ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

এই লোকটিকে আমি কোনদিন সামনাসামনি দেখিনি। গ্রামীন ব্যাঙ্ক তখনো মহীরূহ নয়। অধ্যাপক ইউনুসের বিভিন্ন পুরষ্কার পাওয়ার কথা পত্রিকায় পড়ি। লাল পতাকার দলগুলোকে সমর্থনের সুবাদে প্রফেসর ইউনুসের গ্রামীন ব্যাঙ্ক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণায় আড়ষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেকের মধ্যে এমন অভিযোগ বদ্ধমূল ছিল যে, প্রফেসর ইউনুসের কারনেই লাল বিপ্লব পাখা মেলতে পারছে না। তৃতীয় বিশ্বে বিপ্লব ঠেকানোর কৌশল হিসেবেই পশ্চিমারা লোকটিকে মদদ দিচ্ছে! এ ধারণাকে আমিও হয়তো সত্য বলেই ধরে নিতাম যদি বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক বিকাশ সম্পর্কে আমার জানা বোঝার পরিধি সেখানেই থেমে থাকতো।

১৯৯২ সালে ঢাকাস্থ চবি অর্থনীতি সমিতি একটি স্মারক বের করবে তাকে সম্বর্ধনা প্রদান উপলক্ষে। সমিতির সচিব সিরাজ উদ্দিন সাথী ভাই (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব) আমাকে অনুরোধ করলেন স্মারক গ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশে। স্মারকের প্রচ্ছদে যাবে ইউনুসের ছবি। আমার সংগ্রহে কালো মানুষের নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং-এর একটি স্মারক গ্রন্থ ছিল। আমি তার আদলে ইউনুসের স্মারক গ্রন্থটির পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু তার আগে ইউনুস এবং গ্রামীন ব্যাঙ্ক সম্পর্কে আমার অন্তত কিছু জানা দরকার। সে কারনে সাথী ভাই আমাকে পড়তে দিলেন- ‘বেলতৈল গ্রামের জরিনা’। বইটিতে যেহেতু গ্রামীনের মহিমা কীর্তন করা হয়েছে, সে কারনে যথেস্ট সতর্কতা অবলম্বন করলাম। স্মারক যথারীতি প্রকাশিত হলেও প্রফেসর ইউনুস সম্পর্কে আমার প্রশ্নগুলোর মিমাংসা হয়নি তখনো।

বাংলাদেশের সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মহাজনী ঋণের প্রথা জমজমাট ছিল সেই সত্তুর দশক পর্যন্ত। প্রফেসর ইউনুস যে জোবরা গ্রাম থেকে এই মহাজনী ঋণের বিরুদ্ধে প্রথম মানুষকে জাগানোর কাজ শুরু করেন, সেই গ্রামটিকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি ছয়-সাত বছর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া এই গ্রামের একটি টিনের কুঠিরে কয়েক জন ছাত্রের সঙ্গে আমি মিলে মেস জীবনে লেখা পড়া করতাম আশির দশকের শুরুতে। কয়েক মাস পর আলাওল হলে একটি বিছানা বরাদ্দ পেলে আমি গ্রামটি ছেড়ে চলে যাই। তথাপি এই গ্রামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনটি পর্যন্ত।

জোবরা গ্রামে তখনো বিদ্যুত যায়নি। সন্ধ্যার পরও কূপির আলোয় সমিতির উঠোনে ধান মাড়াইয়ের কোলাহল। একদল লোক ব্যাটারির শক্তিতে টিভিতে দেখছে শাইক সিরাজের মাটি ও মানুষ। একদল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা গণশিক্ষার পাঠ নিচ্ছে লন্ঠনের আলোয়। এটিই মার্কিন যুক্তরাস্ট্র থেকে স্বদেশ ফেরা আমাদের তরুণ ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত জোবরা গ্রামের ‘তেভাগা খামার’। এ গ্রামের ভূমহীন খেটে খাওয়া মানুষ ফসলের একভাগ নিজের ঘরে নিয়ে যায়। আরেক ভাগ যায় উৎপাদন খরচে, আর ভূমির মালিক পায় এক ভাগ। এ নিয়মে ভূমির মালিক-মজুর সবাই খুশি। তাইতো ফসল তোলার মৌসুমে খুশির ঢেউ উপছে পড়ে সমিতির লম্বা দোচলা টিনের ঘরে।

আগে মালিক পেতো আধা, শ্রমিক পেতো আধা। উৎপাদন খরচ ছিল কৃষকের ঘাড়ে, তাইতো ফলনও ছিল কম। তেভাগা চালু হওয়ার পর এখন জমিতে কলের সেচ হয়, সার কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। তাই তো উৎপাদনও বেশি! এই কৃষকের সঙ্গে থেকেই কোন জামানত ছাড়া নিজের পকেট থেকে চৌদ্দ ডলার দিয়ে ইউনুস শুরু করলেন কৃষকের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ।
ঢাকায় আমার এগারো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দু’একবার গেছি গ্রামীন ব্যাঙ্কের নীচে ‘চেক সার্ট’ কেনার জন্য। কিন্তু কোনদিন লোকটির সঙ্গে দেখা করা, কিংবা কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করিনি। যদিও তার নিকটতম অধস্থন ব্যক্তিটি আমার খুবই প্রিয় স্যার, আমার হলের প্রভোস্ট ড. হুজ্জাতুল ইসলাম লতিফী। এমনকি বড়ুয়া নামের যে লোকটি প্রফেসর ইউনুসের একান্ত সচিব, তিনিও আমার পরিচিত। কাজের লোকদের সময় নস্ট করাও অনাচার। দূর থেকে তাদের কাজ দেখার মধ্যেও থাকে তৃপ্তির স্বাদ। আমি ইউনুসের প্রতিটি সাক্ষাৎকার পড়ি খুব মনোযোগে। পত্রিকায় প্রকাশিত সব লেখা পড়ি আগ্রহের সঙ্গে।

সম্ভবত ২০০০ সালের মে অথবা জুন মাসে প্রফেসর ইউনুসের একটি লেখা বেরোয় “আমার দল” নামে। লেখাটির উপশিরোনাম ছিল- বাঘ দেখেছো, এখনো রয়েল বেঙ্গল টাইগার দ্যাখোনি। এও হতে পারে প্রফেসর ইউনুস একটি সংবাদ সম্মেলনে নিজে পাঠ করে তার রাজনৈতিক চিন্তা ব্যক্ত করেছিলেন। তখন আমি ঢাকা থেকে “প্রবাস দর্পণ” (লন্ডন-নিউইয়র্ক ভিত্তিক) নামে মাসিক একটি ম্যাগাজিন বের করতাম। এটি ছিল নিয়মিত রিপোর্টিং-এর বাইরে আমার বাড়তি আয়ের উৎস। এর প্রকাশক ছিলেন লন্ডনে, যাকে আমি কোনদিন দেখিনি। অথচ মুক্ত হাতে আমাকে পয়সা দিয়েছেন ম্যাগাজিনটি বের করার জন্য। যাই হউক, সেই ম্যাগাজিনে আমিও “আমার দল” প্রকাশের সুযোগ নিয়েছিলাম। কারন “আমার দল”-এর প্রতিটি বাক্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে এ দেশের মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল যুক্ত।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক অনাচার যত বাড়ছে ততই মূর্ত হয়ে উঠছে “আমার দল”-এর ভাবনা। তাই আজ আমার দল’এর পাতা উল্টাতে যেয়ে মনে হলো- এই একটি ভাবনার জন্যই লোকটিকে আজ কতই না যাতনা সইতে হচ্ছে! কিন্তু প্রফেসর ইউনুস বাংলাদেশের মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেই স্বপ্নের মৃত্যু নেই। কারন বাংলাদেশের মানুষ কেবল স্বপ্ন দেখেই না, স্বপ্নকে সার্থক করার জন্য তারা ৫২, ৭১ এবং ৯০ এর জন্ম দেয়।

প্রফেসর ইউনুসের প্রতি আমার রাগ অথবা বিরাগ কিছুই নেই। ২০০৬ সালে নিউইয়র্কের ব্যস্ততম হাইওয়েতে গাড়ি চালনার সময় যখন পাবলিক রেডিওতে তার নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার কথা শুনলাম, তখন স্টিয়ারিংটি বেশ খানিকটা কেপে উঠেছিল। কিছুটা সামলে গিয়ে দাড়ালাম হাডসন নদীর পাড়ে। নিজেকে আপাদমস্তক দেখলাম, আর গাড়ির সবক’টি দরজা খুলে শুনতে থাকলাম আমার সেই প্রিয় গানটি- “ওগো মা অনেক তোমার পেয়েছি গো অনেক নিয়েছি মা, তবু জানি না যে কি-ইবা তোমায় দিয়েছি মা। আমার জনম গেল বৃথা কাজে। আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে! তুমি বৃথা আমায় শকতি দিলে শকতি দাতা…!!” আটলান্টিকের বাতাসের ঝাঁপটায় সম্বিত ফিরলে দেখলাম সন্ধ্যে হয়ে গেছে। হয়তো রাতের অন্ধকারে রাস্তা ঠিকমতো চেনা নাও যেতে পারে!

নিউইয়র্ক, ১৭ আগস্ট ২০১২

“প্রফেসর ইউনুসের প্রতি কেন এই প্রতিহিংসা?” দ্বিতীয় কিস্তি শিগগির