ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সেদিন সুন্দর একটা টি সার্ট (গেঞ্জি) পরে কাজে এলাম। আমার সহকর্মী ভ্যালেরি ম্যাককর্ড মন্তব্য করলো- ‘অসম্ভব সুন্দর’। আমি গেঞ্জির কলার উপরের দিকে তুলে ধরে বললাম, দেখ তো এটা কোন দেশের তৈরি? ‘ওহ’ বলে সে আরো আশ্চর্যান্বিত হলো। তারপর পাল্টা তাকে প্রশ্ন করেছি- জানো এই টি সার্টটি যে তৈরি করেছে সে শ্রমিকের বেতন মাত্র ঘন্টায় ‘সাত সেন্ট’! আর তোমার ওয়েট্রেসি চাকরির বেতন (টিপস সহ) সম্ভবত ঘন্টায় আঠারো- কি ঊনিশ ডলার! ভ্যালেরি আকাশ থেকে পড়লো! পালটা মন্তব্য- বলো কী? তখন জানতে চাইলো সম্ভবত তোমাদের দেশে জায়গা জমি মানে জীবন নির্বাহের খরচও অনেক কম, মানে- আমেরিকার এক হাজার ভাগের এক। তখন তাকে বললাম, তুমি হয়তো জানো না- ঢাকার প্রাণ কেন্দ্র এবং ম্যানহাটানের জমির দামে কোন পার্থক্য নেই! আরো কিছু তথ্য দিলাম- যেমন তোমাদের এখানে এক গ্যালন (৩.৭৮ লিটার) দুধের দাম তিন ডলার (২৪০ টাকা), আর বাংলাদেশে তুমি যদি এক গ্যালন খাটি দুধ কিনতে চাও তাহলে তোমাকে অন্তত দ্বিগুণ দাম দিতে হবে। আমার মুখে ‘খাঁটি’ কথাটি শুনে সে আবার ভিড়মি খেল। দুধ আবার খাঁটি অখাটির কি হলো। আরো তথ্য দিলাম- যেমন তুমি এক ডজন ডিম কেনো এক ডলারে (আশি টাকায়)। আমার মায়ের জন্য সে ডিম কেনা হয় একই অথবা তার চেয়ে বেশি দামে।

এবার ভ্যালেরি মুখ খুললো- তাহলে তোমার ওদেশের মানুষ কি খেয়ে বেঁচে থাকে? আমি বলি- ‘আশা’। আমার জন্মভূমির মানুষদের ইহ এবং পরজনমের আশা ঝুলিয়ে বাঁচিয়ে রাখার মতো মানুষের অভাব নেই। এই সব আশা জাগানিয়া মানুষের অস্তিত্ব মসজিদ-মন্দির থেকে শুরু করে পল্টন পর্যন্ত বিস্তৃত। এদের মুখের সামনে আছে দৃশ্য ও অদৃশ্যমান ‘মাইক্রো ফোন’। এসব মাইক্রো ফোনে এরা দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা আশা’র বাণী প্রচার করে। এই ‘আশা’ খেয়েই মানুষ বেঁচে থাকে! এরা তেল চটচটে, চর্বিযুক্ত। এরা দেশি না বিদেশি বোঝার উপায় নেই! যারা এদের কথা শুনে, তাদের কোন জীবনী শক্তি নেই। এই বাকি’রা অর্ধ মৃত। জায়গা-জমি, ফ্ল্যাট, রাজনীতি, অর্থনীতি সবই ঐ চর্বিযুক্তদের কব্জায়। এদের সম্পদের পাহাড়াদার হিসেবে আছে ডজনে ডজনে চ্যানেল এবং রেডিও। ঠিক যেন ধনীর বাড়ির কুকুরের মতো। আমি ভ্যালেরিকে বলি- কী আশর্য্য জানো, বাংলাদেশ কিন্তু গর্ব করে এই হাড় জিরজিরে মানুষগুলোর জন্যই। এই হাড় জিরজিরে মানুষগুলোই তোমাদের ‘ক্লোজেট’ ভরে রেখেছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা কাপড়ে! এরপর ভ্যালেরি’র দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে দেয়া মন্তব্য- ‘হোয়াট দ্যা হেল ইট ইজ’ (কী নরকের কাণ্ড)!

আজ সিএনএন, এবিসি, সিএনবিসি’র পর্দা জুড়ে ঐ একই দৃশ্য। জানালার গ্রীল ধরে অসহায় আর্তনাদ ছুঁড়ে দিয়ে এই বর্বর সভ্যতাকে বিদায় জানাল শত শত ভাই ও বোন। আজ এদের রক্ত আখড়ে লেখা হউক আরো একটি গান, ঠিক যেন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারির মতো! কিন্তু লেখা হবে না। বাংলাদেশকে সম্ভাবনার শিখরে নিয়ে যাবার জন্য যারা এই নব্য দাশ যুগে আত্মদান করলো, তাদের আত্মদানকে কেনা হবে দু’চার লাখ টাকায়। কী দানবীয় স্বীকৃতি! মানুষের জীবনকে নিয়ে যারা এই মৃত্যুর পাশবিক খেলায় মেতে উঠেছে, এরা মানুষ নামে স্বীকৃতি পাবার যোগ্য নয়!

নাই ধর্ম, নাই মর্ম
সম্পদ আহরণের পাশবিক খেলায় এখন রাষ্ট্র থেকে যেমন ধর্ম বিদেয় নিয়েছে, তেমনি বিদেয় নিয়েছে সমাজের মর্ম! কেউ কারো জন্য হাপিত্যেশ করে না। আপন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত, এটাই পুঁজিবাদের নিয়তি। কিন্তু রাষ্ট্রের আইন-কানুন এবং সমাজের বিবেক যে এতোটাই ভিত্তিহীন দুর্বল হয়ে পড়বে, তা ভাবতে কষ্ট লাগে। কিছুদিন আগে বিমানে ভ্রমণের সময় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন পাশের সীটে। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম গার্মেন্টস খোলার অনুমতি দেয়ার আগে পরিবেশ সার্টিফিকেট দেয়ার বিধান আছে কি না, থাকলে তা ঠিকমতো তদারকি হয় কিনা। এর জবাব না দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আগুন কি নিউইয়র্কে লাগে না? আল্লাই আমাদের রক্ষা করেন’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব সরকারি কর্মকর্তাই বাংলাদেশের নিয়তি। ‘পাবলিক সেফটি’ সম্পর্কেই তাদের কোন ধারণা নেই। অথচ তারা মাসে মাসে বেতন গুনেন মানুষের কষ্টের ট্যাক্সের পয়সায়! এদের না আছে মানবিক সম্ভ্রম, না আছে ধর্মের সম্ভ্রম!

দুর্বলের কান্না
আমার মনে হয় বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী সবচেয়ে দুর্বলতম ব্যক্তি! ইনি সব দূর্ঘটনার পেছনে খুঁজেন ‘ষড়যন্ত্র’! রাষ্ট্রের কর্মচারীদের জবাবদিহিতার পরিবর্তে ‘ষড়যন্ত্রের গন্ধ’ খোঁজা ব্যর্থতার সামিল। দূর্ঘটনায় অপমৃত্যুর দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে! যে সব কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে, সে গুলোর পরিবেশ তথা অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থাপনা কতটা জুতসই, তা যাচাই করা উচিত শুরুতেই। যারা আইন মানবে না, তাদের জন্য থাকবে শাস্তি, এইতো একটি রাষ্ট্রের কাছে জনগণের চাওয়া! সেই রাষ্ট্রটি যদি দুষ্টের লালন, এবং শিষ্ট দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না। পরিগণিত হয় ব্যর্থ রাষ্ট্রে! আমাদের প্রধান মন্ত্রী সেই কুচক্র থেকে বেড়িয়ে দেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ রাষ্ট্রে পরিণত করবেন, তাইতো প্রত্যাশা!

নিউইয়র্ক, ২৬ নভেম্বর ২০১২