ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

কথাটা বেফাঁস নয় মোটেও। বাঙলা সাহিত্যে যে কয়জন জীবিতকালে পাঠক মন জয় করেছেন, হুমায়ূন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। এ যাবত উভয় বাংলায় বেস্ট সেলার হুমায়ূন। বাঙলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করে লক্ষ মানুষের জীবন বোধ জাগিয়ে দিয়েছেন হুমায়ূন।

তার লেখা নাটক মানেই জীবনের কথা, মানুষের মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলার প্রয়াস। বাঙলা সাহিত্যে হাতে গোণা কয়েক জন এই গুণের দাবিদার। তবে ব্যাপ্তির দিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সমকক্ষ আর কেউ নন। নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্প, সিনেমা স্ক্রীপ্ট, গান বাঁধা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকেও তিনি তুলে এনেছেন স্বচ্ছন্দে।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে অন্তত ১২টি সিনেমা হয়েছে। ৮টি সিনেমা পরিচালনা করেছেন তিনি নিজে। তার লেখা নাটক টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে অন্তত শতাধিক। এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়, আজ রবিবার প্রভৃতি ধারাবাহিক নাটকে আন্দোলিত হয়েছে দর্শকমাত্র। টেলিভিশনে যখন মুক্তিযুদ্ধ এবং রাজাকার শব্দগুলো ছিল নিষিদ্ধ, হুমায়ূন তখন সাহসিকতার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাঁথা। চিহ্নিত করেছেন রাজাকার-আলবদরদের। কারন তিনি ছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান!

আজ আমি এই ব্লগে হুমায়ূন আহমেদকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করার প্রস্তাব করছি। ১৯০১ সালে নোবেল পুরষ্কার প্রদানের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত দুই জন সাহিত্যে মরণোত্তর নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। নরওয়ের বার্ণস্টার্ণ বর্ণসনকে মৃত্যুর তিন বছর পর দেয়া হয় সাহিত্যে নোবেল ১৯০৩ সালে। এছাড়া ১৯৩১ সালে একই ক্যাটাগরিতে সুইডিশ কবি এরিক আলেক্সকে নোবেল দেয়া হয় মৃত্যুর এক বছর পর।

নোবেল পাওয়ার পদ্ধতিটি কি?
নোবেল প্রদানকারী ১৮ সদস্যের সুইডিশ একাডেমির কাছে গণসাক্ষরিত প্রস্তাব পাঠাতে হবে আগামী পহেলা ফেব্রুয়ারির আগে। এদের কাছে প্রতি বছর শত শত অনুরোধ আসে। এপ্রিলের মধ্যে একাডেমি কুড়ি জনের একটি তালিকা প্রকাশ করবে। মে মাসের মধ্যে এ তালিকা সংক্ষিপ্ত হয়ে যাবে ৫ জনের। পরবর্তী ৪ মাস এই ৫ জনের কাজ এবং আবদান যাচাই-বাছাই এর কাজ চলবে। এবং অক্টোবরে সদস্যদের বেশিরভাগের ভোটে নির্বাচিত হবেন পুরষ্কার বিজয়ী। তবে সংক্ষিপ্ত তালিকায় পুরষ্কার প্রাপ্তের নাম অন্তত দু’বার আসতে হবে।

একাডেমি বিশ্বের ১৩টি ভাষা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। এর মধ্যে বাঙলা ভাষাও আছে নিশ্চিত। তবে ১৩টি ভাষার বাইরে কেউ সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে অনুবাদকের ডাক পড়ে। এসব অনুবাদককে শপথ নিয়ে কিছু লেখা অনুবাদ করে দাখিল করতে হয় কমিটির কাছে।

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম এবং একমাত্র ভারতীয় যিনি নোবেল পুরষ্কার পান বাঙলা ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির জন্য। সে সময় নোবেল ‘সাইটেশনে’ তার সম্পর্কে বলা হয়েছিল-

“Because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West”।

কবিগুরুর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ের প্রায় ১’শ বছর অতিক্রান্ত। শত বছর পর ২০১৩ সালের নোবেল অর্জনের জন্য হুমায়ূন আহমেদের অকাল প্রয়াণ হলে এই মহান মৃত্যু মেনে নিতে আমাদের কোন কষ্ট নেই। আজ হুমায়ূন আহমেদ নেই। কিন্তু তার সাহিত্যকর্মকে বিশ্ব দরবারে তুলে দেয়ার এই সাহসী কাজটির জন্য কি আমরা প্রস্তুত নই?

নিউইয়র্ক, ২২ জুলাই ২০১২