ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

মানুষ পারে না, পৃথিবীতে এমন কাজ কি আছে? না, নেই। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা, আর কর্ম প্রচেষ্টা। স্বপ্ন মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটায় মানুষই। মানুষের জীবনে কখনো সঙ্কট আসে। সে সঙ্কটের উত্তরণও ঘটায় মানুষই। এর পেছনে মানুষের বাস্তববাদী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াসও থাকে। থাকে বজ্র কঠিন সঙ্কল্প!

বিশ্বব্যাংকের হাত গুটিয়ে নেয়ার কারনে আমরা কি বসে থাকবো, নাকি আমাদের যা সম্বল আছে, তাই দিয়ে শুরু করবো- এ প্রশ্নটিই আজ আমাদের সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের খুব নিকট প্রতিবেশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াও একদিন এ ধরণের সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। আর সঙ্কট মোকাবেলা করেই তারা আজ এ অবস্থানে এসেছে। অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
এক সময় (সত্তুরের দশকে) সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট লি কুয়ান আইএমএফ-এর কন্সোর্টিয়ামে গিয়ে বসে থেকেও কোন সাহায্য আনতে পারতেন না। কারন মাছ ধরা আর শুঁটকি বিক্রি করা ছাড়া সিঙ্গাপুরের কোন উৎস ছিল না। সে কারনে বহির্বিশ্বে এই নগর রাষ্ট্রটির কোন মর্যাদাও ছিল না। লি কুয়ানের আত্ম জীবনীতে এ বিষয়ের উল্লেখ আছে। আজ ধনে, মানে, জ্ঞানে দেশটি এশিয়ার জুয়েল হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে।

হ্যাপি ডেইজ ডাইনার, গুগলে, কিংবা গুগল ম্যাপের ড্রাইভিং ডাইরেকশন থেকেও আমাদের ডাইনারে আসতে পারেন।

সম্প্রতি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা থেকে এ লেখার শিরোনাম ধরার চেষ্টা করি। আমরা দুই বন্ধু মিলে গত বছর আমার বাসা থেকে ১৫-১৬ মাইল দূরে একটি ডাইনার (আমেরিকান রেস্টুরেন্ট) কিনেছি এক ইজিপ্সিয়ানের কাছ থেকে। এই ব্যবসার ব্যাপারে আমাদের দুজনের আগে বিন্দুমাত্র কোন অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি আমি কোনদিন আমেরিকান ডাইনারে বসে খাইনি। আমেরিকান খাবার বলতে ফাস্ট ফুডে বসে বার্গার, ফ্রাইস অথবা পিজা খাওয়া। অথচ জীবিকার তাগিদে আমরা ডাইনারের মালিক বনে গেলাম!

এদিকে ডাইনারের শেফগুলো মাঝে মাঝেই কাজে দেরি করে আসে। কিচেনে যাতে কোন জনবলের সঙ্কট না হয়, সে কারনে আমাদেরকে অতিরিক্ত লোক রাখতে হয়। এ ব্যাপারে আমরা বেশ হিমশিম খাচ্ছিলাম। এদিকে আমাদের প্রধান মনোযোগ ছিল ডাইনারের সৌকর্য এবং বাইরের ফিটফাট বজায় রাখা। কাজেই কিচেনের কাজ শেখার ব্যাপারেও একটি বছর আমরা তেমন মনোযোগ দিতে পারিনি। যদিও আমাদেরকে প্রায় লোকসান গুণতে হচ্ছিল! তথাপি শেফদের ধরে রাখার জন্য আমাদের যে কি তোয়াজ করতে হতো!

এরমধ্যে হঠাত এক রোববার, মাদারস ডে’র উইকেন্ডে ডাইনার খুবই ‘বিজি’। ইজিপ্সিয়ান শেফের বাড়ি থেকে কল এলো- তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক ব্যথা পেয়েছে। তৎক্ষণাৎ সে চলে গেল। আমাকে কোন ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে জানানোর প্রয়োজনও মনে করলো না! শেফ চলে যাওয়ায় দুপুরের খাবারের জন্য আসা প্রায় ১৫-২০ জন মানুষ খাবার না পেয়ে বিফল মনোরথে ফিরে গেল। ডাইনার বন্ধ ছিল প্রায় দু’ঘন্টা। একটি রেস্টুরেন্টের জন্য এটি খুবই বদনামের বিষয়! তাই দু’ঘন্টার মধ্যে পরিচিত অন্য একজন শেফকে কল করে ডেকে এনে পুনরায় চালু করি।

জীবনে স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য বহু পেশা বেছে নিয়েছি। শেফ-এর কাজ করতে হবে কখনো ভাবিনি। কিন্তু মাদারস ডে’র ওই উইকেন্ডের ঘটনা আমাকে শেফের কাজ শিখতে বাধ্য করলো। আমরা দুই পার্টনার বসে একটি বাক্যে, একটি সিদ্ধান্ত নিলাম- “আমরা পরস্পর, পরস্পরকে সাহায্য করলে কাজটি কখনো কঠিন হবে না”। যে সিদ্ধান্ত সেই কাজ। আমরা প্রথমে সপ্তাহে দুই দিন একসঙ্গে কাজ শুরু করেছি, একটি শিফটে। একজনের ভুল হলে আরেকজন বিনয়ের সঙ্গে ধরিয়ে দিয়েছি। যেখানে হোচট খেয়েছি, ইউটিউবে রেসিপি দেখে দেখে শিখে ফেলেছি। আমেরিকান রেসিপি’র সহজ দিকটা হলো- এসব খাবার প্রায়শ ‘প্রি-কুকড’। আর চিকেন আলফ্রেডো, চিকেন করডন ব্লিউ, টার্কি প্যানিনি, অথবা র্যাাপ’গুলো ইউটিউব থেকে শেখা মোটেই কঠিন কিছু না। আর সালাদ বানানো আমাদের চেয়ে ভালো জানবে কে? লেটুস, টমেটো, কিউকাম্বার, গ্রীন-রেড পেপার, ক্যাবেজ, ব্ল্যাক অলিভ, রেড ওনিয়ন দিয়ে আমি কোন সালাদ বানালে কাস্টমার মুখে দেবার আগে এর বাহারি আয়োজন দেখে প্রথমে স্থম্ভিত হতে হবে। বলে রাখি- এ কাজে আমার পার্টনারটিও যথেষ্ট পটু! রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বলা হয়- কিচেন কন্ট্রোল মানে, ব্যবসাটি পুরো নিয়ন্ত্রণে।

আমাদের ব্যবসায় কিচেনে এখন অপচয় কম হয়। পরিবেশনে আমরা স্টাইল-এর ব্যাপারে যথেস্ট গুরুত্ব দিই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদেরকেই আমরা ওয়েট্রেস হিসেবে নিয়োগ দিই। আমাদের ওয়েট্রেস-দের নির্দেশ দেয়া আছে- খাবারের ব্যাপারে কেউ ন্যুনতম অভিযোগ দিলে গারবেজে ডাম্প করে আমাদের জানাবে, এবং ওই কাস্টমারের কাছ থেকে কোন পয়সা রাখবে না।

আমাদের একাউন্টেন্ট প্রতি মাসে রেস্টুরেন্টে আসে। সেদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম- আচ্ছা মিঃ টেড বলতো দেখি, এখন আমরা বেশি ট্যাক্স দিচ্ছি, না আগের মালিক বেশি ট্যাক্স দিতো? উত্তরে জানালো- এখন তোমরা অন্তত ২৫ ভাগ বেশি ট্যাক্স দিচ্ছ। গর্বে আমার বুক ভরে গেল। আমেরিকার এই অর্থনৈতিক দুর্দিনেও ব্যবসা বেড়েছে! আমাদের প্রচেষ্টা তা হলে একেবারে নিস্ফলা নয়! আমাদের এই একাউন্টেন্টটি আগের মালিকেরও হিসাব নিকাশের কাজ করতো।

কুলিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের দৃশ্য।

এই শেফের কাজ শেখার জন্য রেস্টুরেন্ট কেনার পর-পর আমার একবার মনে হয়েছিল আমার বাড়ির মাইল দশেক দূরে আমেরিকার একমাত্র কুলিনারি ইন্সটিউটে ভর্তি হই। বলে রাখা ভাল- এটি আসলে কুলিনারি বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে রান্না-বান্না বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকত্তোর এবং পিএইচডি ডিগ্রী দেয়া হয়। কথা ক’টি বললাম এ কারনে যে, ‘ঠেকার নাম বাবাজি’। বিপদে পড়লেই তো মানুষ বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ খোঁজে? তা না হলে পথের ঠিকানা কে নিতো?

আমার বাল্য বয়সের আরেকটি ঘটনার কথা বলে ঘনঘটার ইতি টানছি। আমাদের হবিগঞ্জে খোয়াই নদী ছিল শহরের স্থায়ী দুঃখ। খরস্রোতা এ নদীটি শহরের একেবারে নাভী দিয়ে চলে গেছে। ফি বছর পাহাড়ি ঢলে নদীতে বান ডাকে। ১৯৭৭-৭৮ সালে জিয়াউর রহমান দেশের সর্ববৃহৎ ‘উলশী প্রকল্প’ হিসেবে নদীটির বাঁক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। শহরে নদীটি প্রবেশের প্রায় দুই কিলোমিটার আগে এর বাঁক পরিবর্তন করে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি নদী খনন করে ভাটিতে নদীটির সঙ্গে সংযোগ দেন।

স্বেচ্ছাশ্রমে জিয়া নিজে এ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। আমি নিজে অন্তত তিনবার এ কাজে কোদাল-টুকরি হাতে নিয়ে মাটি কাটি। একবার কাব-স্কাউটের সদস্য হয়ে, আরেক বার জুনিয়র রেডক্রসের হয়ে, শেষবার শিল্পকলা একাডেমীর গানের দলের সদস্য হয়ে মাটি কাটার কাজে যাই। তখন বয়স বারো- কি তেরো। প্রকল্পটি সমাপনের পর হবিগঞ্জ বন্যার হাত থেকে বেঁচে গেল। খননকৃত নদীটি চওড়া এবং এর পাড়ও যথেস্ট মজবুত। মানুষের আত্মবিশ্বাস থাকলে কি না সম্ভব!

এই একটি বড় প্রকল্পের মাধ্যমে একজন সেনা শাসক হয়েও জিয়া বহির্বিশ্ব থেকে নিজের এবং দেশের জন্য সম্মান কুড়িয়ে এনেছিলেন। স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার এ ঘটনা খোদ আমেরিকাতেও সম্ভব নয়! কাজেই ভাল কাজে মানুষের সঙ্কল্পই বড় কথা। এ সব ঘটনায় জিয়া ইতিহাসে সম্ভবত অমর হয়ে থাকবেন, যতটা ধিকৃত হবেন রাজাকারদের পুনর্বাসনের জন্য।
আজ বাংলাদেশের সামনে অনেক স্বপ্ন! স্বপ্ন- উন্নত, এমনকি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার। এমন একটি মুহুর্তে বাংলাদেশ কি হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকবে না, নিজের পায়ে চলার চেষ্টা করবে? বিশ্বব্যাঙ্কের প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি ডলার খুব বড় অঙ্কের অর্থ নয়! বড় ব্যাপারটি হলো, সাহস আর আয়োজনের। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা দেশের শেয়ার বাজার থেকে, এবং প্রবাসীদের কাছ থেকে বণ্ডের আকারে সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজেকে দুর্নীতি পরায়ণদের সংশ্রব থেকে দূরে রেখে প্রশাসনকে সচ্ছ রাখার এক দুর্নিবার শপথ নিতে হবে। এই একটি ইস্যুতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার এক দূর্লভ সুযোগ এসেছে তার সামনে। তিনি এই সুযোগ কাজে লাগাবেন কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষা!

মনে পড়ে কিছুদিন আগে একটি লেখায় বলেছি অনুরূপ একটি সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেলসন ম্যাণ্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে রাগবি খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ণ করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কালো আফ্রিকানরাও পারে! আজ সে সুযোগ এসেছে আমাদের বাঙালীদের সামনে, বুকটান করে আমরাও যেন বলতে পারি- হ্যাঁ আমরাও পারি!!

নিউইয়র্ক, ৩ জুলাই ২০১২