাস আগে, এবং পত্রিকাটির মালিক সম্পাদক মতি ভাই নিজে। কাজেই মতি ভাইয়ের সামনে অন্তত আনন্দ চিত্তে সবাই বিষয়টি মেনে নেয়ার ভান করতো।

যাই হউক, সেদিন সন্ধ্যায় মতি ভাই ডেকে আমাকেই দায়িত্ব দিলেন যশোরের বেনাপোল যাবার। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন- টাকা লাগলে যশোরের পত্রিকা এজেন্টের কাছ থেকে যেন চেয়ে নেই। রাতে ঘরে ফিরে গোটা কয়েক কাপড়-চোপর গুছিয়ে রাতেই রওয়ানা দিলাম। ভোরে যশোরে পৌঁছে একটি হোটেলে কক্ষ নিয়ে টেলিফোন করলাম কিরণ দা’কে। কিরণ’দা আব্দার করলো তার বাসায় সকালের নাস্তা করতে।

রাতে বাসে ঘুমিয়েছি, কাজেই ঘুমানোটা খুব প্রয়োজনীয় নয়। তথাপি খানিকটা জিরিয়ে, গোসল সেরে রিক্সা নিয়ে কিরণ’দার বাসায়। লুচি-সব্জি, ডিম ভাজি’র নাস্তা এবং একই সঙ্গে পরিকল্পনা চললো বেনাপোল যাবার। হেমন্তের সবুজ শিশির ভেজা সোনালী সকালে বাসে করে আমরা রওয়ানা দিলাম বেনাপোল।

বাসে লক্ষ্য করলাম অর্ধেকের বেশি যাত্রী মহিলা। কারণটা কি? জানলাম- এসব মহিলার অধিকাংশের পেশা সীমান্তে ভারতীয় শাড়ির বোঙ্গা ব্যবসায়। হায়রে শাড়ি! মহিলাদের হাত ধরে, মহিলাদের প্রয়োজনেই অবৈধ ব্যবসার সুত্রপাত!

কিরণ’দার হাতে ক্যামেরা, রীল কিনে ভর্তি করেছি বাসে উঠার আগে। আমরা পৌঁছে গেছি বেনাপোলে। রিপোর্ট পেয়ে গেলাম। কিরণ’দা ছবিও তুললো। কিন্তু পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবিটি তুললাম আমি। রিপোর্টের মাল-মশলা সবই সংগ্রহ হলো। বেনাপোল থেকে সেদিনের দু’টি ভারতীয় বাংলা পত্রিকাও (আনন্দবাজার এবং আজকাল) সংগ্রহ করলাম। উদ্দেশ্য পুশব্যাক নিয়ে সেখানকার প্রতিক্রিয়া জানা, এবং পেছনের কারন অনুসন্ধান করা। রিপোর্টের কিছু অংশ লিখেছি একটি রেস্তোরাঁয় চা পানের ফাঁকে। কিন্তু পাঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। ফ্যাক্স তখনো চালু হয়নি। টেলিফোনে লাইন পাওয়া দুরূহ। লাইন (ল্যান্ড) পাওয়া গেলেও ওপারে যারা লেখেন, তাদের হাতে রিপোর্টে ত’এর জায়গায় হয় ‘ব।

কিরণ’দার সঙ্গে পরামর্শ করে একটি মাইক্রো বাস (লাইটেস) ভাড়া করলাম যশোর পর্যন্ত। তবে ড্রাইভারের সঙ্গে রফা হলো আমরা প্রথমে যাবো যশোর এয়ারপোর্টে। এদিকে মুশলধারে বৃষ্টি হলো। পথে বৃষ্টি থেমেও গেল। বিমান বন্দরে নেমে দেখি বিমান ছাড়ার আরও ঘন্টা খানেক বাকি। মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে বোর্ডিং পাস নিচ্ছে। রিপোর্টের বাকিটুকু সেখানে দাঁড়িয়েই শেষ করি। টয়লেটে ঢুকে অন্ধকারে ক্যামেরা থেকে রীল বের করি। খানিকটা আলোর ছটা ছিল টয়লেটে। আশংকা হলো- হয়তো সব ছবিই নস্ট হয়ে গেল! এবার একটি এনভেলাপে রীল এবং রিপোর্ট ভরে লাইনে দাঁড়ানো লোকজনদের জিজ্ঞেস করতে থাকি- ভাই আপনি ঢাকার কোথায় যাচ্ছেন? পাচ-ছয়জনকে জিজ্ঞেস করার পর একজন পেলাম, যাবেন ফার্মগেইটে। তার নাম এবং টেলিফোন নম্বর লেখে ভদ্রলোকের হাতে এনভেলাপটি এগিয়ে দিলে তিনি সানন্দে রাজি হলেন, গ্রীণ রোডে বাংলাবাজার অফিসে সেটি পৌঁছে দেবেন।

ঘন্টা দুয়েক পর অফিসে টেলিফোন করে নিশ্চিত হলাম, এনভেলাপটি ঠিক মতো পৌঁছেছে। ফারুক ভাই অনুরোধ করলেন রাতে আবার আপডেট পাঠাতে। রাতে বিডিআর যশোর কমাণ্ডে টেলিফোন করে দু’টি দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সর্বশেষ অবস্থান জেনে আবার আপডেট পাঠালাম। ছবিসহ পুরো রিপোর্ট ‘হেড লাইনে’ ছাপা হয়েছে পরদিনের কাগজে।

শিরোনামসহ রিপোর্টটি ছিল এরকম-
অপারেশন পুশব্যাক
বিজেপির ইন্ধন আছেঃ তুজাম্বর ফিরে গেছে
ইচ্ছের বিরুদ্ধেঃ নাসিমা জানে না স্বামী কোথায়

বেনাপোল সীমান্ত থেকে চৌধুরী জহিরুল ইসলামঃ বেলা বারোটা বেজে কয়েক মিনিট পার হয়েছে। বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত চৌকি। বিডিআর সদস্য ওমর সাইকেলে চড়ে এসে খবর দিলেন পুশব্যাকের ১৫ জন বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতর চলে এসেছে। মাত্র একশ’ গজের ব্যবধানে হলেও ঘন গাছগাছালির কারণে লোকগুলোকে দেখা যাচ্ছিল না।

জড়ো করে রাখা হয়েছে ১৫ জনকে। বাক্স পেটরা সবই আছে তাদের সঙ্গে। জীর্ণ ময়লা কাপড় তাদের গায়ে। জীবন সংগ্রামে এদের বর্ণ তামাটে। ওদের দারিদ্র, অনাহারক্লিস্ট, বোবাকান্না সমস্ত পরিবেশকে ভারি করে তুলেছে।হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো কোহিনুর বেগম ‘আমি আর ফিরে যাব না, আমাকে এখানে মেরে ফেল, যমের হাতে আমাদের আর ছেড়ে দিও না’। চল্লিশোর্ধ রমনীর কোলে একটি শিশু। তরুণ লিটন শেখ আর বালিকা রোকেয়া তারই সন্তান। স্বামী তুজাম্বর আলী হাওলাদার, পঞ্চাশের কোঠায় বয়স। গোটা পরিবারকেই ঠেলে দেয়া হয়েছে এপারে। লিটন-রোকেয়া ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে। কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার আগেই চোখ ছাপিয়ে জল আসছে বন্যার পানির মতো। উত্তর দিতে পারছে না। তুজাম্বর আলী কাঁদছে না। পাথরের মতো থমথমে হয়ে আছে। বলল- সব কেড়ে নিয়েছে। ৩’শ টাকা ছিল সবশেষ সম্বল। তাও ছাড়েনি।

কোহিনুর ঠিকা ঝি’র কাজ করত। আর তুজাম্বর কাগজ কুড়াত। লিটন বাপকে সাহায্য করত। রোকেয়া ঘরে বসে কোলের ভাইটিকে দেখত। ২০ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে এসে দু দফা শাসিয়ে গেল দুই দলের লোক। লিটনের ভাষায় প্রথমে বিজেপি, পরে ফরোয়ার্ড ব্লক বস্তির বেশ কয়েক জন পুরুষ মানুষকে নিয়ে গেল পাশের থানায়। তুজাম্বর হাতে পায়ে ধরে বলেছে, ‘মেরা বাচ্চা ঘর মে ভূখা হ্যায়’।

এই বলে তখনকার মত রেহাই পেয়েছিল। অনেককে থানায় ধরে নিয়ে গেলে পুলিশ তাদেরকে বলে ‘তুম ভি বাঙালি, বাংলা মে চলে যাও। ফের কাল দেখুঙ্গা তো জান মে নিকাল দুঙ্গা’।
ভোর আর হল না। অন্ধকারেই ঘুম থেকে ডেকে তুলে জনপ্রতি ৫০ রুপি দিয়ে তাদেরকে তোলা হলো ট্রেনে। প্রথমে বনগাঁ। বনগাঁয় একটি ক্যাম্পে তোলা হলো। টিনের ছাউনি দেয়া ক্যাম্পে রেখে ওই দিন তাদের শুধু দু বেলা আধপেটা খিচুরি দেয়া হয়।

তুজাম্বর জানালো, বনগাঁর ক্যাম্পে আরও কয়েক শ মানুষকে জড়ো করা হয়েছে। তাদের সামনেই অনেককে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে, মাথার চুল ছেঁটে দিয়েছে। আরও নির্যাতনের আশঙ্কায় তারা গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর না হতেই পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে এসেও বাচতে পারলো না সীমান্ত এলাকায় বিজেপি সদস্যদের হাত থেকে। টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে হরিদাসপুরের বিএসএফ সদস্যদের হাতে তুলে দিল। প্রায় ৭ কিলোমিটার হেঁটে এসে বিএসএফ এর খপ্পর থেকে বাচতে পারল না তুজাম্বর পরিবারসহ ওই দলের ১৫ জন। বিএসএফ সদস্যরা তাদের তাড়িয়ে দিল বাংলাদেশের দিকে। দলে ৪ জন পুরুষ, ৫ জন মহিলা, ৬টি শিশু। সবার কাহিনী একই দুঃখের সূতোয় বাঁধা।

চার সন্তানের জননী নাসিমা (২৫) থাকত দিল্লির নিজাম উদ্দিন বস্তিতে। গত চার দিনের ভ্রমণে সে ক্লান্ত, অবসন্ন। ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে পুলিশ তাদের বস্তিতে ঢুকে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। স্বামী কোথায় আছে নাসিমা জানে না। এক ধনী লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। বনগাঁ ক্যাম্পে আসার পর অন্যদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ট্রেনের কামরায় গাদাগাদি করে শ’খানেক লোককে তোলা হয়েছিল। গত চারদিনে সে মাত্র তিনবার খেতে পেরেছে। অনাহারে তার দেহ অবশ হয়ে আসছিল।

দুপুর পৌনে একটার দিকে বিডিআর সদস্যরা যখন তাদেরকে আবার ভারতের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, সে এক করুণ দৃশ্য। মমতাজের শিশুটি তখন বস্তার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। একটুখানি খাবারের জন্য কাঁদছে কোহিনুরের শিশুপুত্রটি। বিডিআরের তাড়া খেয়ে তারা হাঁটছিল ওপারের পেট্রাপোল বাজারের দিকে। যাবার সময় তুজাম্মিল নামের তরুণ বলল, আরও কয়েক শ মানুষ আছে তাড়া খেয়ে আসার অপেক্ষায়।

ইন্ধন যোগাচ্ছে বিজেপি
সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের তাড়া করে নিয়ে আসার পেছনে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) ইন্ধন যোগাচ্ছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘পুশব্যাক’। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে গত কয়েকদিন যে সব পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী আসছেন, তারা বলছেন, কলকাতায় আজকাল পত্রিকায় দেখেছেন তথাকথিত পুশব্যাকের এ ঘটনার জন্য পত্রিকাটি বিজেপি এবং ফরোয়ার্ড ব্লককে দায়ী করেছে। ভোটের সময় দিল্লিতে কংগ্রেস এবং বিজেপি এদের বিভিন্ন সময় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িক মুখোশ খুলে যাওয়ায় দলটির প্রতি সেখানকার অধিবাসীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন।

এদিকে মঙ্গলবার বিজেপি বেনাপোল সীমান্তবর্তী হরিদাসপুরে মাইকিং করেছে। মাইকে বলেছে, অবিলম্বে বাংলাদেশীদের ফেরত না পাঠালে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। যে সব মুসলমান এক সময় বাংলাদেশের অধিবাসী ছিল, বিজেপি তাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

নিউইয়র্ক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১২