ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

ইবনে সিনা

আমার নিজের একটা দেহ আছে, আছে মন নামের অদৃশ্য কিছু। দেহের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখি চেষ্টা করে। কিন্তু মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা বেজায় কঠিন। দেহ আর মনের মিলন হলেই তবে ভাল থাকা। দেহটা কথা শোনে, যখন চেস্টা করি। কিন্তু মনটা কথা শোনে না। কখনো মনের ঘোড়া দৌড়ায় তার ইচ্ছে মতোই।

দেহ নিয়ে যখন কথা উঠলোই, ইচ্ছে ছিল স্নেহাস্পদ বাদশা ভাইটিকে নিয়ে লিখবো। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলো দেহটা তার কথা শুনছে না। তার নিজের চেস্টা তো আছেই, বাঘা বাঘা ডাক্তাররা মিলেও চেস্টা করছেন দেহের কলকব্জা যাতে স্বাভাবিক কর্মপোযোগী থাকে। তরুণ বয়সের কলকব্জা। হয়তো ক’দিনের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই ক’দিন পাখিটিকে কে যেন খাঁচায় বন্দি করে রাখলো! পাখিটির গলা থেকে কথা বেরোয়, কিন্তু গান বেরোয় না!

বাদশা ভাইটিকে নিয়ে লিখার আরো একটি কারণ ছিল। কি করে একটি তরুণ প্রাণ মাত্র অল্প কয়েক বছরে আমাদের এই বাঙলা ভাষী কমিউনিটির মধ্যমণি হয়ে উঠলো। কারো বাহবা’র তোয়াক্কা না করে, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো পাগলপারা একটি মানুষ। বৈশাখী মেলা, বনভোজন, ঈদ পূণর্মিলনির মতো অনুষ্ঠান আয়োজনে সব সময় সামনের কাতারের। এ ধরনের মানুষ সামান্য অসুস্থ হলেও প্রাণে বাজে! তাই আফসোস হয় দেহটি যদি সবসময় আমাদের কথা শুনত, তাহলে হয়তো আমরা অনেক রোগ বালাই থেকে মুক্তি পেতাম।

একবার প্রয়াত বুদ্ধিজীবী আহমদ শরীফের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘কেমন আছেন স্যার’। উত্তরে তিনি ভাল থাকার যে আনুষঙ্গিক শর্ত সমূহের কথা বলেছিলেন, তা আজ আর হুবহু মনে নেই। তবে এটা ধারণা হয়েছিল যে সাধারন মানুষের ‘ভাল থাকা’ এবং বুদ্ধিজীবীদের ‘ভাল থাকার’ ব্যাপারে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। এবং ভাল থাকাটি সত্যি আপেক্ষিক। তবে সাধারন মানুষের ভাল থাকার সংজ্ঞায় স্বাস্থ্যগত প্রশ্নটি জড়িত। শরীর-মন ভাল থাকলে আমরা বলি ‘ভাল’।

তাইতো দেহকে বশে রাখার চেষ্টা মানুষের আদিমতম চেষ্টার একটি। সৃষ্টির আদি লগ্নে মানুষ যখন তার উপযুক্ত খাদ্য নির্বাচন করল, তখনই সৃষ্টি হলো আদিমতম চিকিৎসা বিজ্ঞান। এ চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, জীবন-যাপন প্রণালীও এর অন্তর্গত। এ কারনে বহুমূত্র, হৃদপিণ্ডের অসুখ থেকে পিঠের ব্যাথা ইত্যাদি প্রায় সব রোগের জন্যই ডাক্তাররা ‘লাইফ স্টাইল’ পরিবর্তনের কথা বলেন। চালু করেছেন নতুন একটি শ্লোগান- ‘লাইফ স্টাইল পরিবর্তন কর, আর দীর্ঘজীবী হও’। ডাক্তার এবং ওষুধকে এড়িয়ে যাওয়াও লাইফ স্টাইলের অংশ। যদিও এড়িয়ে যাবার বিষয়টি ডাক্তাররা মানতে নারাজ। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পেটের পীড়া সারাতে দেশে-বিদেশে বহু ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। অথচ বার্ধক্য দশায় প্রত্যহ ভোরে চিরতা’র তেঁতো পানিই হয়েছিল তাঁর পীড়া দমানোর একমাত্র কৌশল!

আমাদের বাংলাদেশে এখনো বহু মানুষ ‘বনাজি ওষধি’ গুণে আকৃষ্ট। আধুনিক বিজ্ঞান ‘হারবাল’ নাম দিয়ে বনাজি ঔষধকে জাতে তুলেছে। বনাজি জাতে উঠুক আর নাই উঠুক তাতে তার কিছু আসে যায় না। তবে বিশ্বের সর্বত্র চিকিৎসা সেবা যেভাবে পুঁজিবাদের দাসে পরিণত হয়েছে তাতে ‘ভাল থাকা’ এবং দীর্ঘ জীবন লাভের বিকল্প মানুষ ভাবতে শুরু করেছে। এই ভাবনা থেকে যদি সে ‘স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপন প্রণালী’ উদ্ভাবন করতে পারে, তাহলে মানুষ অমরত্ব পাবে, এ ব্যাপারে আমি আশাবাদী। কর্কট রোগে আক্রান্ত (এবং প্রয়াত) হুমায়ূন আহমেদ অবশ্য তথ্য উপাত্ত দিয়ে বলে গেছেন ২০৪৫ সালের দিকে মানুষ অমরত্ব লাভের উপায় গুলো জেনে যাবে। চিকিৎসা বিজ্ঞান অবশ্য বহু আগে থেকে বলে আসছে মানুষ যখন তার রোগের কারন জেনে যায়, তখন সে অর্ধেক সুস্থ। তাইতো রোগ হলেই আমরা প্রশ্ন করি- ‘রোগটি কেন হলো?’ রোগের উৎসের মধ্যেই আছে এর বিনাশের উপাদান!

এখানে আমার মায়ের প্রসঙ্গটি না টেনে পারছি না। আমার মা নব্বই বছরের এক যুবতী। ডায়বেটিকস আছে গত চল্লিশ বছর। প্রতিদিন দু’বার ইনসুলিন নেন, তথাপি এখনো হেটে চলে বেড়ান। সারা জীবন দেখেছি ছোট-খাটো রোগের চিকিৎসা নিজেই করেছেন। আমার খুব বাল্য বয়সে যেদিন তার ডায়বেটিস প্রথম ধরা পড়লো, সে রাতের কথা আমার হয়তো সারা জীবন মনে থাকবে। এক চাঁদ রাতে মা আমার ঈদের পিঠা-পায়েশ বানাতে ব্যস্ত। উনুনের তাপ আর রাত পোহাবার স্নায়ু চাপে মা তার হুশ হারিয়ে ফেললেন। সবাই ধরাধরি করে তাকে বিছানায় নিয়ে এলেন। এর কিছুদিন পরেই রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়লো মা’র ডায়বেটিকস। সে রাতে শর্করা অস্বাভাবিক নীচে নেমে যাবার কারনেই মা অজ্ঞান হয়েছিলেন।

গত প্রায় তিন দশক ধরে দেখে আসছি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মা প্রতিদিন তেঁতো এবং টক জাতীয় ওষধি সেবন করেন। জাম্বুরার সময়ে আমাদের বাড়ির উঠোনের গাছটির অম্ল স্বাদের ফলটি মা’র ভিটামিন সি’র পুরো অভাব পূরণ করছে। পাশাপাশি প্রতিদিন সকালে মা কালিজিরে এবং মেথির গুঁড়ো খাচ্ছেন এক চা চামচ। এতে নাকি তার পাকস্থলি ঠাণ্ডা থাকে।
মায়ের স্মৃতি জ্ঞান আমি পরীক্ষা করি প্রায়ই। টেলিফোনে জিজ্ঞেস করি ডালের রন্ধণ প্রনালী। কিংবা তার নাতি-পন্তির সংখ্যা কত? আঙ্গুলে গুণে ডজন খানেক নাম বলে যান পাঠশালার বালিকার মতো। একমাত্র আমেরিকায় এসে বেড়ানোর আহবান ছাড়া আর কোন ভ্রমণের আহবানে সাড়া দিতে তিনি পিছ’পা নন। আমার মায়ের এই তেঁতো এবং টক বনাজি সেবনের পেছনে চমৎকার এক যুক্তি আছে। তিনি বলেন- আল্লার দুনিয়ায় সবকিছুই তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। কিন্তু মানুষ বেছে বেছে শুধু মজাদার খাবার গুলোই টেবিলে সাজিয়ে রাখে। মানুষের এই রসনা বিলাসের জন্যই প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। মা ঠিক এভাবে না বললেও আমি গুছিয়ে লিখলাম।

ইবনে সিনা'র বই দ্যা ল অব মেডিসিনের ল্যাটিন অনুবাদ, ১৪৮৪ সালে প্রকাশিত

এ লেখার সুবাদে চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক ইবনে সিনা’র অবদানের কথা না লিখে পারছি না। প্রায় এক হাজার বছর আগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই প্রাণ পিতা দ্যা ল’ অব মেডিসিন নামক (আল-কানুন ফে আল তিব্ব) বই খানি লিখে গেছেন। মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা পড়ানো হতো প্রায় সাড়ে তিন’শ বছর আগে পর্যন্ত। এছাড়া দ্যা বুক অব হিলিং বা কিতাব আল শেফা বইটিও অভিহিত হয় চিকিৎসা শাস্ত্রের ‘এন্সাইক্লোপেডিয়া’ হিসেবে। বইটির একটি অংশে তিনি বলেছেন- দেহের ওপর মনের কর্তৃত্ব স্ব-প্রণোদিত। মন যা চায় দেহ তা পালন করে। মনের দ্বিতীয় কার্যকারিতার কথাও তিনি বলেছেন। বলেছেন ‘আবেগ’ এবং ‘বাসনা’র কথা। যা মানুষকে ভাল কিছু সৃষ্টিতে তাড়িত করে। পাশাপাশি তিনি আরো বলেছেন, সব কিছুতে অত্যন্ত নেতি বাচক প্রবণতা এমনকি মানুষকে মৃত্যু মুখেও ঠেলে দেয়। কথাটি যুগ-যুগের সত্যি। তাইতো যে কোন বিপদে-আপদে আমরা বলি “বি-পজিটিভ”। আশাবাদী হও! রবীন্দ্রনাথ যেমন তার ভাষায় বলেছেন- “সংকোচের বিহবলতা নিজের অপমান, সঙ্কটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মাণ”!

সবশেষে আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে এ লেখার ইতি টানছি। ঘটনাকাল ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাস। আমি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দশ দিনের প্রশিক্ষণ শেষ করে এসে আইবিএম’এর সেমি কন্ডাক্টার প্রসেসিং-এ ম্যান্টেনেন্স টেক পদে যোগ দিয়েছি। ডিসেম্বরের প্রায় পুরোটা বসে বসে বেতন নিয়েছি। জানুয়ারিও একইভাবে বসেই যাচ্ছে। তেমন কাজ নেই। চিপ তৈরির মেশিনগুলো প্রায় বসা। এই বসে বসে কম্পিউটারে আমার দিন গোজরান। সম্ভবত ভারী কিছু উত্তোলন করার সময় বেঁকে গেল আমার শিরদাঁড়ার নীচের দিককার ‘লাম্বার ৪ এবং ৫’। দেহের ওজনও বেড়ে গিয়েছিল প্রায় দশ কেজি। দশ মিনিট হাঁটতে পারি না। ব্যাথায় পা অবশ হয়ে আসে।

হাড্ডির ডাক্তার থেকে নিউরো সার্জন পর্যন্ত তিন জন ডাক্তারের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে ছিলাম প্রায় দেড় বছর। সবাই পৃথক পৃথকভাবে পরামর্শ দিলেন সার্জারির। বললেন ভাল হওয়ার আশা ৯৯ ভাগ। তবে আমাকে সারা জীবনের জন্য সাবধানে থাকতে হবে ভারী কিছু তোলার ক্ষেত্রে। এর মধ্যে কয়েক দফা ফিজিক্যাল থেরাপি এবং কায়রোপ্রেক্টর-এর সেবা নিলাম। তাতেও কাজ হলো না। আমি ডাক্তারকে অনুরোধ করলাম- সার্জারির আগে আর কিছু থাকলে আমি শেষ চেষ্টা করতে চাই। আমি মনে মনে ভাবলাম- আমার এ রোগটি হয়েছে প্রাকৃতিক কারনে। প্রাকৃতিক উপায়েই এর নিরাময়ের চেস্টা চালাতে হবে! ডাক্তারের শেষ চেস্টা অনুসারে আমি গেলাম গরম পানির থেরাপিতে। সেখানে একজন থেরাপিস্ট আমাকে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে আমি পানিতে সাঁতার কাটবো। কিভাবে হাত পা ছুড়ে গরম পানির স্রোতে বিপরীত মুখী ব্যায়াম করবো। এভাবে প্রায় চল্লিশ দিনের গরম পানির ব্যায়ামে অবশেষে আমি ব্যাথামুক্ত হলাম। আমার আর পিঠের হাড্ডি কাটাকাটির দরকার পড়লো না। আমার এই রোগটির কাছে বিজয়ী হয়েছি আসলে আমি, পরাজিত হয়েছেন ডাক্তাররা। আধা ঘণ্টার কাটা ছেঁড়ায় তারা হয়তো বিল তুলতেন এক লাখ ডলার, যদিও ইনস্যুরেন্স সে খরচ বহন করতো। কিন্তু শরীরটা আমার। তাই সিদ্ধান্তটাও আমারই।

নিউইয়র্ক, ৬ আগস্ট ২০১২