ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

চট্টগ্রামের উত্তাল দিনগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, আর ওমনি শুরু হলো সামরিক শাসন। বিপ্লবী সাহিত্য পাঠের পর মধ্যবিত্ত জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা মিশে গেল মিছিল আর মিটিং-এ। দিনের পর দিন হরতাল, পিকেটিং, পুলিশের লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাসে জনজীবনে নাভিশ্বাস। মানুষ এ অরাজকতা থেকে মুক্তি চায়।

স্বাধীনতা লাভের বারোটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই একের পর এক সামরিক শাসনের জোয়ালে মানুষ দিশেহারা। শাসক গোষ্ঠীর কাছে মানুষের কোন দাবি দাওয়ার মূল্য নেই। মানুষের কন্ঠ রুদ্ধ। একইভাবে সংবাদ পত্র, রেডিও-টিভি’র কোন স্বাধীনতা নেই। আন্দোলন সংগ্রামের কোন খবর প্রচার মাধ্যমে উঠে আসছে না। এক দম বন্ধকর পরিস্থিতি!

’৮২, ’৮৪, ’৮৬, ’৯০ এর বছরগুলোতে কেবল পুলিশ নয়, আন্দোলন ঠেকাবার নামে এরশাদ স্বৈরশাহী রাস্তায় নামিয়ে দেয় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী। কখনো সেনাবাহিনী এবং জনগণ একেবারে মুখোমুখি। পুলিশের জল কামানের সামনে দাঁড়ানো যায়, টিয়ার শেল কুড়িয়ে আবার পুলিশের দিকেই ছূড়ে মারা যায়। কিন্তু গুলির সামনে দাঁড়াবে কে? কিন্তু না, পুলিশের গুলির মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের হলের ছাত্র মোজাম্মেল শহীদ হলো সেই ১৯৮৩ সালে! জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা, সেলিম, দেলোয়ার, কমরেড তাজুল- শহীদের কাতারে এক ঝাঁক থোকা থোকা নাম।
সারাদিনের আন্দোলন-কর্মসূচির পর আমরা যেতাম সংগঠনের অফিসে বিজয়ী নায়কের বেশে। যেন আমরা কিছু একটা করে এসেছি। কিন্তু ঢাকায় কি হচ্ছে, জানবো কি করে? নাই মোবাইল, নাই টেলিফোন! সংবাদপত্রে সেন্সরের পর কিছু টুকরো খবর হয়তো পাওয়া যাবে পরের দিন। কিন্তু সেই বারো-চৌদ্দ ঘন্টা বসে থাকলে যে আন্দোলনের তেজটাই নস্ট হয়ে যায়! তাই আমাদের একমাত্র ভরসা ‘বিবিসি’। ‘বিবিসি’র খবরের জন্য রাত পৌণে আটটায় ওঁত পেতে থাকতাম।

আমরা থাকতাম কাজির দেউড়িতে। সন্ধ্যার পর রিয়াজুদ্দীন বাজারের পাশে দারুল ফজল মার্কেট থেকে হাঁটা দিতাম। পথে একটি হোটেলের নীচ তলায় রেডিওতে বিবিসি শোনা যেত। প্রতিদিন একই সময়ে আমরা- মানে আমি, একরাম, নীরোদ (আহমেদ আব্দুল্লাহ চৌধুরী), কখনো সাহিদ উপস্থিত হতাম রেডিওটির পাশে। লাল খা বাজারে যখন থাকতাম, তখন বিবিসি শোনার জন্য উপস্থিত হতাম হোমিও প্যাথিক দোকানে। সে সময় বিবিসি আমাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল একমাত্র আতাউস সামাদের কারনেই। আতাউস সামাদ সারা দেশের ঘটনা পঞ্জির নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে পরের দিনের কর্মসূচিও জানিয়ে দিতেন। পার্টি নেতারা কি বলবেন, সেজন্য আর আমাদের অপেক্ষা করতে হতো না!

সে সময় আমাদের চট্টগ্রাম ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, পরে সভাপতি, তরুণ ছড়াকার আলেক্স আলীম সাংবাদিক আতাউস সামাদকে নিয়ে একটি ছড়াও বানিয়েছিলেন। বিবিসি’তে সংবাদ পরিবেশনের পর তিনি ‘ডেট লাইন’ দিতেন এভাবে- “আতাউস সামাদ, বিবিসি, ঢাকা”। এটাকে প্যারোডি করে আলেক্স আলীম বলতেন- “অ্যাঁই আতাউস সমাদ খই দ্যা” (আমি আতাউস সামাদ বলছি)।

১৯৯০-এর জুনে ঢাকায় ফিরে ১৯৯১ সালের মার্চে আমার সাংবাদিকতা পেশাকে বেছে নেয়ার পেছনে যদি কোন একটি মানুষও ভূমিকা রাখেন তার প্রধান নায়ক ছিলেন আতাউস সামাদ। এই মহান সাংবাদিকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সামান্য সুযোগ হয়েছিল আমার জীবনে। ১৯৯১ সালে দেশে নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের পর জীবন-জীবিকার তাগিদে রাস্তার মিছিল-মিটিংকে অনেকটা ছুটিই দিয়ে দিলাম।

সাংবাদিকতার প্রথম জীবনে সহ-সম্পাদকের ডেস্কের চাকরির পর বিকেলটা নিস্ক্রিয়, অনেকটা এক ঘেয়ে। এ সময় ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি জার্নাল বের করা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। আতাউস সামাদ ভাইয়ের লেখা আদায় করার জন্য তার নয়া পল্টনে লাল দোতলা বাড়িটিতে ঘন-ঘন যাতায়াত করি। সাংবাদিকতার বাইরেও অনেক বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়। তখনও জানতাম না তথ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা কামরুন নাহার আপা তার স্ত্রী।

এক নিরহংকারী, সাধারণ মানুষের একান্ত আপন জন সামাদ ভাইকে দেখেছি যে কোন আন্দোলন সংগ্রামে রাস্তায় সাধারণ মানুষের কাতারে। তিনি ছিলেন না কোন দলের, কোন মতের, পথের। আজ সাংবাদিকতা পেশা শুরু করেই যাদেরকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি অথবা জামাতের দলে নাম লেখাতে হয়, তাদের জন্য সামাদ ভাই ছিলেন এক ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল তারকা! এক নির্বিরোধী পেশাদার মানুষ। বাংলাদেশের বর্তমান ‘সাংবাদিকতা’ এই মানুষটির কাছে পর্বত প্রমাণ ঋণী!!

নিউইয়র্ক, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২