ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

মুভি ২০১২ যারা উপভোগ করেছেন, তারা হয়তো প্রস্তুত হয়েই হারিক্যান সিন্ডি’র তাণ্ডব দেখছেন। আমিও তাদের মধ্যে একজন। মুভিটিতে দেখানো হয়েছিল, কিভাবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। পটভূমি যুক্তরাস্ট্র। শুরু ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত গাইজার থেকে। এবং সুনামি-ভূমিকম্প-বন্যায় তছনছ হয়ে যায় পুরো যুক্তরাস্ট্র। বাদবাকি বিশ্বের অবস্থা তথৈবচ। একমাত্র ধনকুবেররা আশ্রয় নেয় বিশালাকায় জাহাজে। সেই জাহাজ সুনামীর ধাক্কায় পৌঁছে যায় এভারেস্ট পর্বতে। কিছু সুবিধাভোগী মানুষ বেঁচে যায়। কিন্তু কোটি-কোটি মানুষের জীবন হয় বিপন্ন।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তারা তাদের জীবতকালে এমন ভয়ঙ্কর হ্যারিকেনের মুখোমুখি হননি। কারন সেন্ডির পিছু পিছু আরেকটি হ্যারিকেন ধেয়ে আসছে। একই সঙ্গে পূর্ণিমা’র কারনে সমুদ্রের বুক ফুলে ফেঁপে উঠেছে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি’র কোথাও কোথাও দশ-বারো ফুট উচ্চতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে।

আমার কথাই বলি। দু’দিন আগে থেকেই হ্যারিকেনের সংবাদ দেখছিলাম টিভি চ্যানেলগুলোতে। কাজেই মানসিকভাবে প্রস্তুত। কাল বিকেলে রেডিওতে জেনেছিলাম আজ স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাজেই সকালে তেমন কোন তাড়া নেই। গত তিন-চার দিনের মতো আজো আকাশ মেঘলা ছিল। সামান্য ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি কখনো। সকালে টেলিফোন করে জেনে নিয়েছি রেস্টুরেন্ট খোলা হয়েছে যথারীতি। সামনে পেছনে লোক আছে। লোকজন আসছে, তবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। দুপুর বারোটার পর একেবারেই নীরব। কোন ক্রেতা নেই। রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে, মনে হচ্ছে এদের সবার বাড়ি যাবার তাড়া। মুদি এবং কাঁচা মালের দোকান প্রায় খালি হয়ে গেছে। পাউরুটি, বোতল পানি, ব্যাটারি, মোমবাতির তাকগুলো ফাঁকা। হোম ডিপো, সিয়ারস, ল’স-এর মতো বড়-বড় হার্ড ওয়্যারের দোকানে কোন অবিক্রীত জেনারেটর নেই।

বেলা দু’টায় রেস্টুরেন্টের শিফট পরিবর্তন হয়। যারা দূর থেকে এই বিপদের দিনে গাড়ি চালিয়ে কাজে এসেছে, তাদের কথা বিবেচনা করে বিকেল চারটা পর্যন্ত রেস্টুরেন্ট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্তত তারা যেন দু’ঘন্টার পয়সায় পেট্রোলের খরচ পুষিয়ে নিতে পারে, যদিও কোন কাস্টমার নেই।

বিকেলে ঘরে ফেরার সময়ও কিছুটা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হলো বাতাসের ঝাপটা। কালও থাকবে। আগামী পরশু বুধবার নাগাদ বাতাস কিছুটা স্তিতু হবে। আমার বাড়িতে এখনো বিদ্যুৎ আছে। কেবল মাঝে মাঝে ট্রিপ হচ্ছে। বাইরে প্রায় ১০০-১২০ কিলোমিটার বাতাসের শন-শন আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। বাড়িটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সাধারণত বাইরের কোন আওয়াজ শোনা যায় না। কিন্তু দৈত্যাকৃতির বৃক্ষগুলোকেও যখন চোখের সামনে দুলিয়ে চলেছে, তখন এই ‘সেন্ডি’কে কেবল একজন নিহত আমেরিকান মহিলা সৈনিকের নাম বলে ভাবা যায় না!

বিকেলে স্কুলের প্রিন্সিপাল অটোমেটেড টেলিফোন কলে জানিয়ে দিয়েছেন আগামী কালও স্কুল বন্ধ। আমাদের এই এলাকাটি সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় ৭০ মাইল উজানে। তবে আমাদের পাহাড়ি ‘হাডসন নদী’টি চলে গেছে নিউইয়র্ক মহানগরীর ম্যানহাটনের কূল ঘেঁষে আটলান্টিকে। কাজেই নদীটির পানি বেড়ে গেছে ৫-৬ ফুট। ডাউন টাউন ম্যানহাটনের লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেন্ডি আমেরিকায় আঘাত হানার আগে হাইতি, জ্যামাকাইয়ায় ইতোমধ্যে ৭০ জন নিহত হয়েছে।

হ্যারিকেনের অভিজ্ঞতা

যুক্তরাস্ট্রের ইতিহাসে বিধ্বংসী হ্যারিকেনগুলোর দ্বিতীয়টি হ্যারিকেন ক্যাটরিনা আঘাত হেনেছিল লুসিয়ানায় ২০০৫ সালে। সে সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল কয়েক’শ কোটি ডলার। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এ সময়কালে ভীষণ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন হ্যারিকেন অব্যবস্থাপনার কারনে। হ্যারিকেন ক্যাট্রিনার স্থান দ্বিতীয় হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল কয়েক বছর। ক্যাটরিনা ছিল ক্যাটাগরি দুই, কিন্তু সেন্ডি’র ক্যাটাগরি এক। ইতোমধ্যে নিউ জার্সিতে দুই জন মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে গাছের ডাল ভেঙ্গে। ম্যানহাটনের নীচু এলাকা তের ফুট পানির নীচে। সাড়ে তেরো লাখ লোক বিদ্যুৎহীন।

হ্যারিকেন সেন্ডি’র এগারোটি বিপদসঙ্কেত

১। আবহাওয়ার পরিবর্তন জনিত (ক্লাইমেট চেঞ্জ) কারনে সেন্ডি’র আঘাত তীব্র।

২। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এযাবত যুক্তরাস্ট্রের ইতিহাসে সেন্ডি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।

৩। হ্যারিকেন আঘাতের ১২ ঘন্টা আগেই ম্যানহাটনের নীচু ব্যাটারি পার্ক এলাকা প্লাবিত হয়ে গেছে। রাত আটটায় ভূমিতে ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে পানির উচ্চতা বাড়বে।

৪। নিউইয়র্ক নগরীর গৃহহীন (হোমলেস) লোকদের ভোগান্তি চরমে।

৫। রিকার আইল্যান্ডের কারাগারের কয়েদিরা আছে বিপদে। তাদেরকে সরিয়ে নেয়ার কোন পরিকল্পনা নেই নগর প্রশাসনের।

৬। হ্যারিকেনের প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, তাঁর কাছে এখন মানুষের জান মালের নিরাপত্তাই প্রধান। ওবামা এবং রমনি শিবির ইতোমধ্যে অন্তত কুড়িটি প্রচারণা সভার আয়োজন বাতিল অথবা সময় পরিবর্তন করেছেন।

৭। এখনো নিউজার্সিতে মাত্র দুই জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে মৃতের সংখ্যা যে বাড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। হাইতিতে ইতোমধ্যে ৫১ এবং জামাইকায়ও ডজন খানেক মৃত্যুর খবর এসেছে।

৮। ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে রমনি শিবিরের ভীন্ন অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে। রমনি শিবির যেখানে ফেডারেল বাজেট কমাতে চায়, তাতে এ ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কেন্দ্রের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কোন ক্ষমতা থাকবে না। অবশ্য ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিপর্যস্ত রাজ্যের গভর্নরদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছেন। বলেছেন, যে কোন দুর্যোগে ওয়াশিংটন তাদের পাশে আছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, তিনি হোয়াইট হাউজে রাত জেগে অপেক্ষা করবেন, গভর্নরদের টেলিফোনের। যাতে তিনি জানতে পারেন সর্বশেষ পরিস্থিতি। রিপাবলিকান হলেও নিউ জার্সির গভর্নর ক্রিস্টি এতে বেজায় খুশি। টেলিভিশনের পর্দায় গদ-গদ হয়ে তিনি বলছেন- ‘এমন নেতৃত্বই আমাদের প্রয়োজন। এই গভর্নর একসময় রমনি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবার বেশ গুঞ্জন ছিল। যাই হউক, ওবামা বেশ কাজে লাগিয়ে ফেলেছেন হ্যারিকেন সেন্ডি’র বিপদ।

৯। সিবিএস নিউজ বলেছে, সেন্ডি’র কারনে কমকরে এক’শ কোটি ডলারের ক্ষতি হবে।তবে অন্যান্য অর্থনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- দুই দিনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে অন্তত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি ডলার। তবে গত সপ্তায় খুচরা বাজারে হ্যালোউইনের (চকলেট কুড়োনোর উৎসব) কেনাকাটা হয়েছে রেকর্ড পরিমান।

১০। সোমবার দূপুরে চাঁদ পূর্ণতা পায়। এরফলে জোয়ারের উচ্চতা বেড়েছে অন্তত ২০ ভাগ।

১১। প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় সংগঠনগুলোর গোঁড়ামি অব্যাহত আছে। তারা বলছে, প্রেসিডেন্ট ওবামার গে-লেসবিয়ান সংক্রান্ত নীতির কারনেই নাকি এ হ্যারিকেন এসেছে। হাফিংটন পোস্টে গে-লেসবিয়ান বিরোধী এক খ্রীস্টান পাদ্রী জন ম্যাকটারনন এ ব্যাপারে তাঁর খোলাখুলি ‘ব্লগ’ লেখেছেন। অবশ্য মতের বিরুদ্ধে গেলেই পাদ্রীদের এসব আজগুবি সংযোগ ঘটানোর রীতি নতুন নয়।

নিউইয়র্ক, ২৯ অক্টোবর ২০১২, রাত এগারো’টা