ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

সম্প্রতি একটি পিজ্জা'র দোকানে ওবামা।

আমেরিকার ৫৭ তম প্রেসিডেন্সিয়্যাল নির্বাচনের আর বাকি মাত্র তিন দিন। ১৭৮৯ সালে প্রথম নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতি চার বছর অন্তর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবং ১৭৯২ থেকে শুরু হয়ে গত ২২০ বছরের ইতিহাসে প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোন নির্বাচন কোন অজুহাতে বাদ পড়েনি। এটি একটি অপ্রত্যক্ষ নির্বাচন হলেও দেশটির গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ নির্মিত হয়েছে এ নির্বাচনের মাধ্যমেই।

বর্তমান যুক্তরাস্ট্রে কেবল কংগ্রেস কিংবা সিনেট সদস্য নয়, স্থানীয় স্কুল বোর্ডের বাজেট থেকে শুরু করে স্থানীয় পুলিশ প্রধান (শেরিফ), স্থানীয় বিচারক, মেয়র, টাউন ক্লার্ক সহ সব স্থানীয় সংস্থার প্রধান নির্বাচন প্রত্যক্ষ ভোটাভুটিতে সম্পন্ন হয়। এছাড়া শহরে যে কোন বিনিয়োগ অথবা স্থাপনার আগে পাবলিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয় জনগণের আপত্তি শোনার জন্য। শহরে ‘স্কুল ট্যাক্স’ অথবা প্রপার্টি ট্যাক্সের পরিমান নির্ধারণের জন্য প্রতি বছর পাবলিক শুনানি হয়, এবং ট্যাক্সের পরিমাণও নিরধারিত হয় ভোটাভুটিতে। এগুলো এখন নিয়ম মাফিক ঘটনায় পরিণত। কেউ এর ব্যতিক্রম চিন্তাও করতে পারে না।

প্রেসিডেন্সিয়্যাল নির্বাচনে আমেরিকার জনগণ মূলত “ইলেকটোরাল কলেজ” (প্রতিনিধি পরিষদ- কংগ্রেস) নির্বাচন করেন। কংগ্রেসের ৫৩৮ জন প্রতিনিধির ভোটে নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট। এ হিসেবে পপুলার ভোটেই প্রধানত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যদিও সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০০০ সালে আল গোরের সঙ্গে পপুলার ভোটে হেরেও জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন কেবল প্রতিনিধির সংখ্যা বেশি হওয়ায়। সেটাও সামান্য ব্যবধানে, মাত্র ৫ জন প্রতিনিধি বেশি পাওয়ার কারনে (২৭১-বুশ, ২৬৬-আল গোর)। তবে যুক্তরাস্ট্রের প্রেসিডন্সিয়্যাল নির্বাচন, একটি অপ্রত্যক্ষ নির্বাচনই। মানুষ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরিকল্পনা এবং কর্মসূচির নিরিখে তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের ভোট দেন।

আমার দেখা নির্বাচন

আমার প্রত্যক্ষ দেখা এটি আমেরিকার তৃতীয় নির্বাচন। প্রথমটি ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বিতীয় মেয়াদের, এবং ওবামা’র প্রথম মেয়াদের। উপরোক্ত কোনটিতেই ভোট দেয়ার সুযোগ হয়নি, নাগরিকত্ব পাইনি বলে। ২০০১-এর সেপ্টেম্বরের শেষে এ দেশে পা রাখার পর এতদিন আমি ছিলাম কেবল আমেরিকান রাজনীতির দর্শক এবং সমালোচক। কখনো আমেরিকার বিদেশ নীতির কড়া সমালোচনা করেছি। লেখায় এবং মন্তব্যে। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবো সেটা কখনো ভাবিনি। নাগরিকত্ব লাভের পর ভোটার তালিকায় নাম উঠিয়েছি। কিন্তু পার্টি অনুমোদন (এফিলিয়েশন)-এর জায়গাটি ফাঁকা রেখেই ভোটার ফরম পূরণ করেছি। অথচ কাল রাতে প্রথম ডেমোক্রেটিক শিবির থেকে পাওয়া ফোন কলে আমি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি- হ্যাঁ আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে রাজি আছি।

ডেমোক্রেটিক শিবির থেকে কলটি ছিল- ‘আমি সেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা’র পক্ষে কাজ করতে রাজি কি-না’? রাজি হয়ে গেলাম। মাত্র তিন ঘন্টার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট আগামী কাল শনিবার সন্ধ্যায়। একটি পাচতারা হোটেলের কনফারেন্স কক্ষে বসে ভোটারদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করা। আমার ধারনা রাজ্য সিনেটে আমাদের এলাকার ডেমো প্রার্থী টেরি গিবসন আমার নামটি সেচ্ছাসেবকের তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তার নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একবার আমার নাম ও টেলিফোন নাম্বার তার নোটবুকে তুলে রেখেছিলেন কোন একটি ঘরোয়া সামাজিক অনুষ্ঠানে। যাই হউক, বিষয়টি আমার জন্য উপভোগের। তাকে সাহায্য করা, আর বারাক ওবামাকে সাহায্য করা একই কথা, এবং এটা আমার নাগরিক দায়িত্ব বলেই মনে করি।
গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় কি করে আমি ডেমোক্রেটের একজন সমর্থকে পরিণত হলাম সে বিষয়ে আমার প্রত্যক্ষ কিছু অভিজ্ঞতা আজ পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করবো। আমি এই যুক্তরাস্ট্রে দ্বিতীয়বার সপরিবারে বেড়াতে এসে কি করে এখানে প্রায় স্থায়ী ঠিকানা করে নিলাম সে সম্পর্কে আগে আমি একটি পোস্ট লেখেছি। আমার জীবন সংগ্রামের এই তৃতীয় পর্বে কি করে আমার স্ত্রী এবং সন্তানরাও আমার সঙ্গে নিজেদের ভাগ্য জড়িয়ে নিয়েছে তাও উল্লেখ করেছি আগের কয়েকটি লেখায়।

একজন অনুসন্ধিৎসু মানুষ হিসেবে, বিপরীত স্রোতে জীবন তরী ভাসিয়ে নিয়ে চলার প্রত্যক্ষ সংগ্রামে পৃথিবীর সব মানুষ আমার কাছে ‘কেবল মানুষ’। মানুষকে কেবল তার বাইরেরটা দেখে বিচার করি না বলে জীবনে ‘মানুষ সম্পর্কে’ আমার কোন নেতিবাচক ধারনা নেই। পরিস্থিতি মানুষকে জন্ম দেয়, পরিবেশ মানুষকে গড়ে তোলে। এ জন্যই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে আমি দ্বিতীয়বার চিন্তা করি। নিজের সম্পর্কে কথাগুলো বললাম এ কারনে যে, আমার এ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে মাত্র এক দশকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকলেও আমেরিকার সাধারন মানুষকে আমি দেখেছি তাদের আত্মার আত্মীয় হয়ে। তাদের সুখ-দুখের সঙ্গী হয়ে।

কাকতালীয় ভাবে আমার অবস্থানকালীন গত একদশক আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সুখের এবং সঙ্কটের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উলম্ফনের সুখ যেমন সমাজ জীবনকে পূর্ণ করেছে কানায়-কানায়, তেমনি নাইন-ইলিভেন পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্দশাও আজ নিয়তি। দেশের রাজনীতি এবং সমাজে এক গভীর ক্ষত চিহ্ন নিয়ে দেশটি আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চাচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের অবস্থান নিরঙ্কুশ রাখার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আজ সমোপস্থিত ২০১২ সালের ৬ নভেম্বরের নির্বাচন।

আমার দেখা আমেরিকার অর্থনীতি

২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি যুক্তরাস্ট্রে আসি। আর ২০০২’এর মে মাসে যখন নিউইয়র্ক নগরীর ব্রঙ্কস থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে হাডসন ভ্যালিতে চাকরি নিয়ে আসি আইবিএম-এ। তখন প্রায় দশ হাজার লোক আইবিএম-এ কাজ করতো আমাদের পুকেপ্সি শহরে। প্রতি দশ জনের চার জন ছিল আইবিএম-এর। রিয়েল এস্টেট সহ স্থানীয় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল জমজমাট। গড়ে প্রতিটি মানুষের বেতন বছরে ৩০ থেকে ৬০ হাজার ডলার। প্রতিটি পরিবারের দুই-তিনটি গাড়ি। মানুষের বাড়ি-ঘর কেনার ধূম। প্রায় প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত দু’বার ভ্যাকেশনে যাচ্ছে দূর দূরান্তে। নূন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা নেই কারো। আইবিএম-এর সহযোগী আরো বেশ কিছু খুচরো ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশের কারখানাও ছিল এ শহরে।

এই রমরমা অবস্থাতেই ২০০৫ সালে শোনা গেল ‘লিনোভো’ নাম নিয়ে আইবিএম-এর পুরো প্লান্ট চলে যাচ্ছে চীনে। তাই হলো ২০০৭ সালের মধ্যে। প্রেসিডেন্ট বুশ এই অফ শোরে প্রযুক্তি স্থানান্তরের আইনী প্রক্রিয়ায় সই করেছেন। যে আইবিএম ছিল প্রায় শতাব্দী ধরে আমেরিকার ‘আইকন’, সেটি এখন চীনের মাটিতে স্থানান্তরিত হয়ে বিক্রির জন্য আসবে আমেরিকা এবং বহির্বিশ্বের বাজারে। এতে কোম্পানির লাভ বাড়বে সন্দেহ নেই, এমনকি কম্পিউটারের দামও কমবে অবিশ্বাস্য রকমে। কিন্তু বারোটা বাজবে আমেরিকান চাকরিজীবীদের। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে এ বিষয়গুলো আমি ভেবেছিলাম আইবিএম-এর পার্কিং লটে গাড়ির মধ্যে বসে। ‘মেইড ইন চীনা’ লেখা কম্পিউটারও এসে গেল ২০০৮ সালের মধ্যে।

আমার ভাবনার আরো একটি যুক্তিসঙ্গত কারন ছিল। ২০০৫-এর ডিসেম্বরে আমার চাকরির একটি পদোন্নতি ঘটে। পদোন্নতির সুবাদে কর্তৃপক্ষ আমাকে পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্নিয়ায় পাঠায় প্রশিক্ষনের জন্য। প্রায় ১৬ ঘন্টার বিমান ভ্রমণ শেষে, সানহোজে বিমান বন্দরে আগে থেকে প্রস্তুত গাড়ি ড্রাইভ করে একটি পাঁচ তারা হোটেলে যাই সাত দিনের জন্য। আমি হিসেব করে দেখেছি এ প্রশিক্ষনের জন্য কর্তৃপক্ষ আমার পেছনে অন্তত ৭ হাজার ডলার খরচ করেছে। অথচ প্রশিক্ষণটি নিউইয়র্কেই হতে পারতো। তাতে অর্থ এবং সময় দুই-ই বাঁচত। শুধু তাই নয়, আমি কাজে যোগদানের পর প্রায় মাস খানেক সময় ধরে আরেকজন প্রশিক্ষক এসেছিলেন টেক্সাস থেকে। তিনি প্রতি সপ্তাহে বিমানে ৬-৭ ঘন্টার ভ্রমনে আসতেন, আবার ফেরত যেতেন। তখনই আমি আন্দাজ করেছি- এতো খরচের বোঝা বহন করার শক্তি ‘এই অর্থনীতির’ থাকবে না। যুক্তরাস্ট্রের উন্নত মানের প্রযুক্তি আছে ঠিকই, কিন্তু সে প্রযুক্তির ব্যয় ভারও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক বেশি। এখানেই অর্থনীতির হিসাব মেলে না।

যা হবার তাই হলো। ২০০৮ সালের মে মাসে শত-শত কর্মচারীর মতো আমিও ছাঁটাই। কর্তৃপক্ষ দুই বছরের বেকার ভাতা নির্ধারণ করলো। স্ত্রীর আয়সহ এই বেকার ভাতায় সংসার চলে যায় ভালো ভাবেই। কিন্তু বেকার থাকতে ভাল লাগে না। খুঁজতে থাকি ব্যবসা। প্রায় চার মাসের খোঁজাখুঁজিতে একটি ব্যবসা পেলাম- গ্যাস স্টেশন। সোজা বাংলায় রকমারি পণ্যের দোকানসহ পেট্রোল পাম্প। বাড়ি বন্ধকের টাকা উঠিয়ে শুরু করলাম ব্যবসাটি।

সারাদিন পড়ে থেকে এই গ্যাস স্টেশনের ব্যবসা আমার ভালো লাগে না মোটেও। কিন্তু উপায় নেই। ২০১০ সালের ২২ জুন সন্ধ্যায় একদিন আচমকা ডাকাত দল এলো। আমি একা ছিলাম। মুখোশ পরা দু’টি ডাকাত মাথা বরাবর শর্ট গান ধরে ক্যাশ রেজিস্ট্রারে যা আছে, সব দিয়ে দিতে বললো। আমি পুরো ক্যাশ (প্রায় চারশো ডলার) খালি করে দিলাম। ওরা টাকা নিয়ে চলে গেল জঙ্গলের দিকে। আমি পুলিশ ডাকলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ চলে এলো। হেলিকপ্টারে সার্চ লাইট জ্বালিয়ে প্রায় ঘন্টা খানেক জঙ্গলের ভেতর অনুসন্ধান করলো। কুকুর নিয়ে ঢুকে গেল জঙ্গলের ভেতর। সন্ধান পেল ওদের মুখোশের। জঙ্গলে মুখোশ ছেড়ে অন্য পথে পালিয়ে গেছে তরুণ অপরাধীরা।

আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম প্রায় আধাঘন্টা আগে এরাই এসেছিল সিগারেট কেনার জন্য। কিন্তু ১৮ বছরের কম হওয়ার কারনে আমি তাদের কাছে সিগারেট বিক্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু এটা আমার কেবল ধারণা। পরদিন সকালে এসে দোকানের ভেতরের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে গেল পুলিশ। এক সপ্তাহের মধ্যে চারটি ডাকাতের সব ক’টি গ্রেফতার হলো। বিচার সম্পন্নের পর আমি হারানো টাকাও ধীরে ধীরে ফেরত পেলাম কিস্তিতে।

করিৎকর্মা পুলিশকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানালাম। কিন্তু ব্যবসার প্রতি বিরক্তি আমার বেড়ে গেল। প্রথমত শুরুর রমরমা ব্যবসা আর নেই, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তার হুমকি। লক্ষ্য করলাম- আমার নিয়মিত খদ্দেরের অন্তত ৫০ ভাগ আর আসে না। বুঝতে বাকি রইল না- এরাও হয়তো আমার মতো ছাঁটাই-এর পাল্লায় পড়েছে। ২০১১-এর ডিসেম্বরে ব্যবসাটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেই। তার ছয় মাস আগে অবশ্য আমি একজন অংশীদার নিয়ে একটি ‘আমেরিকান ডাইনার’ ব্যবসা শুরু করি। বলে রাখি- ডাকাতির ঘটনার পর স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে আমি একটি ভাল চাকরি অবশ্য পেয়েছিলাম আলবেনীর স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘ন্যানো টেক’ গবেষণায়। কিন্তু আমার বাসা থেকে এটি অন্তত দুই’শ কিলোমিটার দূরত্বের হওয়ায় সে চাকরিতে আমি যোগ দেইনি। ফলে ব্যবসাকেই বেছে নিলাম জীবন নির্বাহের উপায় হিসেবে। কিন্তু তাই বলে মধ্যবিত্ত জীবনে এখনো নূন আনতে পান্তা ফুরোয়। এর কারন একটাই- ম্রিয়মান অর্থনীতি!

খ্রিস্টান মৌলবাদীরা এ ছবি প্রদর্শন করে বলে যে, ওবামা মুসলমান

কেমন আছেন আমেরিকার মধ্যবিত্তরা?
আমেরিকার মধ্যবিত্তদের নিয়ে পিউ রিসার্চের (Pew Research)-এর একটি গবেষণায় বেড়িয়ে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। তারা বলছে ২০০১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়কাল হলো মধ্যবিত্তের নিম্নগামীতার ইতিহাস। অবশ্য মধ্যবিত্তের নিম্নগতি এখনো অব্যাহত আছে। মধ্যবর্তী বাড়ির আয় নেমে গেছে প্রায় অর্ধেকে। শতকরা ৮৫ ভাগ বলেছে জীবন-যাপনের ব্যয়ভার মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ মধ্যবর্তী আয়ের মানুষ তাদের এই নিম্নগামীতার জন্য দায়ী করেছে “রাজনীতিকে” (অর্থাৎ কংগ্রেস’কে)। একই সঙ্গে ব্যাঙ্ক এবং ফাইনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। উপরের দিকে এক শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে- ৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার থেকে ৫ লাখ ৭৫ হাজারে। কিন্তু নিঃস্ব মানুষের আয় সাড়ে আঠারো হাজার থেকে নেমে দাড়িয়েছে ১০ হাজারে।

আসন্ন প্রেসিডেন্সিয়্যাল নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনেও আমেরিকার জনগণ রয়েছে দুই মেরুতে। ৫২ শতাংশ মধ্যবিত্ত মনে করে ওবামা’র নীতি মধ্যবিত্তের পক্ষে। ওপর দিকে ৭১ শতাংশ সম্পদশালী মনে করে মিট রমনী তাদের স্বার্থের পক্ষে। মাত্র ৩৮ শতাংশ সম্পদশালী ওবামার সমর্থক। ২০০৭-এর ডিসেম্বরে শুরু হওয়া মন্দার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো ৫৫ শতাংশ মধ্যবিত্ত। অন্তত এক তৃতীয়াংশের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।

যুক্তরাস্ট্রের অর্থনীতির এ পরিণতির জন্য বারাক ওবামা প্রধানত দায়ী করেছেন প্রেসিডেন্ট বুশ, এবং তার অনুসৃত নীতিকে। ধনীদের পক্ষে দাঁড়ানো, তাদের ট্যাক্স মকুফ করাসহ অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ বাঁধানোর সরাসরি সমালোচনা করেছেন ওবামা। তার মতে এই যুদ্ধের কারনেই যুক্তরাস্ট্রের অর্থনীতি আজ এতোটা বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, প্রেসিডেন্ট বুশ একজন উদারনীতিক হওয়া সত্ত্বেও অতি রক্ষণশীল ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামস্ফেল্ড প্রভৃতির ক্ষপ্পরে পড়ে যুদ্ধবাজ হয়েছিলেন। আমেরিকার প্রচার মাধ্যমে এ তথ্যগুলোই উচ্চারিত হচ্ছে গত কয়েক বছর। এ যুদ্ধ থেকে বারাক ওবামা বেড়িয়ে আসছেন, এটাই শুভ দিক। এ পথ ধরেই হয়তো বিশ্ব শান্তির পাশাপাশি আমেরিকার অর্থনীতিও আলোর মুখ দেখবে।

নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় আমেরিকান এশিয়ানরা?

যুক্তরাস্ট্র এখনো বিশ্বের অনেক সম্ভাবনার সূচক। মুক্ত জীবনের অঙ্গীকার এবং সামাজিক ন্যায় বিচারে যে পশ্চাদপদ জাতিগোষ্ঠীও বেড়ে উঠতে পারে তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ আমেরিকার এশিয়ানরা। গত ১৯ জুন পিউ রিসার্চের একটি গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে এশিয়ানদের এ অঙ্গীকার। গবেষণা বলছে- এই অর্থনীতির দুর্যোগেও এশিয়ান আমেরিকানরা আমেরিকার সর্বাধিক আয় এবং সর্বোচ্চ শিক্ষার অধিকারী। জীবন-যাপনে সাধারণ আমেরিকানের চেয়ে তারা বেশি পরিতৃপ্ত।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা, বিবাহ, অভিভাবকত্ব, কর্মনিষ্ঠা এবং ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে তারা অগ্রগামী। অথচ শতাব্দি আগেও এই এশিয়ানরা ছিল সবচেয়ে কম দক্ষতার, সর্বাধিক কম মজুরির শ্রমিক। শুধু তাই নয়, নিজেদের জাতি-গন্ডি ছাপিয়ে এশিয়ানদের বিয়ে হচ্ছে অন্যান্য ধর্ম এবং জাতি গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে! সম্প্রতি ফেইসবুকের জনক জুখারবার্গের সঙ্গে প্রিসিলা চ্যান-এর বিবাহ মনে করিয়ে দিয়েছে ৩৭ শতাংশ এশিয়ান-আমেরিকান এখন নিজেদের জাতিগোষ্ঠীর বাইরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। আমেরিকার ৭৪ শতাংশ এশিয়ানের জন্ম নিজ দেশে। ঘরে তারা মাতৃ ভাষায় কথা বলে, বাইরে ইংরেজী।

অভিবাসনে এশিয়ানরা ছাড়িয়ে গেছে হিস্পানিকদেরও। ২০০০ সাল থেকে হিস্পানিকদের অভিবাসন যেখানে হয়েছে নিম্নগামী, এশিয়ানদের সেখানে উর্ধগামী। এবং ২০০৯ সালে এসে ছাড়িয়ে যায় হিস্পানিকদের। আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আগমণ ঘটছে এশিয়ানদের হাত ধরে। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ যেখানে ব্যাচেলর ডিগ্রীধারী, এশিয়দের মধ্যে এ হার ৪৯ ভাগ, সাদা ৩১ ভাগ, কালো ১৮ এবং হিস্পানিক ১৩ ভাগ। আমেরিকার মধ্যবর্তী আয় যেখানে ৪৯ হাজার ৮’শ ডলার, সেখানে এশিয়দের আয়ের পরিমাণ ৬৬ হাজার, সাদা’র আয় ৫৪ হাজার, হিসপানিক’এর ৪০ হাজার এবং কালো’র ৩৩ হাজার ৩’শ ডলার।

আমেরিকা সম্পর্কে এশিয়ানদের ভাবনা

এখন দেখা যাক আমেরিকা সম্পর্কে এশিয়ানরা কি ভাবছে। আমেরিকার সুযোগ সুবিধা নিজ দেশের চেয়ে বেশি মনে করে ৭৩ শতাংশ, একই রকম মনে করে ১৮ এবং মাত্র ৫ শতাংশ মনে করে নিজ দেশে সুযোগ সুবিধা বেশি। ৬৯ শতাংশ মনে করে আমেরিকায় রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ বেশি, ২৩ শতাংশ মনে করে নিজ দেশেও একই রকম ছিল, এবং মাত্র ৩ শতাংশ মনে করে নিজ দেশে স্বাধীনতা বেশি। গরিবের চিকিৎসা লাভের সুযোগ আমেরিকায় বেশি মনে করে ৬৪ শতাংশ, একইভাবে ৬২ শতাংশ মনে করে আমেরিকায় শিশুদের বড়ো করে তোলার সুযোগ বেশি। ৫২ শতাংশ মনে করে আমেরিকায় ধর্মীয় স্বাধীনতা বেশি, ৩৮ শতাংশ মনে করে একই রকম, এবং মাত্র ৭ শতাংশ মনে করে নিজ দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল বেশি। তবে পারিবারিক বন্ধনের বিষয়ে ৫৬ শতাংশ মনে করে নিজ দেশে এই বন্ধন ছিল বেশি। আমেরিকায় তা অবশিষ্ট আছে বলে মনে করে মাত্র ১৪ শতাংশ।

প্রেসিডেন্ট ওবামা’র সমালোচনা

১. রক্ষণশীল শিবির থেকে বারাক ওবামা’র সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো- তিনি যুক্তরাস্ট্রের ঋণের বোঝা বাড়িয়েছেন। ক্ষমতা নেয়ার সময় যখন ঋণের বোঝা ছিল ১০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন, গত চার বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ ট্রিলিয়নে। রিপাবলিকানদের মতে এর বড় একটি কারন ‘ওবামা কেয়ার’ অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নীতি। প্রতি বছরে এই নীতি বাজেটে প্রায় সাড়ে সাত’শ বিলিয়ন খরচের বোঝা চাপিয়েছে। প্রেসিডেন্ট এ সমালোচনার জবাবে বলেছেন- স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। কাজেই এ খাতে খরচ করতেই হবে। তার মতে প্রেসিডেন্ট বুশ ধনীদের জন্য যে ট্রিলিয়ন ডলারের ট্যাক্স মকুফ করেছিলেন, সে কারনেই ঋণের বোঝা বেড়েছে। এর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের খরচ তো আছেই। এ কারনে ওবামা ধনীদের ট্যাক্স বাড়ানোর ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। পাশাপাশি ইরাক-এর মতো আফগানিস্তান থেকেও তিনি আগামী দুই বছরের মধ্যে সব সৈন্য সরিয়ে আনবেন।

২. সমালোচকেরা বলছেন- ওবামা অর্থনীতি ঠিক করার জন্য শত-শত কোটি ডলার ব্যয় করেছেন “স্টিমুলাস প্যাকেজ”-এর নামে। এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং ঋণের বোঝা বেড়েছে। ওবামা এর উত্তরে বলছেন, মোটর কারখানাগুলোকে তিনি টাকা না দিলে সেগুলো পথে বসতো। হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হতো। অর্থনীতির উপর বিপদের বোঝা আরো বাড়তো। সত্যিকার অর্থে ওবামা’র ঋণ সহায়তার ফলে মিশিগানের মোটর কারখানাগুলো লাভের মুখ দেখেছে, এবং কোন শ্রমিকও ছাঁটাই হয়নি।

৩. ওবামা’র বিরুদ্ধে এরা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনছেন যে, ক্ষমতারোহনের পর তিনি একটি বারের জন্য ইসরাইল যাননি। এমনকি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউজে সাক্ষাতের সুযোগও দেননি। কিন্তু “এপোলজি ট্যুর”-এর নামে তিনি সাবেক ওটমান এম্পায়ার তুরস্ক এবং সৌদি আরব গেছেন। সেখানে যুক্তরাস্ট্রের নীতির ব্যাপারে নতজানু অবস্থান নিয়েছেন। আমেরিকান এরোস্পেস প্রশাসন (নাসা)কে পরামর্শ দিয়েছেন মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর। রক্ষণশীলরা ‘বারাক হুসেইন ওবামা’ নাম উচ্চারণ করে বলছেন- তিনি আসলে মুসলিম। এ কারনেই মুসলামানদের প্রতি তার এতো দরদ! একই কারনে তারা ওবামা’র কেনিয় পিতৃ পরিচয়কেও দায়ী করছেন। বলছেন, আমেরিকা আর আমেরিকানের হাতে নেই!

কেনিয়ায় দাদীর সঙ্গে তরুণ ওবামা

শেষ কথা

আমার বিবেচনায় ওবামা বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বের একজন উপযুক্ত নেতা। যিনি আশা করেন- বিশ্ব একদিন যুদ্ধ, বিগ্রহ এবং দারিদ্রমুক্ত হবে। যিনি বিশ্বাস করেন- জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের এই বিশ্বটি ক্রমেই একীভূত হয়ে যাচ্ছে। একই আলো-হাওয়ায় এই সবুজ পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যের উপর। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ভেদ করে নতুন পৃথিবী একদিন জেগে উঠবেই। আর সে সমাজও অবশ্যম্ভাবী রূপে আত্ম প্রকাশ করবে এই আমেরিকাতেই। কারন যুগ-যুগের কালো অধ্যায় অতিক্রম করে যুক্তরাস্ট্র প্রমাণ করেছে- এটি একটি সচল সমাজ। মানুষের আশা-আকাংখার পথ ধরেই এখানে যেমন স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তেমনি রচিত হয়েছে ‘সিভিল রাইটস’ মুভমেন্ট। এখানকার মানুষ যেমন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করেন, তেমনি এখানকার মানুষই সারা দুনিয়াকে পথ দেখাতে পারে স্বাধীনতা ও মৈত্রীর। একজন দরিদ্র মাতার সন্তান ওবামা তাই তরুণ প্রজন্মের কাছে এখনো আলোর দিশারী।

আরেকটি কথা, আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম কালো বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট অকারনে নাজেল হননি। আমেরিকাবাসী একটি নতুন বিশ্বের আগমণ ধ্বনি শুনতে পেয়েছে বলেই সময়ের বাস্তবতায় বরণ করে নিয়েছে ওবামাকে। মানুষের সঙ্গে কৌশলে আলাপ করে জেনেছি- এ দেশের সাদা-কালো-পীত সংখ্যা গরিষ্ঠ গরীব মানুষ ওবামাকে কতটা ভালবাসে। এক সাদা স্কুল শিক্ষিকা কিছুদিন আগে একটি ব্লগে লিখেছে- কিভাবে লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত মৃত্যুপথ যাত্রী চার বছরের একটি শিশু তথাকথিত “ওবামা কেয়ারের” বদৌলতে জীবন ফিরে পেয়েছে! যে শিশুটি এই শিক্ষিকার কাছে বলেছিল- “আই হেইট মাই লাইফ”। আমি আশাবাদী ওবামা’র নিষ্ঠা ও কর্মে বিশ্বের কোটি কোটি পশ্চাদপদ মানুষ নতুন জীবনের সন্ধান পাবে!!

নিউইয়র্ক, ২ নভেম্বর ২০১২