ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

সাম্প্রদায়িকতা এবং দুর্নীতি, দুটি’ই সমাজের দুষ্টক্ষত। ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গ যেমন একটি চারা গাছকে বাড়তে দেয় না। তেমনি সাম্প্রদায়িকতা মাটির নীচে অন্ধকারে অঙ্কুর নস্ট করে ফেলে। আর দূর্নীতি প্রকাশ্যে কীটপতঙ্গ হয়ে আক্রমণ করে বসে পুরো গাছ! দুর্ভাগ্যবশত এ দুটিরই আশ্রয় আর ভরসার স্থল রাজনীতি। পৃথিবীর কোথায় সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করেনি রাজনীতির প্রকাশ্য ইন্ধন ছাড়া? পৃথিবীর কোথায় দুর্নীতি পাখা মেলেনি রাজনীতির উপর ভর না করে?

উচ্চ প্রযুক্তির আমেরিকা থেকে নিম্ন প্রযুক্তির বাংলাদেশ পর্যন্ত সমাজ জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে দুর্নীতি এবং সাম্প্রদায়িকতা! উভয় দেশের ক্ষেত্রেই বড় দুর্নীতিগুলো আইনানুগ, আর ছোটগুলো বেআইনি। বড় দুর্নীতিগুলো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে সাধারণের বিবেচনার বাইরে থাকে। কিন্তু ছোটগুলো সাধারণের দৈনন্দিন জীবন-যাপনকে অতিষ্ঠ করে তুলে বিধায় আমেরিকায় সে সবের বিচার অত্যন্ত কড়া, সে তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোন বিচার নেই।

আমরা প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে দেখলাম কি সুন্দরভাবে ওয়ান-ইলিভেনের পুরো ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হলো। কোথায় প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার দাবিতে সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করলো টুইন টাওয়ার! তা পাশ কাটিয়ে ‘ইসলামী সন্ত্রাসী’ নাম দিয়ে আক্রমণ করা হলো ইরাক! হাজার-হাজার নিরীহ ইরাকীর জীবন প্রদীপ নিভে গেল! একই সঙ্গে নিহত হলো কয়েক হাজার আমেরিকান সৈনিক!

ভার উপমহাদেশে আমরা দেখলাম কিভাবে বিজেপি ও হিন্দু মহাসভা’র প্রকাশ্য ইন্ধনে মিশিয়ে দেয়া হলো বাবরি মসজিদ। কিভাবে গুজরাটে ট্রেন পুড়িয়ে হত্যা করা হলো শত-শত মানুষ! আমরা দেখলাম মায়ানমারে রোহিঙ্গা বিতাড়নের নামে কিভাবে পুড়িয়ে দেয়া হলো শত-শত মুসলামানের ঘরবাড়ি। সম্প্রতি আমরা দেখলাম কিভাবে আসামে বাঙালী খেদাওয়ের নামে জালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হলো বাংলাভাষী মুসলমানের বাড়িঘর! নিকট অতীতে আমরা দেখেছি কিভাবে আফগান তালেবানরা মিশিয়ে দিয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন গৌতম বুদ্ধের টেরাকোটা!
এই সুপার হাইওয়ের দুনিয়ায় আমাদের বিশ্বটি দিনে দিনে একাকার হয়ে যাচ্ছে। একদিকে মানুষে মানুষে সাংস্কৃতিক মেল বন্ধন বাড়ছে। অন্যদিকে মানুষে মানুষে বিভক্তি সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে এই উভয় গোষ্ঠীই বসবাস করে রাজনীতির উপর পরজীবী হয়ে। দুষ্ট রাজনীতি এদের আশ্রয় এবং প্রশ্রয় দেয়। জামাতে ইসলামীর সাম্প্রদায়িক চরিত্র দূর থেকেই চেনা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভেতরের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটিকে চিনবেন কিভাবে? এরা টিকে থাকে এবং বিস্তার লাভ করে দুর্নীতির উপর ভর করে। কাজেই কেবল সাম্প্রদায়িকতাকে নয়, হত্যা করতে হবে দুর্নীতিকেও।

পশ্চিমা দুনিয়ার একটি সুবিধা আছে। তারা ধর্মের অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন অনেক আগে থেকেই। তাই রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করেছে। যদিও ব্যক্তি বুশ-ব্লেয়ারের মতো কট্টরপন্থীদের উপরেও ধর্মের আছর থাকে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের এই বসতি স্থলে ধর্ম রাজনীতি থেকে কখনো পৃথক হয়নি। তাই কিছুদিন পরপর ক্ষোভ জমা হতে হতে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো এর উদ্গীরণ ঘটে। মানুষ সচেতন হয়ে উঠছে বিধায় এই ক্ষোভের প্রকাশ আগের মতো এতটা বিধ্বংসী নয়। পাঠক স্মরণ করুন ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় কত হাজার-হাজার হিন্দু-মুসলমান এই সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে বলি হয়!

২৯ সেপ্টেম্বর রামুর বৌদ্ধ বিহারে হামলা এবং পুড়িয়ে দেয়া, জনপদ এবং বসত ভিটা ছারখার করে দেয়ার ঘটনা জাগ্রত বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশের সর্বত্র মানুষ এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসে মানব বন্ধন, প্রতিবাদী সমাবেশ করছে। এটাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের শক্তির উৎস। এই গণ সচেতনতা বাংলাদেশকে অনন্য করে রেখেছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।

আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার পর্যন্ত এই দেশগুলো একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। দূর থেকে এই দেশগুলোকে একই ক্যানভাসে চেনা যায়। হিন্দু, ইসলাম এবং বৌদ্ধ এখানকার জনপদে মিশে গেছে মাটির মমতায়। ঠাই করে নিয়েছে মানুষের মনোজগতে সার্বজনীন সামাজিক কল্যাণের ভিত্তিভূমি হিসেবে। সুফিবাদের ইসলাম, সনাতন কিংবা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কারো আচরণেই কট্টর পন্থা অবলম্বনের সুযোগ নেই। সব ক’টি ধর্মই মানুষকে শঠতা, নীচতা এবং হিংসা-হানাহানি থেকে নিবৃত করার উপায় খুঁজেছে। খ্রীস্ট ধর্মও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের একটি স্বার্থান্বেষী চক্র ধর্মের বাণী শুনবে কেন? এরাই সাম্প্রদায়িক, মানুষের মধ্যে বিভেদ উস্কে দিয়ে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করাই এদের প্রকৃত উদেশ্য!

অপরদিকে দুর্নীতি পরায়ণরা সব সময় বেপরোয়া। এরা শিক্ষিত এবং সমাজে এদের বাস উপরিতলায়। ইংরেজীতে একটি কথা বলা হয়- “ইট ইজ ইজি টু মেক মানি বাই বল পয়েন্ট দ্যান গান পয়েন্ট”(It is easy to make money by ball point than gun point)! যারা সমাজে দুর্নীতি করে এবং ছড়ায়, এরা কেবল সাম্প্রদায়িকতা নয়, যে কোন অপকর্মে সিদ্ধহস্ত! সাধারণের দৃষ্টিকে অন্যত্র ঘুরিয়ে দেয়ার প্রয়াসে এরা সব ধরণের অপকর্মে আশ্রয় নিতে পারে। এরা যেন আর কখনো রাজনৈতিক আনুকূল্য না পায়, সেটাই আজ সময়ের দাবি।

মানুষ যেমন ধর্মের অবমাননা ভালবাসে না, তেমনি ভালবাসে না দুর্নীতিও। সম্প্রতি মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এপিএস ফারুকের ড্রাইভার সাক্ষাৎকারে কি বলেছে শুনুন। ভারতীয় পত্রিকায় কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়ার মেয়ে প্রিয়াঙ্কার স্বামী কিভাবে ছয়’শ গুণ বেশি সম্পদের মালিক হয়েছে তাঁর কাহিনী পড়ুন। জামাত নেতৃবৃন্দসহ সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সাহেবরা জেলে আছেন। ইনারা কি কেবল তাসবিহ জপছেন, না অন্য কোন ফন্দিও আঁটছেন সেগুলো হিসাব করুন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে জড়িয়ে বাংলাদেশের ট্যাবলয়েড যে রগড় কাহিনী ছড়িয়েছে, পাকিস্তানের গোয়েন্দারা এর জবাব দানের কোন সুযোগ খুঁজেছে কি না মাথায় রাখুন। সর্বোপরি রামুর হামলায় জড়িত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কর্মীদের ব্যাপারে দল দু’টি কি সিদ্ধান্ত নেয় সে ব্যাপারে নজর রাখুন। দল দুটিতে ঘাপটি মেরে থাকা জামাত কর্মীদের ব্যাপারে শীর্ষ নেতারা সচেতন আছেন কি না সে ব্যাপারে মোহাম্মদ হানিফ কিংবা বিএনপি মহাসচিবকে প্রশ্ন করুন। সব শেষে রাজনীতি থেকে সাম্প্রদায়িকতা এবং দূর্নীতি চিরতরে নির্মূলের জন্য সারাদেশে গণ জাগরণ তৈরি করুন।

নিউইয়র্ক, ৬ অক্টোবর ২০১২