ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

স্ত্রীকে রান্না ঘরের ছুরি দিয়ে হত্যার পর আদালতে দাঁড়িয়ে হতভাগা স্বামীটি বললো আমার কোন দোষ নেই হুজুর, যত দোষ ওই ছুরির। এই ছুরিটি আমার স্ত্রী গত কুড়ি বছর একনাগারে ব্যবহার করেছে। আমি কেবল সেদিনই হাতে নিয়েছিলাম। ঠিক তেমনি আমেরিকার আদালতে দাঁড়িয়ে যদি তরুণ নাফিস বলে- ‘স্যার আমার কোন দোষ নেই। যত দোষ ওই কম্পিউটারের। ওই কম্পিউটারটি আমাকে ভুল পথে তাড়িত করেছে! অথচ এই কম্পিউটারের জনক কিন্তু আমেরিকা।’ তাহলে বিচারকের চোখে দোষের মাত্রা বিন্দুমাত্র কমবে বলে মনে হয় না। হতভাগ্য স্বামীটির মতো নাফিসকেও আদালত শূলে চড়াবেন, যদি তাদের দোষ প্রমাণিত হয়।

নাফিস গ্রেফতারের পর বার বার মনে হয়েছে, পৃথিবীতে কম্পিউটার আবিষ্কার না হলে, অথবা ১৯৯৫ সালের ৯ আগস্ট ‘নেটস্ক্যাপ’-এর হাত ধরে অন্তরজালিক সেবা মাকড়শার জালের মতো পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত না হলে নাফিসের মতো অনেক অঘটন থেকে পৃথিবী রেহাই পেতো! বিজ্ঞানের বিস্তৃতি এবং সহজলভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি (আরেক অর্থে দায়িত্বশীলতা) একই সঙ্গে বিস্তৃত না হওয়ায় এক তালগোল পাকানো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এমন কি আমরা ভাবারও সুযোগ পাচ্ছি না সভ্যতার কতটা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা আজকের এই অবস্থানে!

এ লেখাটিতে নাফিস দোষী কিংবা নির্দোষ তা প্রমাণের সুযোগ আমার নেই। আদালতই তা বিবেচনা করবেন। আমি কেবল আলোচনার সুযোগ নিয়েছি এ কারনে যে, এই আধুনিক বিশ্বে কম্পিউটার আমাদের সামনে এক অপার সম্ভাবনা এবং বিপদের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে এই বিপদের বোঝা যেমন শুধু বাড়বে, তেমনি এর সদ্ব্যবহারে আমরা লাভবান হবো বিপুলভাবে। আজকের দিনে এ কামনাই শুধু থাকবে- নাফিসরা যেন এই বিপদের বোঝা থেকে মুক্তি পায়!

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ইসলাম দ্রোহী ‘স্যাম বাসিল’-এর বিতর্কিত চলচিত্রের ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে প্রচারিত হওয়ার পর একটি লেখায় আমি সম্ভাব্য বিপদের দিকগুলো সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত করেছিলাম। কি আশ্চর্য, ফেইস বুকের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এ বিপদই একটি সম্ভাবনাময় তরুণের জীবনকে হয়তো আজ অনিশ্চিত করে ফেলেছে!

কম্পিউটারের পর্দায় অন্তরজালের আইকনে ক্লিক করে যেমন দেশ-বিদেশের নিত্য-নতুন পর্ণ থেকে বিশ্বের তাবত ধর্ম গ্রন্থে ঢুঁ মেরে আসা যায়, তেমনি তথাকথিত পাপ, অথবা পুণ্য কামানোর এমন সুবর্ণ সুযোগ আর কিসে আছে বলুন? আমার প্রতিবেশী এক পাকিস্তানী তাঁর সন্তানদের কোরান শিক্ষার জন্য বসিয়ে দেয় কম্পিউটারের সামনে। ওপর প্রান্তে পাকিস্তানে কম্পিউটারের সামনে বসে একজন ইমাম প্রতিদিন তালিম দিয়ে চলেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েক’শ পাকিস্তানী শিশুকে একই সঙ্গে। প্রতি কম্পিউটার বাবত মাসে ফি নিচ্ছেন মাত্র পাঁচ ডলার। অথচ এই শিক্ষার জন্য একজন আমেরিকান ইমামকে ঘরে ডেকে এনে তালিম দিতে বললে তাকে হয়তো মাসে চারদিনের জন্য দিতে হতো অন্তত এক’শ ডলার!

কম্পিউটারের ইউ টিউবে ‘খান একাডেমি’র কথাই ধরুন। বাঙালীর গর্ব তরুণ সালমান খানের বিশ্বখ্যাত অনলাইন টিউটরিয়েল ‘খান একাডেমি’র দর্শক সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২০ কোটির বেশি। আর শিক্ষা সহায়ক ভিডিও ক্লিপের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৩৫’শ-এর উপর। গণিত, পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা, ইতিহাস থেকে মানবিক-কলা শাখার সব বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের তালিম দিয়ে চলেছেন হার্ভার্ড-এমআইটি’র সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী এই বাংলাদেশী আমেরিকান। টাইমস-এর দৃষ্টিতে কেবল বিশ্বের প্রভাবশালী এক’শ জন তরুনের অন্যতমই নন, বিল গেটস-এর কাছ থেকে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের অনুদান নিয়ে সালমান এখন এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

সৃজনশীলতা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে! এই সৃজনশীলতার জন্য আর কিছু নয়, প্রয়োজন জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ‘ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ খুব সাধারন বিষয়কেও অসাধারণ করে তোলে। গত কুড়ি বছরে এই সৃজনশীলতার গুণে বিল গেটস, স্টীভ জবস থেকে শুরু করে সর্বশেষ এই সালমান খান আজ আমাদের এই নতুন পৃথিবীর দিক নির্দেশকে পরিণত হয়েছেন। এরাই পালটে দিয়েছেন মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। ফেইস বুক, টুইটারের একই সমুদ্রে অবগাহণে উন্মুখ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। এখানে এখন দূরত্ব কোন বাঁধা নয়। রাষ্ট্রীয় সীমারেখাও কোন বাঁধা মানে না। কে কোন ধর্মের, কিংবা বর্ণের, জাতি, কিংবা গোষ্ঠীর, এসব প্রশ্ন আজ ভীষণ অবান্তর! এক বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে আমরা ধাবিত হচ্ছি। জ্ঞানবিজ্ঞানই যার পথিকৃৎ। অন্য কিছু নয়!

চাই মানবিক সংস্কৃতির বিকাশ
পৃথিবীর সব মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে, পৃথিবীর সব মৃত্তিকাকে মাতৃভূমিসম বিবেচনার মধ্যেই আছে বিশ্ব মৈত্রীর নতুন সোপান। জাতিধর্ম নির্বিশেষ মানুষের জয়গান যেন হয় আমাদের প্রতীতি। আজ থেকে শত বছর আগে লেখা কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘মানুষ জাতি’ কবিতার পংক্তি উদ্ধৃত করে শেষ করছি আজকের এ লেখা-

জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত
একই রবি শশী মোদের সাথী।
শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা
সবাই আমরা সমান বুঝি,
কচি কাঁচাগুলি ডাঁটো করে তুলি
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো,
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙ্গা,
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।
বাহিরের ছোপ আঁচড়ে সে লোপ
ভিতরের রং পলকে ফোটে,
বামুন, শূদ্র, বৃহৎ, ক্ষুদ্র
কৃত্রিম ভেদ ধুলায় লোটে।…
বংশে বংশে নাহিক তফাত
বনেদি কে আর গর্-বনেদি,
দুনিয়ার সাথে গাঁথা বুনিয়াদ্
দুনিয়া সবারি জনম-বেদী।

নিউইয়র্ক, ২৬ অক্টোবর ২০১২