ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

এই দুর্নীতি, দুর্বৃত্তের দেশ আমার না!

এতকাল শোনা গেল বাংলাদেশ ভাসছে গ্যাসের ওপর। এখন শোনা যায় ভাসছে টাকার ওপর। টাকায় ছয়লাপ দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো। যে কেউ চাইলেই পেতে পারে ব্যাঙ্ক ঋণ। এ ঋণের টাকায় হাস মুরগী পালতে হয় না। কস্ট করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলারও প্রয়োজন পড়ে না। মাছ চাষি, শামুক চাষি, কাঁকড়া চাষি কেউই ঋণের জন্য ব্যাঙ্কের দ্বারস্থ হয় না। কিন্তু ব্যাংকে যায় এক শ্রেণীর ‘ডাকাত’।

এরা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নিয়ে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করে। হৈ-হৈ রৈ-রৈ করে শেয়ারের দাম বাড়ায়। অতঃপর শেয়ার মার্কেট থেকে টাকা তসরূপ করে কেটে পড়ে। ব্যাঙ্কের কর্তারা তখন মুখে আঙ্গুল পুড়ে ভাবতে থাকেন কি থেকে কী হয়ে গেল! এসব ডাকাত তখন কর্তাদের সঙ্গে ‘সংলাপ’ করে সমঝোতায় আসে- ব্যাঙ্কের টাকা ফেরত না দিলেও চলবে! শর্ত থাকে যে, তারা যেন তসরূপ করা টাকা আবার শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেন। সবই তাদের ইচ্ছে স্বাধীন।

ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে কেউ কেউ সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গড়েন। এরা ডাকাত সর্দার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভেতরে না ঢুকে, সাইনবোর্ড দেখেই ব্যাঙ্ক এ সব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে বসে থাকে কোটি কোটি টাকা! প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার আগেই ১০০ টাকার শেয়ার বিক্রি করেন তিনশ’ টাকায়। এক সময় টাকা নিয়ে কেটে পড়েন। অতঃপর ব্যাঙ্কের কর্তাদের খেয়াল হয়- অ্যাঁরে! তালাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে ভেতরে পাঠ ঢুকে দেখেন সব কিছু ফকফকা! তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিবন্ধন হলো কি করে? এর কোন জবাব নেই।

দেশে ‘আইনের শাসন’ আছে! তাইতো এদের বিরুদ্ধে সালিশ বসে। সালিশে চূড়ান্ত হয়- তসরূপকৃত টাকার অর্ধাংশ ফেরত দিলেও চলবে। সাক্ষ্মী গোপাল সংসদও আছে এই দেশে। সংসদীয় কমিটিকেও সাংবাৎসরিক বেতনের আওতায় কিছু কাজ দেখাতে হয়। তারাও একটু নড়ে চড়ে বসে। একটু নড়াচড়াতেই পয়সা! তসরূপের কিছু ভাগভাটোয়ারা মিললেও মিলতে পারে।

‘কষ্ট’কে নিয়ে হেলাল হাফিজের কবিতার মতো বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। এ বুক থেকে কোন আবেগ আসে না। মনে হয় মধ্য যুগের রাজা রাজরার আসীনে আমি। সবাই আমার স্তুতিতে মগ্ন। আমি চাই ক্ষমতা, আর ওরা চায় টাকা। তাইতো আমি গেয়ে উঠি- এই টাকা নিবি টাকা, লাল টাকা, নীল টাকা?

তাহলে এ দেশটি চলছে কি করে? চলছে। কারন ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষকতা করার লোকের অভাব নেই এ দেশে। সবাই ‘করে খাচ্ছে’ নিজ নিজ পেশায়।

কিভাবে ‘করে খাওয়া’ যায়?
করে খেতে গেলে মুখ বন্ধ রাখতে হবে। চোখ থাকতে হবে ঊর্ধ্বাকাশে। আর চেতনাকে রাখতে হবে বন্ধক! গণতান্ত্রিক জমানায় দুটি গোষ্ঠী অথবা নাম সর্বস্ব দু’দলের শাসন চলছে। কেউ কেউ বলেন একই গোষ্ঠীর শাসন। এক দল ক্ষমতায় থাকলে আরেক দল উমরা করে বেড়াবে। এক দলের দাপট থাকবে রাজধানী ঢাকা নামক একটি বৃহৎ জেলখানায়। আরেক দলের নেতারা তখন স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকবেন লন্ডন অথবা নিউইয়র্কে। পাঁচ-ছয় বছরের একটানা বিনোদন! রাজনীতিকে ‘হালাল’ করার জন্য এইসব বিনোদন প্রত্যাশী দলের নেতারা সংসদে যেয়ে জনগণের পক্ষে প্রতিবাদের প্রয়োজনটিও অনুভব করেন না! ক্ষমতার বাড়া ভাতে ভাগ বসাতে চান না এরা। তাইতো এরা কেউ কারো ত্রি-সীমানা অতিক্রম করেন না। ‘জনগণের ক্ষমতা’র নামে যদিও এরা হায় আফসোস করেন, সেটা কেবলি লোক দেখানো।

এদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বড় হয় কিছু লোক। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ, সব স্থরেই থাকেন এদের লোক। এসব পা’মর্দন গোষ্ঠীর যে কোন একটিতে বন্ধক রাখতে হবে নিজেকে, পাঁচটি বছরের জন্য। বিনিময়ে আছে পারিতোষিক। সমাজে ভব্যতার আলখেল্লা জড়িয়ে বসবাসের জন্য রাস্ট্রযন্ত্র থেকে সব ধরণের খেতাব আর সনদের ব্যবস্থা চেতকরা হয় এদের জন্য।

গয়রহের চেতনা নাশকের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ‘পক্ষ’ ‘বিপক্ষ’ খাড়া করা হবে। রাস্ট্রের গণ মাধ্যমে তারস্বরে এক পক্ষ আরেক পক্ষের পিণ্ডি চটকায়বে। মনোমত না চললে, কথা না বললে, এক পক্ষ আরেক পক্ষকে বলবে- ‘রাজাকার নি কোনো’? এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে দেশ রসাতলে যাচ্ছে, তাতে কার কী?

চিহ্নিত রাজাকাররা কিন্তু মুখ টিপে হাসছে। কারন তারা জানে- চরম অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় মানুষের পীঠ যখন দেয়ালে ঠেকবে, সেই কঙ্কালসার মানুষটির কাছে তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করার আর কিছুই থাকবে না। রাজাকার’রা তাই মহাখুশী। মুক্তিযোদ্ধারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, কিন্তু রাজাকার’রা ঠিকই নেয়! তাইতো রাজাকার’রা প্রমাদ গুণছে। রাস্ট্রযন্ত্রকে বিকল করে দিয়ে, মানুষের হিতাহিতের সব কর্মযজ্ঞকে ধূলোয় মিশিয়ে যে অর্বাচীনের পথ চলা শুরু হয়েছে, তাকে ঠেকাবার কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না। কোন একটি গোষ্ঠীর লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলে না- এই দুর্নীতি, দুর্বৃত্তের দেশ আমার না!

নিউইয়র্ক, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১২