ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

রাজনীতিতে ‘স্মেয়ারিং’ এবং ‘স্মেসিং’ দুনিয়ার সব দেশেই আছে। আমরা বাংলায় একে বলতে পারি ‘ল্যাপ্টা- চ্যাপ্টা’। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নানা ছুতো! যখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সব সভ্য-ভব্যতা হার মানে তখনই অসভ্য এবং বর্বরতা মানুষকে পেয়ে বসে। হয় প্রতিপক্ষকে একেবারে নিঃশেষ করে ফেলো, অথবা কলঙ্কের এমন কালিমা লেপ্টাও যাতে জন্মেও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে!

‘স্মেয়ারিং’ এবং ‘স্মেসিং’ সব সময় ব্যাকরণ মানে না। কিন্তু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কখনো কাজে আসে। এই আমেরিকাতেও ‘ল্যাপ্টা- চ্যাপ্টা’ রাজনীতি দেখা যায়। তবে তা নির্বাচনী ডামাঢোলের একেবারে শেষ পর্যায়ে। এই যেমন এবার নির্বাচনের ঠিক আগে-আগে ফ্লোরিডা এবং ওয়াহিয়োতে। ফ্লোরিডায় ভোট গ্রহনের দীর্ঘ লাইন এবং প্রেসিডেন্ট ওবামা’র জন্ম সনদ নিয়ে রিপাবলিকানদের বাড়াবাড়ি। এছাড়া টিভি বিজ্ঞাপনে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা। এসবই আমেরিকান রাজনীতির ‘ল্যাপ্টা- চ্যাপ্টা’ কালো দিক।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে মনের ভেতর এক ধরনের অসহায়ত্ব এবং অস্থিরতা ভর করে। কারন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল এখানে খুবই নির্মম। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলী হয় সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে, রক্তাক্ত, জখম করে, এম্বুলেন্সে আগুন দিয়ে, কারখানা এবং যাত্রীবাহী বাস পুড়িয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে প্রতিপক্ষ। রক্তের হোলি খেলায় পালা বদল ঘটে ক্ষমতার। একটি সরকারের শেষের বছর এই পৈশাচিকতার ঘটনা ঘটতে থাকে। তখন সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিপক্ষের হাতের পুতুল অথবা ভাঁড়ে পরিণত হয়, আর প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে ‘হরর মুভি’র ড্রাকুলা চরিত্র। মানুষের রক্ত পান করাই যেন এর নেশা হয়ে যায়। এটি একান্তই বাংলাদেশী গণতন্ত্রের স্টাইল।

সাম্প্রতিক সময়ে হঠাত করে সব কিছু যেন ফুঁসে উঠেছে! বর্বরতা কোন কিছু রাখ-ঢাক না করেই বিস্ফোরিত হচ্ছে! এটি কোন ধরনের ‘বিকারগ্রস্থতা’? এই বিকারগ্রস্থতা বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে। ১৯৭৪, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত। আবার ‘৯০ পরবর্তি গণতান্ত্রিক জমানায়। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান এলিভেনে)। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছে এই ২০১২ সালের শেষে এসে। উদ্দেশ্য কি আরেকটি ওয়ান এলিভেনের জন্ম দেয়া? যে রাজনীতি মানুষকে স্বর্গ সুখ দেবে, সেই রাজনীতিই কি না নরক যন্ত্রণার একমাত্র উপলক্ষ!

দেশদ্রোহী রাজনীতির ‘মানব ঢাল’
পাঠক লক্ষ্য করুন সাম্প্রতিক ঘটনাবলী। রামু’র বৌদ্ধ বিহার-পল্লীতে হামলা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো, গার্মেন্টস পুড়িয়ে শতাধিক মানুষ হত্যা এবং প্রকাশ্যে কুপিয়ে ‘বিশ্বজিৎ’ নামের একজন দরিদ্র যুবককে হত্যা- সবই করা হয়েছে রাজনীতির মাঠ ঘোলা করার জন্য। সর্বশেষ ষড়যন্ত্র- ট্রাইব্যুনাল প্রধানের স্কাইপে হ্যাক করা হয়েছে, যাতে এ দেশে জামায়াতি আলবদর কম্যান্ডারদের বিচার অনুষ্ঠিত হতে না পারে। অতীতের অভিজ্ঞতায় খুনীদের রক্ষার জন্য আরো যে সব ঘটনা ঘটতে পারে তার একটি তালিকা করুন এখনি। এ তালিকার মধ্যে থাকতে পারে-

# ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু,
# লঞ্চের পাঠাতন ফুটো করে শতাধিক যাত্রীর সলীল সমাধি,
# খাদ্য ও পাটের গুদামে আগুন,
# গভীর রাতে আন্তজেলা সড়কের ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া,
# স্কুলের টিফিনে বিষক্রিয়া,
# ঢাকায় স্কলাস্টিকার বাসে আগুণ দিয়ে শিশুদের পুড়িয়ে মারা,
# খাদ্যে বিষক্রিয়ায় বিয়ের মজলিশে হাজার মানুষের মৃত্যু,
# আন্তজেলা সড়কে সঙ্ঘবদ্ধ ডাকাতি
# বড় সমাবেশে বোমা মেরে শত-শত মানুষের মৃত্যু,
# গুলিস্তান অথবা ফার্মগেটের জন অরন্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পদ দলনে শত শত মানুষের মৃত্যু,
# সিনেমা হলে গ্যাস ছড়িয়ে শ্বাস রোধ করে মানুষ হত্যা,
# সামান্য ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে হাসপাতালে সঙ্ঘবদ্ধ হামলায় শত-শত রোগীর করুন মৃত্যু,
# বঙ্গ বাজারের মতো বড় বড় কানাগলি’র বাজারে আগুণ দিয়ে শত শত কোটি টাকার সম্পদ এবং আদম সন্তানকে পুড়িয়ে মারা,
# ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় কয়েকটি বোমা ফাটিয়ে বিদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।

হরতাল-অবরোধের নামে বাংলাদেশে আরো মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হতে পারে। বাস-ট্রেন-কারখানা আগুনের লেলিহান শিখায় ছারখার করে দেয়ার আলামত দিনে দিনে স্পস্ট হয়ে উঠছে। বিপুল জনগোষ্ঠীকে ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া জামায়াত এবং দেশদ্রোহী রাজনীতির আর কোন কৌশল নেই। এজন্য বিভিন্ন দলের মুখোশ পরে এরা মানুষ হত্যায় মেতে উঠবে, এটাই তাদের একমাত্র পরিণতি। যেমন তারা মানুষ হত্যায় মেতে উঠেছিল পাকিস্তানীদের পক্ষ নিয়ে। তা পরিণতি পায় স্বাধীনতার ঊষা লগ্নে, ১৯৭১-এর ১৪ই ডিসেম্বর, বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মাধ্যমে!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এদের বিচারে ব্যর্থ হলে এরা কখনো ছাড় দেবে না। ২০০৪ সালের ২১ই আগস্টের বঙ্গবন্ধু এভিন্যুয়ে বোমা হামলার কথা স্মরণ করুন। ফারুক-রশিদদের বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর এই আত্মস্বীকৃত খুনীরা কারাগারে বসে হত্যার পরিকল্পনা করে। যে আরজেস গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয় বঙ্গবন্ধু এভিন্যুয়ে, সেই একই গ্রেনেড পাওয়া যায় তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করে তারা কারাগার থেকে বেড়িয়ে আসবে। আজ এই খুনীদের প্রেতাত্মা ভর করেছে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী এবং সাকা চৌধুরীদের ঘাড়ে। আজ তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে পক্ষাবলম্বন জরুরি হয়ে পড়েছে।

নজর রাখুন জামাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপর
জামাতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো চিনে নিন। নজর রাখুন এখান থেকে কোন অর্থ যাচ্ছে কি-না দুষ্কৃতকারীদের হাতে!

১। ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-
২। ইবনে সিনা ট্রাস্ট
৩।ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিকালস
৪। নয়া দিগন্ত
৫। দিগন্ত টেলিভিশন
৬।ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং
৭।রেটিনা মেডিকেল ভর্তি কোচিং
৮।মানারত ইউনিভার্সিটি, মহাখালী,ঢাকা।
৯।ফারইষ্ট লাইফ ইনসুরেন্স।
১০।আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস
১১।বিডি ফুডস লিমিটেড।
১২।আল মারকাজুল হাসপাতাল
১৩।ফুয়াদ আল খতিব মেডিকেল ট্রাষ্ট
১৪।বুয়েট ভর্তি কোচিং কনক্রিট
১৫।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ইনডেক্স
১৬।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং রেডিয়াম
১৭।ডুয়েট(গাজীপুর) ভর্তি কোচিং অপটিমাম
১৮। কেয়ারি লিঃ
১৯। দৈনিক সংগ্রাম
২০।কিশোরকন্ঠ ফাউন্ডেশন
২১। মানারত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

বাংলাদেশে আজ দুই পক্ষ
ক্ষমতার পালাবদল মানুষের জীবনে ইতর বিশেষ পরিবর্তন আনে না। অথচ এই পালা বদলের জন্য মানুষকে কতই না জরিমানা গুণতে হয়! রাখ-ঢাক না করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ মেরুকরণ স্পষ্ট। একদিকে যারা সাম্প্রদায়িক জামাতি এবং গণবিরোধী ধারার রাজনীতির কবর রচনা করে দেশে সুস্থ ধারার বিকল্প রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, আর অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক গণ-বিরোধী রাজনীতির ধারা। জামায়াত এবং বিএনপি’র একাংশ শেষোক্ত ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে বিএনপিতে এখনো গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল তরিকুল ইসলামদের মতো মুক্ত মনের অনেক মানুষ আছেন, যারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করেন না। অথচ যারা মনে প্রাণে দেশে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল এবং দুর্নীতি বিরোধী একটি ধারার সূচনা দেখতে চান। এই ধারার রাজনীতিবিদরা দেশে হত্যা-রাহাজানি-বোমাবাজি এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের পারবারিক বলয় থেকে বেড়িয়ে বিকল্প ধারা সূচনার মতো যথেস্ট সাহস দেখাতে পারেন না। ওপর পক্ষে আওয়ামী লীগের ভেতরেও ত্যাগী এবং সাহসী নেতাদের একটি নীরব ধারা সতত প্রবাহমান। এরাও বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের মহিমায় দেশকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চান। আজ এদের মিলিত স্রোতই হতে পারে সত্যিকার জনদরদী বিকল্প ধারা।

নিউইয়র্ক, ১৪ ডিসেম্বর ২০১২