ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

বাংলাদেশের প্রিন্টিং এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দুই স্বঘোষিত ডক্টরেট ডিগ্রীধারীর অবদান সম্ভবত স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে। দু’জনেরই নামের আদ্যাক্ষর ‘ম’ এবং ব্যবসার ফিকিরে দু’জনেই ‘ম’ অর্থাৎ (বঙ্গবন্ধু) মুজিবের অনুসারী। বাংলাদেশের নিবেদিত সাংবাদিকতাকে যে কয়জন ব্যক্তিগত সার্থসিদ্ধি এবং ব্যবসার কফিনে মুড়িয়ে জলজ্যান্ত কবর দিয়েছেন, এই দুই ডক্টরেট তাদের অন্যতম। প্রথম গুরু ড. মিজানের সঙ্গে আমার সাক্ষাত ঘটেছিল একদিনই। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। দ্বিতীয় আর কোনো দিন তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। সেদিনই প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করেছিলাম, আমাদের এই রাজধানী ঢাকা শহরটি আসলে কতটা রদ্দি মালে ভরপূর!

আমি তখন আজকের কাগজের সহ সম্পাদক। ডেস্কে কাজ করি। দিনের প্রায় অর্ধেকটা ছুটি। তখনো ঢাকা এতোটা ঘিঞ্জিপূর্ণ নয়। ঝিগাতলা বাস স্ট্যান্ড থেকে দিনের ব্যস্ততম সময়েও রিক্সায় চাপলে তেজগাঁ শিল্প এলাকায় পৌছা যায় ১৫ মিনিটে। মনোয়ার (নিউইয়র্কে থাকেন) তখন ছুটা সাংবাদিক, এখানে সেখানে লেখালেখি করেন। আমি, চিত্রকর উত্তম সেন, আর কবি আসাদ মান্নান থাকি জিগাতলা মোড়ের একটি দোতলা বাড়িতে। এক বিকেলে মনোয়ার আমাকে আর উত্তম সেনকে নিয়ে চললেন ড. মিজানের খবরের অফিসে। সাপ্তাহিক পত্রিকায় বাড়তি খেপ’এর কথা বললেন। মন্দ নয়। বাড়তি সময়টা উপভোগ করা যাবে। সঙ্গে দু’চারটি টাকাও আসবে।

তেজগাঁয় খবর অফিসে ঢুকতেই ভিড়মি খেলাম। গেটে একগাদা পত্রিকা ও ম্যাগাজিন-এর নাম। দৈনিক খবরের পাশাপাশি চিত্রবাংলা’সহ আরো বেশ কয়েকটি রগড় ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় এখান থেকে। মনোয়ার আশ্বস্থ করলেন এসবের কোনটিতেই আমাদের কাজ নয়। মিজান সাহেব নতুন দু’টি ‘সিরিয়াস’ ম্যাগাজিন বের করবেন, সে জন্যই নিবেদিত তরুণ কর্মীদের খুঁজছেন। আহা, ভাল লাগলো শুনে।

কিন্তু খবর পত্রিকা অফিসে ঢুকে উপলব্ধি করলাম- এখানে শুনশান নীরবতা। আজকের কাগজ যেমন সারাক্ষণ কলকাকলিতে গমগম করে, এখানে ঠিক তার উল্টো। কারন খবর পত্রিকা তখন কেবল ঢাকার দেয়ালে শোভা পায়। আর এর আধা কিংবা নিঃবেতনের সাংবাদিকরা রাতে মেঝেতে পত্রিকা বিছিয়ে ঘুমনোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই খবর পত্রিকারও সোনালী এক ইতিহাস ছিল। সে ইতিহাসে যাবার আগে মিজান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর্ব নিয়ে কথা ক’টি বলে নেই।

তখন পর্যন্ত জানতাম সাংবাদিকরা সবাইকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। মন্ত্রী থেকে শান্ত্রী, সম্পাদক থেকে পত্রিকা অফিসের বয়োজ্যেষ্ঠ পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে। কিন্তু ড. মিজান সাহেব তার কক্ষে প্রবেশ মাত্র বলে দিলেন এখানে আমাকে সবাই ‘স্যার’ বলে। আমার কিংবা উত্তম কারো মুখ থেকে স্যার শব্দটি বের হয় না। তথাপি মিজান সাহেব তার সিরিয়াস ম্যাগাজিন দু’টির ‘ডামি’ কপি আমাদের সামনে উল্টাতে থাকলেন, আর বলতে শুরু করলেন তার পরিকল্পনার কথা।

ম্যাগাজিন দু’টির নাম আজ আর মনে নেই। তবে প্রথমেই যে প্রশ্নটি গেট দিয়ে ঢোকার সময় আমার মাথায় খেলা করছিল, সে প্রশ্নের ঘোর থেকে আমি আর বেরোতে পারিনি। প্রশ্নটি ছিল একই সম্পাদকের তো আট-দশটি ম্যাগাজিনের দরকার নেই? একটি ম্যাগাজিনেই কেন তিনি তার মেধা ও চিন্তার সবটুকু ঢেলে দেন না? প্রশ্নটি আর সামলাতে পারলাম না। বলে বসলাম- মিজান ভাই, দুটি ম্যাগাজিন কেন করবেন, একটিকেই কেন…। প্রথমত ‘ভাই’ সম্বোধন শুনে তিনি কিছুটা ইতস্তত, আমার প্রশ্ন কেড়ে নিয়ে আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন- “আমার গেটে ক’টা ম্যাগাজিনের নাম পড়েছেন?” আমি বললাম- পাচ-ছয়টা বোধ হয়! তিনি বললেন- আমার ইচ্ছা সপ্তাহের একেক দিন একেক ম্যাগাজিন বের হবে। রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ছিল না, এখন এ দু’টি রাজনৈতিক ম্যাগাজিন।

এবার ম্যাগাজিনের ভেতরে আসা যাক। দুটোরই প্রথম রিপোর্টটি রাজনৈতিক। তারপর চিরাচরিত চিত্রবাংলার আঙ্গিকে বিদেশি কিংবা দেশী নারীর অঙ্গ সৌষ্ঠবের রমরমা উৎসব! একটির রাজনৈতিক রিপোর্টে আওয়ামী লীগের গুণ-কীর্তন করা হয়েছে, আরেকটিতে গুণ-কীর্তন ছিল বিএনপি’র। ম্যাগাজিন দু’টি দেখা এবং তার সম্পাদকীয় পরিকল্পনা শোনার পর সেখানে কাজ করার ইচ্ছা হাওয়ায় উড়ে গেছে। গেট দিয়ে বেরনোর সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টানে উত্তমের একটি রগড় উক্তি এখনো আমি মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি। উত্তম বলেছিল- “দূর মিয়া, ওর ফত্রিকায় কাজ করা আর দাঁড়িয়ে লুঙ্গির তলা দিয়ে মুখ মুছা সমান কতা”।

নিজের মহিমা জাহির করতে গিয়ে ড. মিজান বলেছিলেন- জানেন তো আমি একজন সফল সম্পাদক। আমার চিত্রবাংলা এখনো দেশের সর্বাধিক প্রচারিত ম্যাগাজিন! কথাটি ছিল সত্যি। দেশের শিক্ষিত-আধা শিক্ষিত লোকদের কাছে চিত্রবাংলাই ছিল প্রধান বিনোদন। স্কুলে দেখেছি পাঠ্য বইয়ের নীচে, লুঙ্গির ভাঁজে লুকিয়ে চিত্রবাংলা পড়তে। অবশ্য মিডিয়া থেকে নির্বাসিত মুজিব-আওয়ামী লীগের কথাও থাকতো। যে মুজিবকে ইত্তেফাক-ইনকিলাব-সংগ্রাম মিলে কবর দিয়েছিল, সেই মুজিবকেই কবর থেকে তুলে এনেছিলেন মিজান! তবে মিজান সেটা করেছিলেন ব্যবসায়িক বুদ্ধিতেই, অন্য কোন কারনে নয়। দৈনিক খবরের কাহিনীও সে সত্যতার জানান দেয়।

মিজান সাহেবের সাপ্তাহিক খবরের প্রথম ছয়টি সংখ্যায় ছিল মুজিব এবং আওয়ামী লীগের সমালোচনা। ইত্তেফাক এবং তৎকালীন মিডিয়ার ধারা অনুসরণ করায় লোকজন এটি গ্রহণ করেনি। পত্রিকাটি অবিক্রীতই ছিল। মানুষের মনে বিকল্পের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সাপ্তাহিক খবরে তার প্রতিফলন ছিল না। ’৮১ সালের দিকে ছাত্র লীগের সম্মেলন উপলক্ষে মিজান সাহেবের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলো- বঙ্গবন্ধুর ছবি বড় করে ছাপিয়ে তাদের খবরাখবর দিলে ঐ সপ্তাহের পত্রিকাটির দুই হাজার কপি তারা কিনবে। মিজান সাহেব ওই সুযোগটি হাতছাড়া করলেন না। পরে তিনি একই সংখ্যা তিনবার পুনর্মুদ্রণ করেছেন বলে শোনা যায়। একই সঙ্গে আগের ছয়টি সংখ্যার সবগুলো অবিক্রিত কপি পুড়িয়ে নিজেকে আওয়ামী সেনা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন।

হয়তো অবচেতন মনে ড. মিজানের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মিডিয়া আকাশে তারা হয়ে জ্বলে উঠেছেন ড. মাহফুজ। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে যে মাফিয়াদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার কাঁধে ভর করেই ড. মাহফুজরা এখন অনেক বেশি ক্ষমতাধর। রাজনীতিবিদদের মাথার উপর ছড়ি ঘুরানোর সব কলা কৌশল মাহফুজদের আয়ত্তে। কারন সাংবাদিকতার ‘নীতিজ্ঞান’ এখন আগের চেয়ে অনেক মলিন! খসে পড়ার আশংকা সত্ত্বেও তারকা হয়ে জ্বলে ওঠার প্রতিযোগিতায় যেন মত্ত সবাই!!

নিউইয়র্ক, ৮ আগস্ট ২০১২