ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

আমাদের এই শান্তির পৃথিবী কি দিনে দিনে অশান্ত হয়ে উঠছে? প্রযুক্তির বিকাশ কি মানুষে-মানুষে দূরত্ব কমার বদলে হিংসা হানাহানি বাড়িয়ে দিচ্ছে? পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার জন্য আমাদের কি করা উচিত?
উপরের এ প্রশ্নগুলো শান্তিকামী প্রতিটি মানুষের। যারা উপলব্ধি করেন সামাজিক প্রগতি এখনো পৃথিবীর সব ক’টি অঞ্চলে সমানভাবে বিকশিত হয়নি। অজ্ঞানতা এবং অন্ধকার, কূপমন্ডুকতা থেকে পৃথিবীর সকল মানুষকে এখনো মুক্ত করা যায়নি। অথচ মানুষের এই নিরন্তর বেঁচে থাকার সংগ্রামের মাঝেও উঁকি দেয় সহিংসতা, পরমত অসহিষ্ণুতা এবং একের উপর অন্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রতিযোগিতা!

নাইন ইলিভেনের পর আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একটি ভবিষ্যৎবাণীতে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল- আমেরিকার ভেতরে ও বাইরে কঠিন চাপের মুখে পড়তে হবে মানুষকে। এরও আগে স্নায়ু যুদ্ধ সমাপ্তি পর্বে (১৯৯১ সালে) বলা হয়েছিল পৃথিবী এখন মুখোমুখি হবে আঞ্চলিক সঙ্ঘাত এবং নয়া উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে। বড় রাস্ট্রগুলো গ্রাস করতে চাইবে ক্ষুদ্র রাস্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। পূবের সমাজতান্ত্রিক, এবং পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলোর স্নায়ু যুদ্ধ অবসানের কুড়ি বছরে আমরা দেখতে পাচ্ছি আসলে মানুষ জাগছে। আর এই গণ জাগরণে প্রযুক্তি, মানবতা এবং মুক্তির দর্শন নিয়ে যে দেশটি সব স্তুতি এবং অপবাদ নিয়ে চালকের আসীনে, সে হলো মার্কিন যুক্তরাস্ট্র।

যে পরাক্রমশালী সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানুষ চিনতে শিখেছে এবং অজ্ঞানতার পর্দা ঠেলে “বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের কল্যাণে” একটি নতুন “মানব দর্শন” রচনার জন্য উদগ্রীব হয়ে যে মানুষ পথের সন্ধান করছে, সে মানুষ আর আগের মানুষ নেই। চিরাচরিত মূল্যবোধ কিংবা নিজের আজন্ম লালিত শাসন-অনুশাসনের বাইরে গিয়েও মানুষ সত্যের অনুসন্ধান করছে! মানুষের এই চেস্টাকে সার্থক করে তুলছে ক্রমবিকাশমান কম্পিউটার প্রযুক্তি। মানুষ তাই আজ যেমন জানে নিজের ঘরের কথা, তেমনি জানে পরের কথাও। আর সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো- প্রযুক্তিটি এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ঠিক যেন গলির মুখে দোকানের পানের খিলি’র মতো! মানুষ তাই কথা ও কাজে আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল, অনেক বেশি প্রতিভাবান, অনেক বেশি করিতকর্মা! প্রযুক্তিই তাকে এমনটি করেছে, অন্য কিছু নয়।

মানুষের এতসব উৎকর্ষ সাধন এবং বিকাশের পরও অন্ধকারের শক্তি বসে নেই। কোরান বাইবেলে বর্ণিত “শয়তান”কে আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু শয়তানরূপি মানুষকে আমরা দেখতে পাই। এবং এরা আমাদের সমাজেই বসবাস করছে। এরা আত্মসার্থ পরায়ণ। এবং এই হীন ব্যক্তি স্বার্থের ব্যাপারে এরা কোন আপোস করে না। সমাজে বিশৃঙ্খলা ও হানাহানি দানা বাঁধুক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। এরা এই প্রযুক্তির উৎকর্ষকে হীন স্বার্থে ব্যবহার করে এর অপব্যবহারকে উস্কে দিচ্ছে। দায় বর্তাচ্ছে প্রযুক্তির উপর! তাই কিছু মানুষ, যারা এখনো এর সুফল সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নয়, সামাজিক নেটওয়ার্কের বিকাশকে গালি দেয়। কারন এই বিকাশ ভবিষ্যতের সামাজিক ন্যায় বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছে! কিন্তু তারা এই বিকাশকে মেনে নিতে পারছে না।
সামাজিক যোগাযোগ বাড়ার কারণে পিছিয়ে পড়া জাতিগুলো যেমন সম্ভাবণার নতুন দ্বার খোলার সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি বলতে দ্বিধা নেই- কতক ক্ষেত্রে দেশে দেশে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার নিয়ামক হিসেবেও কাজ। তবে যতই দিন যাবে, মানুষ অভ্যস্থ হয়ে উঠবে। “শয়তান”কে শয়তান রূপেই চিনতে পারবে। মানুষের বেশে শয়তান কোন দূস্কর্মে মেতে উঠতে পারবে না। মানুষের জ্ঞান, ধৈর্য, সাহস আর মনের দরোজা খোলে দেয়ার মধ্যেই আছে শয়তান প্রস্থানের ইঙ্গিত।

কন্সিকুয়েন্স অব নাইন-ইলিভেন
আমেরিকার সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি মনে করা হয় নাইন-এলিভেনকে। আমেরিকার স্বাধীনতার পর গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-৬৫), ১৯৩০ এর মহামন্দার পর ভিয়েতনাম কিংবা কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধকেও ছাপিয়ে সামনে চলে এসেছে নাইন-এলিভেন। ২০০১ সালের এই একটি ঘটনা আমেরিকার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্দেশ করেছে। সমাজ কিংবা সার্বজনীন আমেরিকান জীবন দর্শনেও বেশ কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এই মাত্র কিছু দিন আগে স্নায়ু যুদ্ধ ঘটনা পরবর্তীতে যে আমেরিকা দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নিম্নমুখি বেকারত্ব (২ থেকে ৪ শতাংশ), তথ্য প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, এবং নিম্ন মূল্যস্ফীতির ‘ম্যাসল’ নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিল, সে সবই এখন অতীত!
পুরনো নেতৃত্ব (বা কর্তৃত্ব) খর্ব হওয়া (বা চলে যাওয়ার) কালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নতুন-নতুন নেতৃত্ব আত্ম-প্রকাশের কাল শুরু হয়েছে। এতেই হয়তো বাঁধছে সঙ্ঘাত এবং কলহ! ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, এবং এশিয়ার চীন-ভারত সবারই সাবালক হয়ে ওঠার মহরৎ চলছে। তবে আমেরিকা এই নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন সম্ভাবণার ইঙ্গিতবহ। এতে করে খুব নিকটে আফ্রিকা ও এশিয়ায় চির শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মানুষের এক মহাজাগরণ সম্ভব হয়ে উঠবে!

লিবিয়া ও মিসর উত্তপ্ত কেন?
গত ক’দিন ধরে পাশাপাশি রাস্ট্র লিবিয়া এবং মিসর ভীষণ উত্তপ্ত। যে শয়তানের কথা কিছুক্ষণ আগে উল্লেখ করেছি, এটা সে শয়তানের কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়া! শয়তান চেয়েছিল মানুষ এভাবেই যেন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। তবে এই প্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে মানবতার। একজন রাস্ট্রদূতসহ নিহত হয়ে গেছেন চারজন। শয়তান নিখোঁজ। জঙ্গলে বসে মুখটিপে হাসছে। দেখছে- তারই কর্মকান্ডের জবাব দিতে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনের মঞ্চে উঠছেন হিলারী ক্লিনটন। আমেরিকান ফ্রিডমের অপব্যবহারকারী ‘স্যাম বাসিল’ নামের এই শয়তানটিকে কিভাবে ‘ন্যায়-বিচারের” আওতায় আনা হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শয়তানের গুড়
‘ইনোসেন্স অফ মুসলিম’ নামের দুই ঘন্টার একটি চলচিত্র তৈরি করেছেন ‘স্যাম বাসিল’ নামের এক ক্যালিফোর্নিয়ান। ছবিটি তৈরির সময় এর নাম ছিল “ডিসার্ট ওয়ারিওর”। যা ২০০০ বছর আগে মরুভূমির জীবন ধারার উপর নির্মিত বলে দাবি করেছেন এর অভিনেত্রী ‘গার্সিয়া’। ছবিতে নবীর নাম ‘মুহাম্মদ’ উচ্চারণ করা হয়েছিল “মাস্টার জর্জ” হিসেবে। কিন্তু ছবির আর্বি ডাবিং এবং সম্পাদিত ভার্সনে মাস্টার জর্জ এসেছে মুহাম্মদ উচ্চারণে। অভিনেত্রী আরো দাবি করেছেন মূল ছবিতে ধর্মের কোন কাহিনী ছিল না। কিন্তু চৌদ্দ মিনিটের ছবির ট্রেইলারে নাম পরিবর্তিত হয়ে গেছে “ইনোসেন্স অব মুসলিম” নামে। এবং আমার বিবেচনায় এটি একটি পর্ণ ছাড়া আর কিছু নয়। এখন ছবির নায়িকা গার্সিয়া মামলা করতে যাচ্ছেন পরিচালক স্যাম বাসিলের বিরুদ্ধে।
যদিও গত মঙ্গলবার থেকে স্যাম লাপাত্তা হয়ে আছে। অজানা স্থান থেকে টেলিফোন সাক্ষাতকারে সে বলেছে ‘ইসলাম’ ধর্মের প্রতি সে রুষ্ট! ৫০ লাখ ডলারে নির্মিত এ ছবির পুরোটাই নাকি দিয়েছে একশ জন ইহুদী ব্যবসায়ী। এদিকে ইসরায়েল বলেছে এ নামের কোন ব্যক্তির হদিস নেই তাদের রাস্ট্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে। এমনকি বাসিল পেশায় নিজেকে ক্যালিফোর্নিয়ার একজন রিয়েল এস্টেট ব্রোকার দাবি করলেও এ নামের কোন ব্রোকারও নেই ওই এলাকায়।
ইসরাইলের প্রতিবেশি মিসরের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সার্বক্ষনিকভাবে দেখানো হয় “ইনোসেন্স অব মুসলিম”-এর ট্রেইলার। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ লিবীয়ার আমেরিকান দূতাবাসে হামলা চালায়। কায়রোর আমেরিকান দুতাবাস অবরুদ্ধ। যদিও লিবীয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে চরমপন্থী চারজনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু সেদিনই (অথবা আগের দিন) একটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটে গেছে ওয়াশিংটনে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বনি আমিন (বেঞ্জামিন) নেতানিয়াহু চাইছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাত। প্রেসিডেন্ট ব্যস্ততার কারনে সাক্ষাত দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ফুঁসে ওঠে তাবত ইহুদী মিডিয়া।
এমনিতেই প্রেসিডেন্ট ওবামাকে তারা সর্বক্ষণ বারাক হুসেইন বলতেই অভ্যস্থ। তথাপি রিপাবলিকানদের আদরে বেড়ে ওঠা নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে এখন অনেকটা অবজ্ঞার। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমেরিকান মিডিয়াও এই চরম রক্ষণশীল ইহুদী নেতার উপর আর ভরসা করতে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে অজ্ঞানতার অন্ধকার কাটিয়ে জেগে ওঠা মুসলিম সমাজকে তাই সন্ত্রস্থ থাকতে হবে, যাতে শয়তান গুড় লাগাবার সুযোগ না পায়!
মুসলমানদের মনে রাখতে হবে নাইন-এলিভেনে সন্ত্রাসীরা ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করলেও এখনো ইউরোপ এবং আমেরিকায় ইসলাম ধর্ম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে বিকাশমান। তাই মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কোন শয়তানের প্ররোচনায় তারা যেন অসহিষ্ণু হয়ে না ওঠেন। যে মানবতার শিক্ষা পৃথিবীর সকল ধর্মের মধ্যে প্রবাহমান, ইসলামের অনুসারীরা তা প্রদর্শনে যেন পিছ’পা না হন! পাশাপাশি যে অন্তর্জালিক নেটওয়ার্কের সুবাদে মানুষ ক্রমেই একে ওপরের কাছাকাছি এসে দাঁড়াচ্ছে, এর অপব্যবহারের ব্যাপারেও আমরা যেন সজাগ থাকি। কারন এর অপব্যবহারেই আমাদের এই শান্তির বিশ্ব ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে!

শয়তানের গল্পটি কি ছিল?
দীর্ঘ দিন ধরে গ্রামের বাজারে অবহেলায় আশ্রিত দুই শয়তান বাজি ধরেছিল নিজেদের মধ্যে। মানুষের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি সৃষ্টিতে কে বেশি পারদর্শী, এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা! বড় শয়তানটি সামান্য গুড় এনে লাগিয়ে দিয়েছিল এক মুদি দোকানের চৌকাঠে। সে গুড় খেতে এগিয়ে আসে পিঁপড়া। পিঁপড়াকে দেখে এগিয়ে আসে একটি তেলাপোকা। তেলাপোকাটি আক্রান্ত হয় পিপীলিকায়। তেলাপোকার নড়াচড়া দেখে এগিয়ে আসে দোকানীর আদরের শিকারী বেড়াল। বেড়ালকে দেখে তেড়ে আসে পাশের দোকানে আশ্রিত বেয়াড়া কুত্তা। মটকে দেয় বেড়ালের ঘাড়টা। এ নিয়ে দুই দোকানীর বাক বিতন্ডা বাড়তে থাকে। জড়ো হতে থাকে তাদের ভাই-বেরাদর, অনুসারী। অতঃপর দুই গ্রামের বিবাদে হতাহত হয় বহু মানুষ। যুক্ত হয় থানা-পুলিশ। পুলিশের ধাওয়ায় গ্রামছাড়া হয় মানুষ। বড় শয়তান তখন ছোট শয়তানকে বলে “দেখেছিস আমার কেরামতি?”

শেষ কথা
সাইবার সংস্কৃতির এই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ে আমাদের শুভবুদ্ধি যেন শয়তানের প্ররোচনায় খাদে গিয়ে না থামে! আমরা যেন একটু সময় নিয়ে সামলে উঠি, আর নিজেকে প্রশ্ন করি- ‘আমার ভূমিকা কতটা মানব হিতৈষী’! সবশেষে আমি গত মাসে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত সাইবার সেফটি সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কর্মশালায় গৃহীত প্রস্তাবনার অংশ বিশেষ তুলে ধরে এ লেখার ইতি টানছি।
We’re confronting some new realities in cyberspace and we need some new thinking and new energy. Our message begins with a simple concept: to ensure cyber security for all of us, each of us must play our part. We know it only takes a single infected computer to potentially infect thousands and perhaps millions of others. We hope that this gathering and others reaffirm our collective commitment to ACT – Achieve Cyber security Together.

নিউইয়র্ক, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১২