ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

বেলুনগুলো উড়ে গেল আকাশে

মানুষের মনকে আনন্দ দিতে কত না উৎসব আয়োজন! আমার দীর্ঘ দিনের সাধ ছিল বেলুন উৎসবে যোগ দেয়ার। নানা কারনে হয়ে ওঠেনি। আজ সে আধ পূর্ণ হয়েছে। হাওয়ায় মানুষের রঙের ফানুশ ওড়ার খেলা দেখে দেখে ভুলে গিয়েছি সংসারের সব জ্বালা যন্ত্রণা! ভুলে গেছি পদ্মা সেতুর ব্যথাভরা কাহিনী, সাগর-রুনিকে নিয়ে উপরি তলার মানুষদের (যেমন মাহফুজুর রহমানের) মিথ্যার বেসাতি!

আমাদের বাংলাদেশেও এক সময় বেলুন ওড়ানোর উৎসব করতেন প্রজা হিতৈষী ঢাকার নবাবরা। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এ ধরণের একটি বেলুন উৎসবে সুনামগঞ্জ থেকে এসেছিলেন হাসন রাজা। তার আত্মজীবনীতে বূড়িগঙ্গার তীরে এর মনোমুগ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায়। বেলুনটি উড়তে উড়তে এক সময় রমনা’র উঁচু গাছে আটকে যাওয়া, এবং সেখান থেকে এর আরোহীকে উদ্ধারের কথাও লেখা আছে।

বাংলাদেশে আজ কেবল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তপনার খবর। তরুণ যুবকদের আনন্দ উচ্ছ্বাসের কোন সংবাদ টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদেও আসে না। তবে কি মানুষ একসঙ্গে আনন্দ-উচ্ছাসে মেতে ওঠার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেললো। অবশ্য পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবসে মানুষের বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। এর বাইরে যেন আর কিছু নেই। অথচ উচ্ছ্বাস ছাড়া সৃষ্টি হয় কিভাবে?

আমাদের আরেকটি অপধারনা- আনন্দ মনে হয় কেবল তরুণ-শিশুদের জন্য। আনন্দ আসলে প্রয়োজন সবার জীবনে। সব সময়! আজকের এই বেলুন উৎসবে যেয়ে দেখলাম দর্শনার্থীদের ৯০ শতাংশ বয়স্ক, এবং ১০ শতাংশ শিশু। শিশুরা কি জন সমাগমের উৎসবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে? হয়তো তাই। তাদের কম্পিউটার নির্ভর জীবনটা যখন এক ঘেয়ে ঠেকবে, তখনি যত আশংকা!

ওড়ার আগে বেলুনে অগ্নি প্রজ্বলনের পালা

হাডসন ভ্যালীর এই উৎসব শুরু ১৯৯২ সাল থেকে। উৎসবে ১২-১৪টি বেলুন অংশ নেয়। ভ্যালীর সবগুলো উৎসব স্থল মিলে হয়তো বেলুনের সংখ্যা কয়েক ডজন। এই গ্যাস বেলুন প্রথমে তৈরি হয় ফ্রান্সে, ১৭৮২ সালে। ২/৩ জন আরোহনের মতো বেলুনের আকৃতি, বা পরিধি শ’দেড়েক ফুট। নীচে থাকে গন্ডলা, যাতে থাকে গ্যাসের সিলিন্ডার। আগুণ প্রজ্বলনের সাথে সাথে বেলুন উরতে থাকে। তবে এর দিক নির্ণয় করে বায়ূ। একেবারে নীচুতে বেলুনের আরোহী গ্যাসের সঞ্চালন বাড়িয়ে-কমিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও উপরে উঠে গেলে দিক নির্ণয়ের ভার দিয়ে দিতে হয় বায়ুকে। বেলুনটি তৈরি হয় নাইলনে। আমাদের দেশে ফানুশ ওড়ানোর রীতি আছে, প্রযুক্তি ওই একই। তবে বর্তমানে সারা বিশ্বে যত বেলুন উৎসব হয়, তার অন্তত অর্ধেক হয় আমেরিকায়।

বেলুন উড়তে দেখে ভাবি একসময় আমাদের দেশেও বেলুন উড়তো। আবারো উড়াবো আমরা সাতরঙা বেলুন শান্তি ও প্রগতির কামনায়।

নিউইয়র্ক, ৭ জুলাই, ২০১২