ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ইসলাম নামেই শান্তির ধর্ম। অবশ্য সব ধর্মই শান্তি ও সৌহার্দের কথা বলে। মানুষের আচরণে এর প্রকাশ থাকুক, বা নাই থাকুক! বাকি ধর্মের কথা আজ না হয় থাক। বাংলাদেশের মানুষ যে ধর্মের অনুশাসনে থেকে আবহমান শান্তি ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলেছে আজ তাই নিয়ে কথা বলি। দেশের ৯৯ ভাগ মুসলমানের জীবনে ‘ইসলাম ধর্ম’ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু না। সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশে অবশ্য তাই হয়। ধর্ম ধারে কাটে, ভারেও কাটে। ধর্ম যখন সমাজের চালিকা শক্তি হয়ে যায়, তখন এ নিয়ে আর প্রশ্ন চলে না। এবং প্রশ্ন করাটাও গুনাহের কাজ! ধর্মের আচার অনুষ্ঠান নিয়ে যেমন প্রশ্ন চলে না, তেমনি প্রশ্ন চলে না এর উপর জীবিকা নির্ভর মানুষদের নিয়েও।

বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি, নিজের ভালো-মন্দ বোঝার শক্তি যাদের কম। একই কারনে ধর্মের উপর জীবিকা নির্ভর লোকের সংখ্যাও বেশি। ফি বছর মাদ্রাসাগুলো থেকে এই জীবিকা বেছে নেয়ার জন্য হাজার-হাজার ছাত্র (তালেবান) আলেম, কামেল, ফাজেল উপাধি নিয়ে বের হচ্ছে। এদের উপর রাষ্ট্রের কোনই নিয়ন্ত্রণ নেই। যেমন নিয়ন্ত্রণ নেই মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। এরা কয়েক মাসে, অথবা বছরে পুরো কোরান মুখস্থ করে ফেলে, কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের এগারোটি আয়াত মুখস্থ করতে পারে না!

দোষ কি শুধু ঐ সব কোমল মতি তালেব’দের? দোষ কি আমাদের নেই? দেশের এই মেধাকে আমরা কিভাবে অঙ্কুরে বিনস্ট হতে দিচ্ছি? আমরা কি কখনো ভেবেছি এই সব কোমল মতি শিশুরা আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ, দেশের সোনালী সম্পদ? আমরা কি কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছি- মাদ্রাসায় যারা পড়তে যায়, তাদের ৯৯ শতাংশই যায় দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে? এ’সব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা। তবু আমরা না জানার ভাব করি। কারন আমরা কোন দায়িত্বের ভার নিতে চাই না। আপন প্রাণ বাচিয়ে কোন রকমে চলার চেষ্টা করি!

শৈশব থেকে আমরা কোরান পাঠ করতে শিখি, কিন্তু বুঝতে শিখি না। এই পবিত্র ধর্ম গ্রন্থটি আমার কাছে হয়তো অধরাই থেকে যেত, যদি আমি আমেরিকা না আসতাম। প্রতি শুক্রবার জুমা’র নামাজে আমি যাদের মুখে খোতবা শুনতে যাই, ইসলাম বুঝতে যাই, এরা কেউই জন্মসূত্রে মুসলমান নয়। এরা জেনে বুঝে ধর্মান্তরিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এরা পাখির ভাষায় খোতবা পাঠ করে না। যে ভাষায় (ইংরেজীতে) খোতবা পাঠ করে সে ভাষাটি আমি কিছুটা হলেও হৃদয়ঙ্গম করতে পারি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কখনো মাতৃভাষায় অথবা নিদেন পক্ষে ইংরেজীতেও খোতবা পাঠ হয় না। জামাতে ইসলামী, অথবা ইসলামের উপর জীবিকা নির্বাহকারীরা যদি জাতির এ উপকারটিও করতেন, তবে তাদের উপর কিছুটা প্রসন্ন হওয়া যেত। এরা কোমলমতি তালেব’দের দারিদ্রদশাকে ভর করে শুরুতেই ‘জেহাদ’ মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। তারা ধর্মকে মাতৃভাষায় রূপান্তর ঘটান না। কিন্তু মওদুদি’র রাজনৈতিক মন্ত্রকে সাজিয়ে গুছিয়ে তালেবানদের সামনে ঠিকই মাতৃভাষায় উপস্থাপন করেন। ধনীর অনুদানে চলা আজীবন দারিদ্র সঙ্গী তালেবানরা এসব গোগ্রাসে গলাধকরণ করেন। তারপর সবুজ পাগড়ি পরে ঢাকার রাজপথ অবরোধ করে রাখেন। তারা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র সঙ্গে থেকে থেকে শিখেছেন- এভাবে সড়ক কিংবা সচিবালয় অবরোধেই সরকারের পতন ঘটানো যায়! দেশের মাজা ভাঙ্গা যায়!

কোমলমতি তালেবানরা আরো জানেন, চাকরি-বাকরিতে আর কেউ তাদেরকে নিয়োগ করুক কিংবা নাই করুক, জামাতি প্রতিষ্ঠানে তারা চাকরি পাবেনই। এ কারনে দেশে শরিয়ত সম্মত (?) শত শত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, এবং উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটিকে উৎখাত করেছি আমরা ১৯৭১ সালে, তার অবশেষ এখনো ছায়ার মতো আমাদের অনুসরণ করছে। সমাজ জীবন থেকে পাকিস্তানকে আমরা নির্মূল করতে পারিনি বলে চল্লিশ বছরে পাকিস্তান আবার জেঁকে বসেছে আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। আমরা কিছুদিন পর পর জামাতিদের পুলিশ দিয়ে ঠেঙ্গিয়ে হয়তো কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারবো। কিন্তু রাস্ট্র ও সমাজকে গণতান্ত্রিক (মানবিক) কাঠামোর উপর দাঁড় করাতে না পারলে জামায়াতে ইসলামী বলুন, আর সমাজের পশ্চাদপদতা বলুন কোন দিনই ঠেকানো যাবে না।

বেহেশতের দ্বারওয়াজা এই ঢাকা শহরেই
ঢাকা শহর মানেই বিরতিহীন ট্রাফিক জ্যাম, ধূলো, ধোঁয়া, অগণিত ভাসমান মানুষের স্রোত! রাস্তার কোল ঘেঁসে ময়লার ভাগাড় আর নদী সিকস্তি মানুষের গলাগলি বসবাস। এ শহরে পারতপক্ষে কে আসতে চায়? কিন্তু আজ যে তরুণটি এই শহরে পা রাখলো, তার জন্মস্থান টাঙ্গাইলের উলিপুর কিংবা কুমিল্লার মতলব উপজেলায়। তার থুতনিতে কিছু অপরিপাটি দাঁড়ি গজিয়েছে। মাথার চুল উষ্কখুষ্ক। জিন্স প্যান্টের সঙ্গে ফুল হাতা চেক সার্ট, পায়ে কাবুলি সেন্ডেল, কাঁধে ছাই রঙা ব্যাক পেক। ছেলেটির বা হাতে দুটো কালো পলিথিন ব্যাগের ভেতর ডজন খানেক ইস্টক খন্ড।
বাস ভর্তি হয়ে আসছে এই ঢাকা শহরে। এরা কেউ কলেজ, মাদ্রাসা ছাত্র, কেউবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। শুধু ইস্টক খন্ড নয়, অনেকে বাসের ভেতর সীটের নীচে কিরিচ এবং গজারি লাঠি ভর্তি বস্তাও লুকিয়ে আনছে। আমীর গোলাম আযম, নায়েবে আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, মোজাহিদী প্রমুখ নেতার মুক্তির মিছিলে শহীদ হওয়ার দিন তাদের। মুসলমানের জন্য দু’টির যেকোন একটি রাস্তা খোলা- হয় শহীদ, নয়তো গাজী। আর এ রাস্তাতেই সাক্ষাত পাওয়া সম্ভব বেহেশতী দ্বারওয়াজার! জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এ মন্ত্রেই মানুষকে জড়ো করছেন ঢাকা শহরে। মসজিদগুলোতে ফজরের নামাজের পর নির্বিঘ্ন বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন হরতাল-পিকেটিং-এ কে কোথায় দায়িত্ব ‘হাসেল’ করবে। এসব কর্মকাণ্ডের কিছুই ইসলাম সম্মত নয়। কিন্তু জামায়াতের নেতারা কর্মীদের তাই ইসলাম সম্মত বলে ফতোয়া দিচ্ছেন।

জামায়াত-শিবির কিভাবে বেড়ে উঠে?
জামাতে ইসলামী কিংবা শিবির কখনো ধনীদের সংগঠন নয়। বরং জামায়াতেকে আশ্রয় করেই কিছু লোক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইয়িদি থেকে শুরু করে কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী যাদের দু’বেলা ভাতের ব্যবস্থা করতে কস্ট হতো, তারা ঢাকা শহরে জায়গা জমি প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক, ইউনিভার্সিটি-কলেজ, ব্যাঙ্ক, ইনস্যুরেন্সের মালিক। হালের সিনেমা-থিয়েটার অর্থাৎ টিভি চ্যানেলেরও মালিক। সন্তানদের বিদেশের মাটিতে রেখে পড়াতে পারেন। স্ত্রী কন্যা নিয়ে কলকাতা-দিল্লিতে সওদা করতে পারেন। কাজেই জামায়াত করে বড়লোক হওয়া যায় ‘ইসলাম সম্মত’ উপায়ে- কর্মীদের এটাও বোঝানো হয়। গ্রামের নিরন্ন তালেব যখন জামাতের ‘আইকন’ ইবনে সিনা, অথবা ইসলামী ব্যাঙ্কে ঢুকে তখন তাদের চোখ ধাঁধায়। এতকালের চিরচেনা ‘লুঙ্গি গামছার ইসলাম’ তখন তাদের কাছে মূর্তিমান ‘সাদ্দাদের বেহেশত’ হয়ে ধরা দেয়।

শিবিরের কর্মীরা যখন নতুন কর্মী ‘দাওয়াত’ করে (শিকার ধরে) তখন তাকে ‘ভাই-ভাই’ বলে সম্বোধন করে। চা-বিস্কুট, খিচুরি খাইয়ে বন্ধুত্তের ভাব জমায়। সেই ছেলেটিকেই প্রথম টার্গেট করে যার নূন আনতে পান্তা ফুরোয়, জীবনটাই যার কাছে অনিশ্চয়তায় ভরপূর! সেই ছেলেটি শিবিরের সংস্পর্শে এসে প্রথমে নামাজ পড়তে শিখে। ধীরে ধীরে পাখির বোলের মতো ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ বলতে শিখে। এরপর সহোদর বিএনপি-ছাত্রলীগ ভাইদের দেখে “আগুণ জ্বালো, আগুণ জ্বালো” শ্লোগান দেয়। এইসব ‘গেঁয়ো’ তালেব’দের হোস্টেলে কেউ সীটও দখলে এনে দেয় না। ছাত্রলীগ-ছাত্র দলের কেতাদূরস্থ নেতারা এদের দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না। এরা ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে এবং একদিন “ভাইয়াদের” অনুপস্থিতিতে বাসে, রিক্সায় আগুণ দিতেও শিখে ফেলে। দোষ তাদের নয়। আমরা পুরো সমাজকেই ওই জায়গায় নিয়ে গেছি।

তারা মরতে শিখেছে। বড় জামাতি ভাইদের জান বাঁচাবার জন্য ছোট ভাইদের মরতে শিখতে হয়। তাদেরকে শেখানো হয়েছে- “মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী, তাই আমরা মরতে রাজী”। এরা হয়তো মারা পড়বে পঙ্গপালের মতো। শিবিরের ইটপাটকেলে ধরাশায়ী পুলিশ যখন উঠে দাঁড়াবে, তখন পুলিশের পক্ষে এক ধরণের জনমত তৈরি হয়ে যাবে। এই সব ষাঁড়-গোদা শিবির কর্মীদের জন্য হয়তো র‍্যাব’এরও দরকার হবে না।

শেষ কথা
বাংলাদেশকে উঠে দাঁড়াতে হবে, মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে হবে। এ নিয়তি থেকে বাংলাদেশকে কেউ নিবৃত্ত করতে পারবে না। মৃত্যু এবং বিভীষিকার পথ ধরেই হয়তো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। আর এ জন্য গারমেন্টস-এর আগুণের লেলিহান শিখা সমাজ জীবনকে কিছুটা হলেও গ্রাস করবে। এর পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে জামায়াতের সাম্প্রতিক উচ্ছৃঙ্খলায়। আমি এই দূর প্রবাসে বসেও দেখছি- যে চ্যালেঞ্জ আজ বাংলাদেশের তরুণ সমাজের স্কন্ধে ন্যস্ত হয়েছে, তার ভার বইতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। আর এজন্য মুক্তিযুদ্ধের মতো সমান ক্ষতি মেনে নিতেও তারা ইতস্তত নয়! জয় হউক বাংলাদেশের, জয় হউক বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার! আরেকটি কথা ইসলাম প্রিয় মানুষের জন্য- ইসলামকে বাচাতে হবে এই মাসুম শিশুদের হাত থেকে। এরা ইসলামকে যে তরবারির ডগায় স্থান দিয়েছে, তা খুবই বিপজ্জনক। এদের হাত থেকে শান্তির ইসলামকে রক্ষা করুন। মসজিদ-মাদ্রাসায় সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলুন!

নিউইয়র্ক, ৬ ডিসেম্বর ২০১২