ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ঈসপ ফেবল’স খ্যাত সিংহ এবং ইঁদুরের গল্পটি আমাদের পড়া সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পায়ের উপর দিয়ে ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ির কারনে পশুরাজ সিংহের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। এতে সিংহটি থাবা দিতে গিলে ইঁদুরটি বলেছিল- আমাকে মাফ করেন হুজুর। একদিন আমিও আপনার উপকারে আসতে পারি। একদিন যখন শিকারীর জালে আটকা পড়লো সিংহটি, সেই ইঁদুরই জাল কেটে উদ্ধার করেছিল পশুরাজকে।

সেই ঈসপ ফেবল স্মরণ করে কি না, বাংলাদেশের বাউল গান বেঁধেছেন ‘এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে। এই দিনেরে নিয়া যাবো সেই দিনেরও কাছে, এ…এ…এ…এ’। ইংরেজীতেও আছে- ‘এক মাঘে শীত যায় না’র মতো প্রচলিত প্রবাদ। যাই হউক, ঈসপের এই গল্পটির ‘মরাল’ ছিল-“ইভেন লিটল পিপল কেন মেইক বিগ থিং”।

কথা ক’টি বললাম এ কারনে যে, আমাদের চোখে দেখা এ পৃথিবীর কোন কিছুই শাশ্বত নয়। না দৃশ্যপট, না সময়। আজকের রাজা, কালকের ফকির। আমাদের জানা বোঝার বাইরেরও অনেক ‘কারন’ পালটে দেয় আশেপাশের সবকিছু। যেমন আমরা পালটে চলেছি, পালটে দিচ্ছি আমাদের চলমান ঘটনা প্রবাহকেও।

বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে হবে আমেরিকাকেও

সেদিন (গত রোববার, ২২ ডিসেম্বর) সিএনএন চ্যানেলে দেখছিলাম ফরিদ জাকারিয়ার বিখ্যাত অনুষ্ঠান “জিপিএস” (গ্লোবাল পাবলিক স্কোয়ার)। ‘টাফ ডিসিশন’ নামের একটি সিগমেন্টে দেখানো হলো কি করে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পররাস্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার মহাচীনের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটালেন! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আজকের এই দুই পরা শক্তির মধ্যে সম্পর্কের সূচনা করেছিল, তা হয়তো অনেকের কাছেই অজানা। ‘জিপিএস’-এর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টানা হয়নি ঠিকই, কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রাথমিক ভিত্তি যে দেশ দু’টির ‘বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের বিরোধিতা’ তা বুঝতে কখনো কস্ট হওয়ার কথা নয়!

চীনের কম্যুনিস্ট বিপ্লব হয় ১৯৪৯ সালে। এই বিপ্লবের কারনে আমেরিকা তথা পাশ্চাত্যের সঙ্গে চীনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর প্রায় দুই দশক পর সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে চীনের বিরোধ শুরু হয় সীমান্ত নিয়ে। রাশিয়াকে এক হাত দেখানোর জন্য চীন সে সময়ে পাশ্চাত্য তথা আমেরিকার বন্ধুত্ব লাভের ছুঁতো খুঁজতে থাকে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সে সুযোগ এনে দিয়েছিল এই উভয় দেশের মধ্যে। দীর্ঘ ২২ বছরের লৌহ যবনিকার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন-আমেরিকার বন্ধুত্বের রথ যাত্রা শুরু হয়।

পাঠক স্মরণ করুন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের ভয়ঙ্কর দিনগুলোর কথা। পাকিস্তানী ট্যাঙ্কের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের শহর-বন্দর-গ্রাম। রাজাকার-আলবদরদের যোগ সাজসে পাকিস্তানী বাহিনী চালাচ্ছে নিরীহ মানুষের হত্যাযজ্ঞ। লুট-তরাজ-হত্যা-নারী ধর্ষণ-অগ্নি সংযোগে বাংলাদেশের ভয়ানক পরিস্থিতি। এসময় চীনের বন্ধুত্ব পিয়াসী আমেরিকার পররাস্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ভ্রমণ করছিলেন পাকিস্তান। ১৫ই জুলাই ১৯৭১, একদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে গেলেন কিসিঞ্জার। মিডিয়ায় জানানো হলো- পেটের পীড়ায় অসুস্থ কিসিঞ্জার কোন পাবলিক কর্মসূচিতে যাচ্ছেন না। অথচ এ দিনেই তিনি ইসলামাবাদ থেকে পিকিং-এ (এখনকার বেইজিং) গিয়ে দেখা করলেন চীনের নেতা মাও সেতুং এবং চৌন এন লাই-এর সঙ্গে। এরপর গোপনে আরো একবার তিনি ভ্রমণ করেছিলেন চীন। আর তারপরেই ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যাবহিত পরে প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন আট দিনের জন্য সফর করেন চীনের বেইজিং, দুয়াংজং এবং সাংহাই। এরপর জেরাল্ড ফোর্ড, জিমি কার্টার, রিগ্যান, ক্লিনটন কোন প্রেসিডেন্ট বাদ পড়েন নি। সবাই রাষ্ট্রীয় সফরে গেছেন চীন।

আজকের এই মহা চীন বিশ্ব অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশিদার। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, চীনের এই সৌভাগ্যের সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের দিনগুলোতে! আর এই দুর্ভাগ্যের জনক হেনরী কিসিঞ্জারের মুখেই সেদিন বাংলাদেশের খেতাব জুটেছিল- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’!

বদলে যাওয়া দিন

দিন বদল হয়। হাওয়াও বদল হয়। চীন তার রুগ্ন-ক্লিস্ট চেহারা পালটে ফেলেছে। যে চকচকে চেহারা নিয়ে গত অর্ধ শতক বিজয় ডঙ্কা বাজিয়েছে আমেরিকা তার অবস্থাও নাজুক। প্রফেসর নোয়াম চমস্কি’র ভাষায়- ‘সূর্য এখন প্রায় অস্তমিত’। এটা বিস্ময়ের কিছু নয়। মনে পড়ে আমেরিকার ত্রিকাল দর্শী প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন প্রায় বছর দশেক আগে তার এক বক্তৃতায় সময় বেঁধে দিয়ে বলেছিলেন- আগামী দুই দশক এশিয়ার, আর তার পরের দুই দশক আফ্রিকার।
এক সময় বাংলাদেশের জমিদার তনয়রা জাতে উঠতেন ‘বিলেত ভ্রমণ’ করে। আমাদের শফিক রেহমানকেও পাঠানো হয়েছিল বিলেতে ‘উচ্চ সাংস্কৃতিক পরিবেশে’ বেড়ে উঠতে। শিক্ষাবিদ সাইদুর রহমানের পুত্র যতটা না সাংস্কৃতিক বোধে ‘বোধী’ হলেন, তারচেয়ে বেশি হলেন ‘রাজনৈতিক বোধে’। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ঘৃণ্য রাজাকার-আলবদরদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করতে বিএনপি’র ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন। আমি ছিলাম তার ‘যায় যায় দিন’ সাপ্তাহিকের একনিষ্ঠ পাঠক। এরশাদের পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে একবার তিনি দেশছাড়া হলেন। যখন ফিরে এসেছিলেন, আমি তার সাক্ষাতকার নিতে হাজির হয়েছিলাম শান্তিনগরের কাছাকাছি তার বাড়িতে। সেদিনের সেই সম্মানটুকু এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধরে রাখতে পারেননি ‘মিস্টার শফিক রেহমান’।

শফিক রেহমানের মতো আরো কিছু পতিত বুদ্ধিজীবী হয়তো বিচারের বিরোধিতা করবেন। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গায়ে পড়ে বাগাড়ম্বর করছেন বিদেশী রাস্ট্রদূতরাও। বাংলাদেশের মানুষ এই সব পরদেশী এবং দেশীয় ‘বিদেশীদের’ পরোয়াও করে না। কারন এরা পাকিস্তানের খপ্পর থেকে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তি এনে দেয়নি। এনে দেয়নি অরথনৈতিক মুক্তিও। বরং এদের খপ্পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে জানে। জানে বলেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র খেতাব পালটে ফেলেছে বাংলাদেশ। বরং বাংলাদেশকে যারা নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, তারাই আজ তলাবিহীন।

বাংলাদেশের গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য প্রজাপীড়ক, উৎপীড়কের বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ হুংকার দিয়ে উঠেছেন। এই ইতিহাসের বিপক্ষে যারা দাঁড়িয়েছে, তারাই নিস্ক্রান্ত হয়েছে। ১৯৭১-এ বিজয় অর্জনের পর ‘তলা বিহীন দেশটিকে’ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বড়ই বিপাকে। এই দেশটি আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। অতীতের গ্লানি পায়ে দলে ভবিষ্যতের পানে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। কে জানে এই দেশটিই যে ভবিষ্যতে চীনের জায়গা (অর্থনৈতিক বিবেচনায়) দখল করবে না? কে জানে ধনে-মানে-জ্ঞানে এ দেশের মানুষই পথ দেখাবে না বাদ বাকি সব্বাইকে? তাই তো বাউলের ভাষায় আমিও বলি- এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে। এই দিনেরে নিয়া যাবো সেই দিনের কাছে!

নিউইয়র্ক, ২৮ ডিসেম্বর ২০১২