ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন


যে অনিশ্চয়তাকে কপালে জুড়ে ১৯৮২ সালে হবিগঞ্জ থেকে পাড়ি জমিয়েছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, কুড়ি বছরের মাথায় প্রায় একই সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার কাঁধে ভর করে পৌঁছি আমেরিকার বিমান বন্দরে। সপরিবারে লন্ডনে এসেছিলাম প্রবাস দর্পণের প্রকাশক মি. রহমত আলীর দাওয়াতে। দু’সপ্তাহ লন্ডন, প্যারিস কাটিয়ে ঘরে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এরমধ্যে নিউইয়র্ক থেকে স্ত্রী’র বড় বোনের আমন্ত্রণ, আর সম্পাদক (প্রয়াত) বজলুর রহমানের পরামর্শ আমার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে। বজলু ভাই (মতিয়া আপার স্বামী) বলেছিলেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কভার করে আসার জন্য।

আগের বছর মিলেনিয়াম সামিট কভারের সুবাদে আমেরিকা এবং কানাডা’র জীবন ধারা সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয়েছিল। এ জীবন ধারার সঙ্গে মানিয়ে চলা মন্ট্রিয়েলের ফরহাদ টিটু (ভোরের কাগজের সাবেক ষ্পোর্টস এডিটর), তাজুল মুহাম্মদ ভাই (যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে প্রথম প্রামাণ্য চিত্রের একজন সহকারী পরিচালক), নিউইয়র্কে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীম চৌধুরী (উদিচী ঢাকা’র এক কালীন সাধারণ সম্পাদক)-র মতামত জানার চেষ্টা করি। আমেরিকা এবং কানাডায় বাংলাদেশীদের জীবনধারা নিয়ে রিপোর্টও করি। কিন্তু আমাকে আমেরিকায় অভিবাসী হিসেবে জীবন শুরু করতে হবে তা ভাবিনি কখনো।

লন্ডনের কেন্দ্র ক্যামডেনে আমার বাল্য বন্ধু কাজী শামীম এবং শহরতলী সারে’ এলাকায় আত্মীয় সম্পর্কিত বাদল ভাইয়ের বাসায় ছিলাম দুই সপ্তাহ। সেপ্টেম্ব্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রসভেনর স্কোয়ারে যেয়ে সপরিবারে আমেরিকান ভিসার জন্য আবেদন করি। এক সপ্তাহ পর ভিসা এসে যায় ডাকে। আমেরিকান নর্থ ওয়েস্ট এয়ার লাইসেন্স টিকিট কাটি। লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক- ১৩ই সেপ্টেম্বরের ফ্লাইট।


১১ সেপ্টেম্বর, বিকেল তিনটার দিকে বাদল ভাই তার কর্মস্থল থেকে টেলিফোনে আমাকে টিভি’র সামনে যেতে বললেন। টুইন টাওয়ারে আল কায়দা’র আত্মঘাতি হামলা! নিউইয়র্কে তখন সকাল ন’টা, সাড়ে ন’টা। স্মৃতিতে ভাসছে- আগের বছর শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী বাংলার বাণী’র সাংবাদিক আকতার ভাই-এর প্লাজা হোটেলের কক্ষে বসে অপলক দেখেছিলাম টুইন টাওয়ারকে। পৃথিবীর সর্বাধিক উচ্চতার পেট্রোনাস টাওয়ার (কুয়ালালামপুরে) দেখার পর পয়সা খরচ করে টুইন টাওয়ার দেখার আগ্রহ আর ছিল না। তথাপি মনটা বিষাদে ভরে উঠেছিল নিছক দু’টি ভবনকে ধ্বংস করার জন্য এতোগুলো মানুষের জীবনকে পুড়ে ছাই করার জন্য! ধর্মীয় উন্মাদনা মানুষকে কতটা পশুর স্তরে নামিয়ে দিতে পারে, সে বিষয়ে আমার ধারণা ছিল চবি’তে পড়ার সময়ে। কিন্তু এই উন্মাদনা যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত হবে তা ছিল কল্পনার অতীত।

নাইন ইলিভেনের ঘটনায় আমাদের যাত্রাকাল পিছিয়ে গেল এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ আমেরিকার সঙ্গে দুনিয়ার সব শহরের আকাশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ট্রাভেল অফিসে গিয়ে ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণ করা হলো ২১ সেপ্টেম্বর। নাইন-ইলিভেনের ঠিক দশ দিন পর। এই ক’দিন লন্ডনের সর্বত্র ভ্রমণের অনির্ধারিত সুযোগ। বন্ধুদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের কিছু সুফল পাওয়া যায় বিপদে-আপদে। আমার বাল্য বন্ধু মুকিত, শামিম, আনোয়ারা আপা, আজিজুন আপা, সুজা মাহমুদ, কাইয়ুম ভাই, জাকু ভাই, আউয়াল ভাই, বেড ফোর্ডের তারা ভাই থেকে শুরু করে যারাই শুনেছে আমি সপরিবার লন্ডনে, গাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছে। আতিথেয়তা শেষে পকেটে আবার কিছু নজরানা গুজে দিয়েছে। নিতে চাই না। কিন্তু এটাই নাকি লন্ডনের (সিলেটি) রীতি! না নিলে গৃহকর্তার ক্ষতি হবে! এই নজরানার পরিমাণ লন্ডন-নিউইয়র্ক যাওয়া-আসা টিকিটের দামের চেয়েও বেশি।

২১ সেপ্টেম্বর সকালে বাদল ভাই গাড়িতে নিয়ে গেলেন হিথরো বিমান বন্দরে। প্রায় ছয়-সাত ঘন্টার ফ্লাইট শেষে বিমানটি যখন নিউওয়ার্ক (নিউজার্সি’র) বিমান বন্দরে এসে পৌঁছল, তখন সন্ধ্যা ছুঁই-ছুঁই। পশ্চিম আকাশ রক্তিম আভায়। স্ত্রী’র বড় বোনের (কাজল ভাইয়ের) পুরো পরিবার এসে নিয়ে গেলেন বিমান বন্দর থেকে। ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে হবিগঞ্জে একটি টেলিফোন করলাম। মা’কে জানানো দরকার আমার অবস্থান। টেলিফোনে যে দুর্ভাগ্যজনক সংবাদটি জানা গেল, তাই হয়ে গেল আমার পরবর্তী জীবনের দিক নির্দেশক!


বড় ভাই জানালেন, ‘গতকাল বিকেলে পুলিশ এসে তোমাকে খুঁজে গেছে’। জানতে চাইলাম কেন? জানালেন তারা একটি গ্রেফতারী পরোয়ানার কথা বলল। সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা বলে তোমাকে সম্ভবত গ্রেফতার করতে এসেছিল। আমি বড় ভাইকে অনুরোধ করলাম, থানা থেকে যেন গ্রেফতারী পরোয়ানাটা নিয়ে এসে আমাকে ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দেন।

সেদিনই ফ্যাক্স এলো। ফ্যাক্সে পরোয়ানার ধারাগুলো দেখে আমার আর বুঝতে অসুবিধে হলো না এটি সেই ১৯৮৮ সালের একটি মামলা। সে বছরের ২৮ এপ্রিল চবি’তে শিবিরের সঙ্গে ‘ছাত্র ঐক্য’র মুখোমুখি বিবাদ হয়েছিল। বিবাদের জের ধরে শিবির হলে-হলে বিরোধী সংগঠক-কর্মীদের কক্ষের তালা ভাংচুর করে মূল্যবান সামগ্রী চুরি করেছিল। জামাতের বর্তমান এমপি হামিদ হোসেন আজাদের নেতৃত্বে শিবির কর্মীরা এ তান্ডব চালিয়েছিল। আমরা হল থেকে বাকি জীবনের জন্য বিতাড়িত হয়েছিলাম। শিবির ঘোষণা দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ, উল্টো আমাদের প্রায় চৌদ্দ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।

জামাতের মতিউর রহমান নিজামী সে সময় শিল্প মন্ত্রী। আজহারুল ইসলামসহ জনা কয়েক সাবেক আলবদর কমান্ডার বিএনপি জোট সরকারের মন্ত্রী। এরা ক্ষমতায় এসে প্রথম এজেন্ডা হিসেবে মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করেছিল। ‘বাঘে ধরলেও ছাড়ে, জামাতে ধরলে ছাড়ে না’। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সংগঠক একরাম হোসেন ঢাকা থেকে গিয়েছিল গৌরিপুরে, গ্রামের বাড়িতে বাবা-মাকে দেখতে। তাকেও বছর খানেক জেলে পুড়ে রেখেছিল ঐ একই মামলায়।

গণ ফোরামের সংগঠক এবং ঢাকায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা একরামের অবশ্য জেল খাটাতে খুব অসুবিধে নেই, কারন আর কাউকে সে তার ব্রতচারী জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেনি। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধে আছে। আমি জেলে থাকলে বৌ-বাচ্চা না খেয়ে মরবে! তবে আমি এবং একরাম যে রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী, তাতে নীতি-আদর্শের জন্য জেল খাটা বহু আগেই, অর্থাৎ এরশাদের স্বৈর জমানায় আমাদের জন্য বাঞ্চনীয় ছিল। দুর্ভাগ্যবশত এরশাদের স্বৈর শাসনে জেল না খাটলেও এই বিএনপি-জামাতের গণতান্ত্রিক শাসনে একরাম জেলের ভাত খাচ্ছে, আর আমি গ্রেফতার এড়াতে যুক্তরাস্ট্রে থেকে যাওয়ার চিন্তা করছি।


আমার ঠিক উপরের বড় ভাইটি ঢাকায় ওকালতি কাজে যুক্ত। তাকে অনুরোধ করলাম- বাংলাদেশ জুরিস প্রুডেন্স দেখে ধারাগুলো কোন-কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তা যেন অতিসত্ত্বর আমাকে জানায়। আর এসব ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তির পরিমাণ কি, তাও যেন জানাতে ভোলে না।

ধারাগুলো হুবহু আজ আর মনে নেই। তবে নিশ্চিত বলতে পারি সেগুলো সিঁধেল চুরি, কিংবা ছোট-খাট ডাকাতির ধারা। যাই হউক, ১৯৮৮ সালের ২৮শে এপ্রিলের ঘটনার পর আমার সম্মান চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে পরিসংখ্যানের সব দামি-দামি বিদেশী এডিশনের বইগুলো জামাতের যে সব মাদ্রাসা কর্মী চুরি করেছিলেন, তারা কেউই পড়ার জন্য এগুলো নেননি। তারা নিয়েছিলেন আন্দর কিল্লার সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে বিক্রির জন্য। এরমধ্যে লাইব্রেরির বইও ছিল। পরে সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট থেকে কয়েকটা উদ্ধার করেছিলাম। যাই হউক, চুরির ধারায় মামলা করেছিলাম আমরা। অথচ পালটা মামলায় জেল খাটতে হচ্ছে আমাদেরকেই!

‘ক্ষমতার’ কী ‘ইচ্ছা’? মতিউর রহমান নিজামী শিল্প মন্ত্রী হয়ে সে ইচ্ছেই পূরণ করছেন। যুবরাজ তারেক জিয়া রাজনীতির এই অন্ধকারের কারসাজি সম্পর্কে আদৌ সচেতন ছিলেন কি না সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ হয়! রাস্তায়, হরতালে, সভা-সমাবেশে, রক্ত-শ্রম-মেধা’র যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমরা এরশাদ স্বৈরশাহীর বিদায় ঘন্টা বাজিয়েছিলাম, সেই ক্ষমতাই জামাত-শিবির এখন প্রয়োগ করছে আমাদের বিরুদ্ধে! সেলুকাস, কী বিচিত্র এই বাংলাদেশ। অথচ এই সব মিছিল-মিটিং বাদ দিয়ে আমরা কেবল পড়াশুনো নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আমাদের প্রতিটি নেতাকর্মীর যোগ্যতা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে নির্ঝঞ্জাট জীবন-যাপনের! কই- আমরা তো এই সব ব্যক্তিগত লাভালাভের তোয়াক্কা করিনি! আমার বন্ধু একরামের যৌবন যে কোথায় নীরবে পালিয়ে যাচ্ছে, তা তো সে ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলেনি?


প্রবাস দর্পণ বের করার আগে আমার রিপোর্টার (সাংবাদিকতা) জীবনে টাকা-পয়সার টানা পোড়েন ছিল। বিয়ের আগে স্ত্রীকে তিন শর্ত দিয়েছিলাম, এর একটি ছিল “সীমিত আয়”। আমার স্ত্রী তাতেও রাজি ছিল। বাংলাবাজার পত্রিকায় বিএনপি-জাতীয় পার্টি ‘বিট’ করতাম। একদিন নাজিউর রহমান মঞ্জুর (তখনকার জাপা মহাসচিব) আমাকে ডাকলেন বারিধারার পার্টি অফিসে (সেটি এরশাদের বাসভবনও)। এরশাদ পাশে বসা। জিজ্ঞেস করেছিলেন- আমার বাড়ি ভাড়া কত? উত্তরে বলেছিলাম ছয় হাজার টাকা। মঞ্জুর তখন বলেছিলেন- ‘অনেক সাংবাদিককে আমরা বাড়ি ভাড়া পাঠিয়ে দেই’। ঘৃণায় তখন কপাল কুঁচকে উঠেছিল। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যে পেশায় পরের দাক্ষিণ্যে জীবন যাপন করতে হয়, সে পেশায় বদনাম গায়ে লাগার আগেই বিদেয় নেয়া উচিত। বাংলাবাজার ছেড়ে সংবাদে এসেছিলাম বেশি বেতনে। হায়, এখানেও সাত তারিখের বেতন হয় পনের তারিখে। কখনো এক মাসের বেতন আরেক মাসে গড়ায়।

ধানমন্ডি চৌদ্দ নম্বরের গলির ভেতরের ফ্ল্যাটের মালিককে তো বুঝ দেয়া যায় না! তাই একদিন ‘প্রবাসী আনন্দ বাজার’ দেখে প্রবাস দর্পণের চিন্তাটা মাথায় আসে। এর মাস্টহেড থেকে ভেতরে কি থাকবে সবই মনে মনে সাজাই। কিন্তু এমন কাউকে পাই না, যে এর খরচ দেবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে। তখন বাংলাবাজার পত্রিকার লন্ডন প্রতিনিধি (বিশ্বনাথের) রহমত আলী। ভদ্রলোক নিজের গরজেই খবর দেন টেলিফোন করে। একদিন সেই টেলিফোনটা ধরলাম আমিই। আমি ভদ্রলোককে প্রস্তাব দিলাম, তিনি লুফে নিলেন। ১৯৯৯ সালের ঘটনা। মাসিক প্রবাস দর্পণ বেরোয়। ধানমন্ডিতে অফিস নেই। কবির এবং সোহেল আমাকে সাহায্য করে। নিজ হাতে প্রিন্টিং-এর প্রায় সব কাজ করে পয়সা বাঁচাই। আমার প্রেরণা ইত্তেফাকের নাজিম উদ্দিন মোস্তান (প্রয়াত)। নিজে সিনিয়র রিপোর্টার হয়েও ‘রাষ্ট্র’ নামের একটি সাপ্তাহিক বের করেন সপরিবারে কম্পোজ করে।

আমার দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টের বাইরে এ কাজগুলো করতে হয়। আমার কাজ শুরু হয় সকাল নয়টায়। শেষ হয় রাত দু’টা-তিনটায়। স্ত্রীকে দেয়া তিন শর্তের এটিও ছিল এক শর্ত- ‘গভীর রাতে বাড়ি ফেরা’! কোনকোন রাতে আমার নব পরিণিতা স্ত্রীকে দেখতাম বারান্দার গ্রীলের ভেতর এক কোনে বসে জড়সড় মুরগীর মতো আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মা থাকতেন আমার সঙ্গে। তিনি স্ত্রীর এ ছটফটানির কথা বলতেন আমাকে। বলতাম আমার করার কিছু নেই- বিয়ের আগেই শর্ত দেয়া আছে!


তার আগের একটি ঘটনা বলতে হয়- আমার স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা। বাজার থেকে প্রেগন্যান্সি টেস্টের কাঠি কিনে এনে পরীক্ষা করলাম। পরীক্ষার ফল পজেটিভ। আমার স্ত্রী এক লাফে এসে আমার কোলে। সন্তানকে কোলে নেয়ার আগে স্ত্রীকে কোলে নেয়ার প্র্যাক্টিস আর কি! এতদিন সাহিত্যে পড়েছি- মেয়েদের মা হওয়ার আনন্দ! আজ বাস্তবে যখন এই দৃশ্য দেখলাম, তখন সত্যি বিশাল কিছু যেন আবিষ্কার করলাম!

আমার বাল্য বন্ধুর এক বড় বোন তখন ঢাকা মেডিকেলের গাইনী বিভাগের ডাক্তার। পরামর্শ নিতে এলিফ্যান্ট রোডে তাঁর বাসায়ও গেলাম। তিনি বললেন- ঢাকা মেডিকেলে আমি প্রায় নিখরচায় চিকিৎসা সেবা নিতে পারবো। তথাপি ভীড় ঠেলে, সময় নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। আমার তাতে কোন আপত্তি নেই! প্রায় নিখরচায় সন্তানের জন্মদান সম্ভব হবে, তাতেই আমি খুশি।

প্রথম যেদিন স্ত্রীকে নিয়ে গেলাম গাইনী বিভাগের সেদিনের দৃশ্য মোটেই সুখকর ছিল না। মল-মূত্রের বোটকা গন্ধের পাশাপাশি শত শত মহিলার দীর্ঘ অপেক্ষা দেখে আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবা’র হাল হকিকত বুঝতে বেগ পেতে হলো না। এ নিয়ে আমি রিপোর্টও করেছিলাম। তবু আমি খুশি। টানাপোড়েনের সংসারে বাড়তি চাপ যুক্ত হলো না! আর যে মানুষ দেখছি, এরা তো আমার দেশেরই, হোক না এরা যত গরীব-গরবা! একদিন বিদেশের মতো আমার দেশের মানুষও সুচিকিৎসা পাবে, এ আশায় বুক বেঁধে থাকি, আর নাক-মুখ বুজে দুর্গন্ধ গিলি!

ইতোমধ্যে আমার স্ত্রীর এক জটিলতা ধরা পড়লো। সন্তান জন্মদানের আগে তাকে যেভাবেই হউক ক্লিনিকে ভর্তি করতে হবে। ঢাকা মেডিকেলের ‘নিখরচার’ আশায় বসে থাকলে স্ত্রী-সন্তান উভয়ের জীবনই বিপন্ন হতে পারে! স্ত্রী বললো, মরবো যখন নিজের মা-বাপের কাছে গিয়েই মরবো। আমাকে সিলেটে কোন ক্লিনিকে ভর্তি করো। শ্বশুরশাশুড়ির সেবা নেয়া যায়, কিন্তু তাদের কাঁধে তো আর বন্দুক তুলে দেয়া যায় না। তাই ক্লিনিকের টাকাটার জন্য ঢাকায় সর্বশেষ আশ্রয় স্থল হিসেবে এক বন্ধুকে টেলিফোন করলাম। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার ধাক্কায় স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঘরে ফিরলাম।

এ সন্তানের নাম তো আর যা’তা দেয়া যায় না! আমি তখন চীফ রিপোর্টার, আর গুণ’দা (নির্মলেন্দু গুণ) তখন একই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। তাঁর কাছ থেকেই সন্তানের একটি যুতসই নাম পাওয়া যাবে। ১৯৯৮ সালের আগস্টে সারা দেশে বন্যা। গুণ’দা তখন নাম দিলেন ‘বন্যা’। টেলিফোনে আমি বললাম- গুণ’দা নামটি যথার্থ নয়। কারন ‘বন্যা’র সঙ্গে মানুষের কষ্ট আর দুর্বিপাক যুক্ত’। পরদিন সকালে গুণ’দা নাম পালটে দিলেন ‘অনন্যা’। বন্যার সময়ে এসেছে ‘অনন্যা’।

নাম রাখার জন্য মানুষ ধরে মৌলানা সাহেবদের। আর আমি কি না ধরলাম গুণ’দাকে। এ নিয়ে কৌতুক করে গুণ’দা একটি উপসম্পাদকীয়ও লেখেছিলেন।


আমেরিকায় যেদিন পা রাখি, আমার অনন্যা তখন তিন বছরের। যে জীবনকে আমি শরৎ, মাক্সিম গোর্কি কিংবা মার্ক টোয়েনের স্বপ্নে বিভোর থেকে পালিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি, সেই একই খড়-খুটোর জীবন আমার সন্তানকেও গ্রাস করুক, তা আর যেই হউক, কোন নির্বিবাদী মায়ের কাম্য নয়। আমার স্ত্রী তাই করল। বাড়িতে পুলিশ, এবং দেশে গেলেই গ্রেফতার হতে হবে এ অজানা আশংকায় সে আর দেশে ফিরে যেতে চায় না। সে দিব্যি এখানেও সংসার পাতিয়ে বসার আয়োজন করছে দেখে আমার হাসি পায়। ধারণা করতে পারি, এ স্ত্রী জাতির জন্যই মানুষ সংসার বিরাগী হয়! যেমনটা হয়েছে আমার বন্ধু একরাম, কিংবা আমাদের অগ্রজ নির্মল সেন সহ অনেকে! কিন্তু আমি এক প্রকার নিরুপায়!

ইতোমধ্যে স্ত্রীর পোয়াবারো, তাঁর ভাইটি ফ্ল্যাট ছেড়ে মিশিগানে ব্যবসা কিনে চলে গেছে সস্ত্রীক। কাজেই আসবাবপত্র, থালা বাসন সমেত ফ্ল্যাট একেবারেই খালি। বোনের সঙ্গে ছল্লা করে স্ত্রী আমাকে বললো- ‘মাসে সাতশো টাকা (ডলার) ভাড়ার ব্যবস্থা কর, আমি আর আমেরিকা ছেড়ে যাচ্ছি না’। তুমি কাজ না করতে চাইলে আমিই কাজ করবো। কী দুর্ভাবনার কথা! আমি-তুমি কাজ করবো কিভাবে? আমরা তো এখানে ভিজিটে এসেছি, কাজ করার অধিকার আমাদের নেই! আর আমরা এসেছি ছয় মাসের ভিসায়। দু’সপ্তাহ পর আমাদের রিটার্ন টিকিট! ফিরে যেতে হবে। দেশে গিয়ে দেখা যাবে জামাতি কাপুরুষদের কত শক্তি।

ওরা যদি ঢাকায় নামার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করতে চায়, করবে। তখন দেখা যাবে। বাংলাদেশ এখনো গরু-ছাগলের দেশ হয়ে যায়নি। স্ত্রী’র কাছে জানতে চাইলাম, ঢাকায় যে আসবাবপত্র বোঝাই বাড়িটি তালাবদ্ধ করে এসেছো, তার কি হবে? উত্তরে সে জানালো- ইতোমধ্যে আমি সে সব বিক্রির ব্যবস্থা করে ফেলেছি! বাহ কি চমৎকার আয়োজন! দেশে আমার স্ত্রী চাকরির সুযোগ পায়নি, যদিও আমি মনে প্রাণে চাইতাম সে কিছু একটায় নিজেকে ব্যস্ত রাখুক। আর এই পরবাসে সে কি না চাকরির ধান্দা করছে! আমাকে বলছে অমুক জায়গা-তমুক জায়গায় চাকরি পেতে ‘কাগজ’ লাগে না!

একদিন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেছে প্যরালিগ্যাল মন্টু ভাই’র অফিসে। মন্টু ভাই আগে মর্নিং সানে সাংবাদিকতা করেছেন। এখন জ্যাকশন হাইটস-এ ইমিগ্রেশন পরামর্শকের কাজ করেন। তার সামনে গ্রেফতারি পরোয়ানা তুলে ধরে স্ত্রী জানতে চায়- এ দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া যাবে কি না। ‘কেইস’ পেয়ে যাওয়ায় মন্টু ভাই কাগজটি তাঁর কাছে রেখে আমাকে টেলিফোন করলেন। বললেন এখনি তাঁর অফিসে যেতে। আমি সময় নিলাম। এদিকে আমার জীবনের দ্বিতীয় সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে ঘরে।

মন্টু ভাই নিজেই উদ্যোগী হয়ে আমাকে এটা-সেটা কাগজ পত্র আনতে বললেন। ঢাকা থেকে আমার ভাইকে টেলিফোন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনালাম। এক পর্যায়ে আমার দস্তখত নিয়ে আবেদনপত্র দাখিল করলেন। ওরা সব কাগজ ঢাকায় পাঠিয়ে সত্যতা যাচাই করে ডিসেম্বর মাসে সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ জানালো। এদিকে আমাদের টিকিট-পাসপোর্ট সব কিছু স্ত্রী যে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে, তাঁর আর হদিস পাচ্ছি না। ডিসেম্বরে বৈঠকের পর ওরা জানালো তোমার আবেদন গৃহীত হয়েছে। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস এবং কাজের ব্যাপারে তোমার কোন বাঁধা নেই। পাঁচ বছর পর নাগরিকত্বের জন্য তুমি আবেদন করবে। আর তোমার থাকা-খাওয়া, অবস্থানের ব্যাপারে কোন সহায়তা চাইলে আমাদের অসংখ্য অফিস আছে, যে কোনটিতে সাহায্য চাইতে পারো।


এতোকিছুর জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে যেতে চাই। আমার মা-ভাই-বোন কেউই এ দেশে নেই। কেবল ‘আমি-তুমি’ হয়ে এ দেশে আমি থাকতে পারবো না! স্ত্রীকে যত বুঝাই, ততই তাঁর যুক্তি ধারালো হয়। আমাকে বুঝাতে সমর্থ হয়- টাকা ছাড়া এ জীবন অর্থহীন। যে পেশায় ঘরের ভাড়া পরিশোধে বিলম্ব হয়, যে পেশায় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুখ স্বপ্ন দেখা যায় না, সে পেশা যত সম্মানের, প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে হেলিকপ্টারে ঘুরে বেড়াবার আনন্দে যতই বিভোর থাকুক, সে অতীতে আর ফিরে যেতে চাই না। তার উপর বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে এক সময় এর সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী পদত্যাগ করলে, তাৎক্ষনিক ঘটনায় আমার বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলার কারনে এ পেশার প্রতি সম্মান বোধও তাঁর আর নেই। কিন্তু নিজের কাছে কোন উত্তরই আমার জানা নেই।

সাংবাদিকতার সম্মানকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু যে সুখী বাংলাদেশের জন্য আমি আমার যৌবনে নীতি-আদর্শের পতাকা উড়িয়ে ছিলাম, আমার কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বেশি গৌরবের। আমি কেবল সেই জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সংক্ষিপ্ত এক যুগের সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলাম। আমার কাছে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বেশি গৌরবের। আমি রাস্তার মানুষ। প্রখর রোদ্র তাপে চট্টগ্রামের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পিকেটিং করার লোক আমি। পার্টি অফিসে চটের উপর ইটের বালিশে ঘুমিয়ে পড়ার লোক আমি। উন্মুক্ত রাস্তায় ঘামে চপচপে, বৃষ্টিতে ভিজে, ট্রাফিক আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার লোক আমি। মুখটাকে বালিশে গুজে আমি কেবল ডানা কাঁটা পাখির মতো বলতে থাকি- প্লিজ তুমি আমাকে আর সুখ স্বপ্ন দেখিও না। আমি এসবের কিছুই কেয়ার করি না!

নিউইয়র্ক, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১২