ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

মানুষকে স্বপ্ন দেখতে হয়। এবং সমাজে শান্তি চাইলে সবাইকে স্বপ্ন দেখাতে হয়। এই স্বপ্ন দেখানোর কাজটা করেন সমাজের সুবিধাভোগী অংশটি। যে মানুষের কোন স্বপ্ন নেই, তার জীবনের কোন মোহ নেই। জীবন তার কাছে ভারবাহী পশুর মতো। যে কোন সময় কাত হয়ে কিংবা হাঁটু গেড়ে বসে যেতে পারলেই সে বাঁচে।

বাংলাদেশে এক শ্রেণির মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ। এরা খেটে খাওয়া শ্রমিক। এরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। কিন্তু এদের জীবনই আজ অচল হয়ে যেতে বসেছে। এরা চোখের সামনে ইউরোপ-আমেরিকার বিলাস বহুল জীবনের ছটা দেখতে পাচ্ছে কিছু মানুষের জীবনে। অথচ যাদের পরিশ্রমে এই বিলাসী জীবন, তারাই রয়ে যাচ্ছে তিমিরে।

অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা এই মৌলিক অধিকারের দাবিতে সত্তুর-আশি আর নব্বই-এর দশকে এ দেশের সচেতন মানুষ ছিলেন সোচ্চার। তারা ভেবেছিলেন গণতন্ত্র পেলেই মনে হয় এ সবের সমাধান হয়ে যাবে। রাজনৈতিক অধিকারের সুবাদে শ্রমিক তথা খেটে খাওয়া মানুষের দরকষাকষির সুযোগ হবে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জ্বালাও-পোড়াও, বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজ, যখনই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিয়ে কেউ কথা বলেন, তখন তাকে গুম করে ফেলা হয়। গন্ধ খোঁজা হয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের!

কোন স্বাধীন দেশে নাগরিকদের এভাবে পরাভূত করে রাখার প্রচেষ্টা বোধ করি একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। আরো দুর্ভাগ্যের বিষয়- খেটে খাওয়া মানুষদের জীবনের মৌলিক চাহিদা না মেটানোর ছল-চাতুরিতে সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মাফিয়া বেষ্টিত আজন্মের সুবিধাভোগী এ সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের রাজনীতি সবসময় ব্যক্তি সর্বস্ব! গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে আর কোন অনিয়ম এদের চোখে ধরা দেয় না! তাই ক্ষণিকের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পেলে জনগণ এদের মুখের ওপরই থু থু ছিটিয়ে বিকৃত প্রতিশোধ নেয়!

এ দেশের সুবিধাভোগী মানুষদের এটা মনে রাখা দরকার- পরাজিত মানুষ দিয়ে আর যাই হউক নিজের ভাগ্য গড়া যায় না। বাঙলা ব্যাকরণে তাই ভাব সম্প্রসারণের সুযোগ আছে- “তুমি যাকে ফেলিছো পিছে, সে তোমাকে টানিছে নীচে”। গার্মেন্টস শ্রমিকদের যারা শ্রম দাস হিসেবে বছরের পর বছর শোষণ করে যাবে, তাদেরও শেষ পরিণতি আছে। এবং এই পরিণতি কখনো শুভ নয়।
আজ এ লেখাটির সূত্রপাত ঘটিয়েছেন বিডিনিউজের দু’জন রিপোর্টার। তারা তথ্য-তালাশ করে এনেছেন গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনের খণ্ড চিত্র। আমার ব্যক্তি জীবনের কিছু অভিজ্ঞতাকে এরা খোঁচা মেরে জাগিয়ে দিয়েছেন।

ঢাকার খেটে খাওয়া মানুষের দুর্বিষহ জীবন-যাপন দেখতে আমি আর কবি আসাদ মান্নান ভাই (বর্তমানে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার) রাত বিরেতে হাঁটতাম। আসাদ গেট থেকে নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত আমরা হাঁটতাম। শাহবাগ অভিমুখে কখনো রমনা পার্ক অভিমুখে হেটে যেতাম। কিন্তু তখনো বস্তির জীবন-যাপন সম্পর্কে কোন ধারণা হয়নি। এরমধ্যে আসাদ ভাই বদলি হয়ে কোথায় চলে গেলেন। জিগাতলার মেসে নতুন অতিথি ইনস্যুরেন্স কর্মকর্তা শাহীন।

ব্যক্তিগত জীবনের এক সঙ্কটের সময় নিজেকে কিছুদিন নিরুদ্দেশে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি ঠেলা গাড়িতে নিজের যত সামান্য আসবাব, কাপড়চোপড়, এবং একটি ২০ ইঞ্চি রঙ্গিন তশিবা টিভি উঠিয়ে আমার অনুজ শাহীন ভাইকে বললাম- আমার সঙ্গে যেতে চাইলে আসতে পারেন। শাহীন ভাইয়ের সঙ্গে তখনও আমার তেমন জানাশোনা নেই, তাই চাইছিলাম আমার এ নিরুদ্দেশ যাত্রায় কেউ যেন সাথী না হয়! তথাপি শাহীন ভাই বললেন, আমি যাবো আপনার সঙ্গে। কি আর করা, তাকেও নিলাম সঙ্গে।

১৯৯৬ সালের শেষ দিকে কয়েক মাসের জন্য আমি বস্তিবাসী হয়েছিলাম, ধানমন্ডির পশ্চিমে মধু বাজারের নামার বস্তিতে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে। এক চালা টিনের বস্তির মালিক এক মহিলা। আট’শ টাকায় ৮ বাই ৮ ফুটের কক্ষ। একটি খাট রাখার পর আর কোন জায়গা নেই। টিভিসহ কিছু জিনিসপত্র রেখে দিলাম উপরের তাকে। সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে এ গুলো বের করার আর সুযোগ হয়নি।

বস্তির জনা চল্লিশেক লোকের জন্য একটি মাত্র খোলা বাথরুম। এ বাথরুমের পানি থাকে না সকাল আটটার পর, তাই কাক ডাকা ভোরে গোসলে লাইন দিতে হয়। পানির চাপ নেই, তাই গোসল করতে হয় কূয়োয় নেমে। রান্না-বান্নার ব্যবস্থা বলতে তিনটে গ্যাসের বার্নার পুরো বস্তিতে। তাতেও লাইন। আরো নামায়, বিলের উপর টঙে বসবাস করা এক মহিলাকে পাওয়া গেল রান্নার জন্য। মহিলার হাতে ঘরের একটি চাবি দিয়ে রেখেছিলাম। সকালে আমরা ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলে মহিলা রান্না করে দিয়ে যেতেন। কয়েক দিনের মধ্যে দেখি- রান্নার হাড়ি একে একে সব উধাও! ভালোই হল। এরপর থেকে আমরা দুজনেই যে যার মত করে বাইরে থেকে খেয়ে আসি। মহিলা তার শেষ বেতন নেয়ার উদ্দেশে এলে আমি বললাম- রান্নার হাড়ি নেই, তাইতো আপনার চাকরিও আর নেই! এখন খাবেন কি? মহিলাটির আর উত্তর নেই! আমি বুঝলাম যার জীবনের কোন স্বপ্ন নেই, তার কাছে বেঁচে থাকার অবলম্বন থাকলেই কি, আর না থাকলেই কি! বাংলাদেশের গার্মেন্টসে যখন শ্রমিকরা আগুন দেয়, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে তখন দূর থেকেও আর বুঝতে কষ্ট হয় না- এদের জীবনে আসলে কোন স্বপ্ন নেই। স্বপ্ন যাদের দেখানোর কথা, তারা আছেন আত্মস্বার্থ মুড়ি দিয়ে। কিন্তু এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। এদের জন্যই হয়ত রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “স্বার্থ- মগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগত হতে, সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে”।

নিউইয়র্ক, ২৬ জুলাই ২০১২