ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

অধ্যাপক আহমদ শরীফের সঙ্গে ছফা

একটি বড় মাপের অপবাদ বাঙালীর ঘাড়ে। সেটি হলো, নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে সব সময় আমরা ওপরের সংশ্লিষ্টতা খুঁজি। একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ তার লেখায় বিভিন্ন সময়ে। নীরদ সি চৌধুরী নামের এক ব্রিটিশ হিতৈষী ভারতীয় বাঙালীও আমাদের এ চারিত্রিক দুর্বলতার কথা বলেছেন অকুন্ঠ চিত্তে। আরেকটু কাছ থেকে বাঙালী মুসলমান সম্পর্কে প্রায় একই কথা বলেছেন আমাদের এ সময়ের প্রয়াত নায়ক আহমদ ছফা। আগামী ২৮ জুলাই যার মৃত্যু দিবস।

বাঙালী মুসলমানের মন প্রবন্ধে তিনি বলেছেন- ” বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে অনেককিছুই জানার ভান করে, আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো অপরিণত। সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেস্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃতকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশ লাভ করেছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোনো কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না।…। দুরদর্শিতা তার একেবারেই নেই, কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামী কাল কি ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালী মুসলমান চিন্তা করতেই জানে না। এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি কালচার বলে পরিচিত করতে কুন্ঠিত হয় না।

বাঙালী মুসলমানের সামাজিক সৃষ্টি, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি সমূহের প্রতি চোখ বুলোলেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠবে। সাবালক মন থেকেই উন্নত স্তরের সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশ সম্ভব। এই সকল ক্ষেত্রে তার মনের সাবালকত্বের কোনো পরিচয় রাখতে পারেনি। যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রস্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাস্ট্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালোমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজ-কারবার চলে, তাকে খোলা থেকে আগুনে কিংবা আগুন থেকে খোলায়, এভাবেই পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। সুবিধার কথা হলো নিজের পঙ্গুত্বের জন্য সবসময়েই দায়ী করবার মতো কাউকে না কাউকে পেয়ে যায়। কিন্তু নিজের আসল দুর্বলতার উৎসটির দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করে না।” ১৯৭৭-এ লিখা এ প্রবন্ধ আবারো সঙ্কলিত এবং সম্পাদিত হয়ে ১৯৮১ সালে বই আকারে বের হয়।

আহমদ ছফা’র লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ১৯৮২ সালে। সামরিক শাসন তখন দেশের সীমিত গণতন্ত্রকে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম পারাবার আয়োজনে ব্যস্ত। কিন্তু দেশের ক্ষণভঙ্গুর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা মাথাচাড়া দিতে চায়। ভেঙ্গে ফেলতে চায় স্বৈরাচারের সব কালা কানুন। যে ছাত্র কর্মীদের চিৎকার আর হুঙ্কারে সেদিন সামরিক তন্ত্র পরাভব মানে, আমিও সে তুর্কী তরুণ দলের একজন। আমাদের দেশে তখন কোন অভিবাবক ছিলেন না। মুজিব নেই, জিয়া নেই, নেই মওলানা ভাসানীও। সামনে ছিলেন না ডঃ কামাল, ব্যারিস্টার রফিকুল হক কিংবা এখনকার কোন মহীয়ান কেউ। একমাত্র ছাত্ররাই ছিল। ছাত্রদের সামনে ছিল না কোন ভবিষ্যতের কল্পনা। কেবল আমরা মুক্তি চাই, স্বাধীনতা চাই, আর চাই বেঁচে থাকার জন্য একটু খানি গণতন্ত্র! আমাদের মধ্যে চাদাবাজী ছিল না, ছিল না কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দূর্বার আকাঙ্ক্ষাও।

সেদিনকার সেই দুর্বিপাকে ছফা ভাইয়ের লেখা আমার নিজেকে চিনতে সাহায্য করেছিল। দিয়েছিল বাচার নতুন প্রেরণা! আলাওল হলে আমার পাশের কক্ষের কীর্তিমান মাহতাব (চট্টগ্রামের গাছবাড়িয়ার) এনে দিয়েছিল সেই মহিমান্বিত বইটি। একই সঙ্গে সে আরেকটি বই ধার দিয়ে বিপ্লবী সাহিত্য পাঠে আমাকে উজ্জীবিত করে, সে বইটি ছিল- ইয়েনেকা ওরেন্স এবং ইয়েস ফার ব্যুরদেন-এর “গ্রাম বাংলার গৃহস্থ ও নারী”। ব্র্যাক প্রকাশনীর এ বইটি পরে অবশ্য আমি কিনেছিলাম ফুটপাতের ব্যবহৃত বই-এর দোকান থেকে। মা ও মাটিকে এই প্রথম নিখুঁতভাবে দেখা ও উপলব্ধির জন্য বই দু’টির কাছে আমি জন্ম-জন্মান্তরের ঋণী!

এই দেশে এখন

আহমদ ছফা বলেছিলেন- “মূলত বাঙালী মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তারা ছিলেন সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোন মতামত বা বক্তব্য ছিল না”। কথাগুলো খুবই সত্য। এ কারনে আমাদের প্রধান মন্ত্রী যখন অবলীলায় কথা বলে যান, তখন তার ভুল-ভাল ধরিয়ে দেয়ার একটি মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না। সকলেই বলে ওঠেন- বাহবা নেত্রী, বাহবা বেশ! পদ্মা সেতু না হওয়ার জন্য ভুলের বোঝা এখন ইউনুসের ঘাড়ে চাপিয়ে পাড় পাওয়ার কী দূর্বল প্রয়াস! ইউনুস যদিবা নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো কাজ করে থাকেন, দেশের নেত্রী প্রধান মন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের বালখিল্য মন্তব্য আশা করা যায় না। তাতে দেশের জনগণ অপমানিত হয়। অপমানিত হয় গণতন্ত্র তথা মানুষের শকতি।

আমাদের এই প্রিয় দেশটিতে এখন সব দার্শনিক আর মুক্ত চিন্তার মানুষেরা মনে হয় কম্বল মুরি দিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। তারা নিশ্চয় ব্রীহদন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টিকারী এই গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না! আজ তাই আহমদ ছফাকে আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন! এই নিরহঙ্কার সিংহপ্রাণ মানুষটির গর্জনে আবারো ঘুম ভাঙ্গার প্রয়োজন ছিল আমাদের। দেউলিয়া রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যে যখন আমাদের আত্ম পরিচয় ধুলোয় মলিন, তখন আহমদ ছফা’দের হাতুড়ি পেটানোর প্রয়োজন ছিল।

ক্ষমতা যখন পাশবিক!

ক্ষমতা প্রকৃত নায়ককে পরিণত করে নন্দিত নায়কে, আর খল নায়ককে পরিণত করে কাপুরুষে! আজ এই দেশে দেখি কেবল ক্ষমতার কাপুরুষোচিত পাশবিক নৃত্য! এক সময় ক্ষমতার বাহু আঁকড়ে ধরার জন্য যে প্রধানমন্ত্রী বিচারপতিদের পরিণত করেছিলেন সাহেব বিবি গোলামের তুরূপের তাসে, সেই কি না এখন ক্ষমতার মইটি সরানোর জন্য মরিয়া! বিচারপতিরা ক্ষমতার আজ্ঞাবহে পরিণত হবেন এটা বুঝা উচিত ছিল সেই ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আন্দোলনের আগেই! পাকিস্তানীদের আমরা কাপড় খুলে গালি দেই। কই, তারাওতো তত্ত্বাবধায়কের নামে বিচারপতিদের নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার আয়োজন করছে না! আমরা নিজেদের কতই না বুদ্ধিমান ভাবি! নিজেদের বুদ্ধিমান দাবি’র প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একটি কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। তিনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পাঁচটি প্রদেশের প্রস্তাব করলে সবাই হাসাহাসি করেছিল। জবাবে তিনি স্যাটায়ার করে বলেছিলেন, “উই আর নট দ্যা অনলি ইন্টিলিজেন্ট নেশন ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড!” আমরা যখন কিছু অর্জন করি, তখন তার মূল্য দিতে জানি না। তাই তো স্বাধীনতা পেয়েও আমরা হারাই।
আমরা কতটা সাবালক?

এভ্যুলিউশনের এই ধরা যখন শ্রেষ্ঠদের নির্বাচন করে তখন টিকে থাকার জন্য আমরা কতটা সাবালকত্ব অর্জন করেছি, এ প্রশ্ন আজ নিজেকে বার বার করতে ইচ্ছে হয়। আজ যখন দেখি নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য, মোসাহেব সৃষ্টির জন্য একে একে সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে চলেছি তখনো বুঝি- আমি এখনো চরাঞ্চলের লেঠেল-ই রয়ে গেলাম। লেঠেল থেকে সভ্য মানুষে উত্তরণের এ পর্যায়টি বোধ হয় অধরাই থেকে যাবে। এ কথাগুলো ঘুরিয়ে সৃষ্টিশীল ভাষায় বলেছেন ছফা। বাঙালী মুসলমানকে ভারত বর্ষের ‘নীচু তলার মুসলমান’ আখ্যায়িত করে ছফা বলেন- স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বাঙলা ভাষাকে আশ্রয় করে যে অধিকার চেতনা অপেক্ষাকৃত পরে জাগ্রত হয়, আসলে তা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের আন্দোলন ও অগ্রগতির সম্প্রসারণ মাত্র’। এদের অগ্রবর্তি ছিলেন রবিন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ।” তার এসব ঠোঁট কাটা মন্তব্যের জন্য এক সময় শামসুর রাহমানও তাকে বলেছিলেন ‘ধান্দাবাজ’। কিন্তু প্রতিতিশীলরা তাকে চিনতে ভুল করেন নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয়ী কিছু আওয়ামী নেতার ভূমিকার কড়া সমালোচক ছিলেন ছফা। তাইতো ১৯৭২ সালে অধ্যাপক আহমদ শরীফ তার সম্পর্কে বলেছিলেন- লাইফ ইজ এ কম্প্রোমাইজ তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমনি পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়সের পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।

তথাপি আশা দোলা দেয়!

আজ আমরা আরেকটি যুগ সন্ধিক্ষণে। বিশ্ববাসীকে আত্মপরিচয় দিতে মরিয়া বাঙালী। ধনে মানে জ্ঞানে বাঙালীর জেগে ওঠার লক্ষণ পুরো মাত্রায় উদ্ভাসিত। এ যাত্রায় আত্ম সমালোচনার প্রয়োজন। প্রয়োজন আহমদ ছফা’র। ২৯ পৃষ্ঠায় (বাঙালী মুসলমানের মন) ইতালীয় দার্শনিক বেনেদিত্তো ক্রচের মতামত ব্যক্ত করে ছফা বলেন- “প্রতিটি জাতির এমন কতিপয় সামাজিক আবেগ আছে যার মধ্যে জাতিগত বৈশিষ্ট্যগুলো নির্যাসের আকারে পুরোমাত্রায় বিরাজমান থাকে। রাজনৈতিক পরাধীনতার সময় সে আবেগ সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং কোনো রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলে সে আবেগই ফণা মেলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে।” আমাদের জাগ্রত তরুণ প্রাণ সে হুঙ্কার দিতে এখন প্রস্তুত। সে হুঙ্কারের ভার আমরা বইতে পারবো কি না তা হয়তো বলে দেবে সময়!

নিউইয়র্ক, ১৯ জুলাই ২০১২