ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এক
১৯৭৯ সালের গ্রীষ্ম কাল। পেনসিলভানিয়ার সচ্চল এলাকার এক দুপুর। ডনা গিলবার্ট উচ্চ মাধ্যমিক লেখাপড়া শেষ করে মেডিক্যাল সেন্টারে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। পার্কিং লটে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা-বাবা। সচ্চল মা-বাবার একমাত্র সন্তান ডনা সেদিন ‘সেক্রেটারি’ পদের চাকরিটি পেয়েও গেল।

ঝাঁকড়া সোনালী চুলো একহারা গড়নের ১৯ বছরের তন্বী হাসিমুখো ডনা’র জীবনের প্রথম চাকরি এটি। চাকরির প্রথম দিনেই পাখির ডানা মেলে অফিসের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানো। ঠোঁটে হালকা লিপ্সটিকের ছোঁয়া। ডনাকে অভ্যর্থনা জানাতে তার ডেস্কের সামনে আনত সবাই। এমনকি ডা গোলাম হাবিবও।

৪৩ বছরের খ্যাতনামা ইউরোলজিস্ট গোলাম ভারতের গুজরাট থেকে লেখাপড়া করতে আমেরিকায় আসেন প্রায় কুড়ি বছর আগে। এই কুড়ি বছরে কস্টকর ডাক্তারি পড়া শেষ করে রেসিডেন্সি করেছেন, আর নিজের ব্রতচারী সেবকের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। পেনসিলভানিয়ার এই উঠতি এলাকায় গোলামকে এক নামে সবাই চেনেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাদা এলাকার সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের কাছে গোলাম যেন সাক্ষাত দেবতা। যে কোন মানুষের প্রতি তার মমতাভরা আগ্রহ যেন সব কস্ট ভুলিয়ে দেয়।

সৌখিন মানুষ গোলামের কী নেই? প্রাসাদোপম বাড়ি, জাগুয়ার স্পোর্টস কার, নিয়মিত পানশালা আর বৈকালিক আড্ডায় মেতে ওঠার মতো কাড়ি-কাড়ি টাকা! দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কারনে গোলামের হৃদয়টি বড় ফাঁকা। প্রেম পেতে আর প্রেম দিতে গোলামের প্রাণ আনচান করে। ২৪ বছরের ব্যবধান, তাতে কী। ডনাকে এক নজর দেখে ভাল লেগে যায় গোলামের। নিজের মেয়ের মতো ডনার কাঁধে, পিটে হাত রেখে কথা বলেন। অনুরাগে সিক্ত হন দুজনেই। অফিস শেষে এক সঙ্গে রেস্তোরাঁ পানশালায় যান। অধিকাংশ ভারতীয়ের মতো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার পছন্দ করেন না গোলাম। পকেট থেকে পঞ্চাশ-একশ’ ডলারের বান্ডিল থেকেই বিল পরিশোধ করেন।

দুই
ডনা জন্ম থেকেই বাবা-মা’র আদরে বড়। পুরুষ বলতে সে তার বাবাকেই চেনে। ‘বাবার মেয়ে’ বলতে যা বোঝায় ডনা তাই। এ জাতীয় মেয়েদের সমস্যা হলো তারা বাবা’র মতো কাউকেই জীবন সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে। সব আদর-আব্দার মেটানোর জন্য বাবার বয়সীকেই সচ্ছন্দে বেছে নেয়।

গোলাম-ডনা’র প্রেম এলাকার সবার জানা হয়ে গেছে। ডনা’র বান্ধবী কেউ ঈর্ষায় কাতর, কেউবা মুখ টিপে হাঁসে। এলাকার আঠারো পেরোনো উঠতি ছোকরা’রা দূর থেকে সুন্দরী ডনা’র জন্য হায় আফসোস করে। গোলাম যখন নিজে ডনাকে তার গাড়িতে করে রাইড দিয়ে বাসা পর্যন্ত পৌছে দেন জানালা’র আরশী’র আড়ালে দাঁড়িয়ে মা তাকিয়ে থাকেন, আর ভাবেন ‘কী বিনয়ী বস!’

গোলাম চমকে ভরে রাখেন ডনা’র প্রতিদিন। আজ হীরের গহনা সেট তো কাল ভিক্টরিয়া সিক্রেটস’এর দামী পারফিউম। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাবার পর একদিন ডনার ডেস্কে ছুঁড়ে দিলেন সে সময়ের সাড়ে সতেরো হাজার ডলারে কেনা লাল মাস্তাং স্পোর্টস কারের চাবি। এ যেন স্বপ্নের চাবি হাতে পাওয়া।

উদ্যাম আমেরিকান সমাজে আঠারো বছর বয়সের পর কেউ কারো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে আপত্তি দূরের কথা মন্তব্যও করে না। লাল মাস্তাং চালিয়ে ডনা যেদিন বাড়িতে এলো, রাতের ডিনারে টেবিলে বাবা-মা ডনার দিকে তাকিয়ে কেবল মৃদু হাসলেন। মাথা নীচু করে ডনা জানিয়ে দিল নিজের স্বপ্নের পুরুষটিকে পছন্দের কথা।

গোলাম নিয়মিত পানশালায় যাচ্ছে ডনাকে নিয়ে। আবার শুক্রবার জুমা’র নামাজেও। মসজিদে তার দেশি-বিদেশী মুসলিম বন্ধু-সুহ্রিদ জানতে চাইল- গোলাম কেন তার কর্মকাণ্ডকে ‘হালাল’ করছেন না? অর্থাৎ মেয়েটিকে কেন বিয়ে করে ঘরে তুলছেন না? গোলাম যেন জীবনে এই প্রথম হারাম-হালালের ফাঁপরে পড়ে গেল। তাইতো! তার ভারতীয় মুসলিম সমাজে এভাবে বিবাহপূর্ব সহবাস হারাম! আর তার তো বিয়ে করার বয়স হয়েছে অন্তত দুই দশক আগে।
এক সন্ধ্যায় গোলাম রেস্তোরাঁয় দাওয়াত দিল ডনা’র মা-বাবাকে। শ্যাম্পেনের গ্লাস ঠোকাঠোকির পর হাসতে হাসতে ডনা মাথা এলিয়ে দেয় গোলামের ঘাড়ে। কোন ছুতোয় গোলাম-ডনার গাড় গভীর চুম্বন দেখে মা-বাবারও আহলাদ বেড়ে যায়। তারাও পরস্পরকে চুম্বন করে জানিয়ে দিলেন ‘উই উইশ ইউ হ্যাপি লাইফ’।

তিন
আলো আধারির খেলায় মানুষ এখানে ভুলে যায় সব পার্থিব বাস্তবতা। খাওয়া শেষে দুটো বাঁধানো প্যাকেটের উপহার মা-বাবা’র হাতে তুলে দিলেন বিনয়ের অবতার গোলাম। ডনা’র বাবা-মা চলে গেলেন নিজেদের বাড়িতে। আর ডনা-গোলাম একটি লিমোজিন ডেকে চলে গেলেন সেই ফাঁকা প্রাসাদে। যে প্রাসাদটি প্রায় বছর দশেক খালি পড়ে থেকে যেন অপেক্ষা করছিল ডনা’র জন্যই।

আজ একটু বেশিই পানাহার হয়ে গেল। ডনা’র কোমর জড়িয়ে গোলাম হেঁটে যাচ্ছে তার শয়ন কক্ষের দিকে। প্রিয় অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের ছবি কোনটিই বাদ যায়নি গোলামের। আজ নিজেকে মনে হচ্ছে বচ্চন, আর সঙ্গিনীটি যেন শ্রীদেবী। বয়সের ব্যবধান যাই হউক, তাতে কী? পরিচালকের কল্যানে মুভিটি তার পরিণতি পাবেই!

প্রায় তিরিশ ফুট সিলিং থেকে ঝুলানো দশ ফুট ব্যাসের শ্যাণ্ডেলিয়ারের নীচে দিয়ে হল রুমটি অতিক্রমের সময় ডনার চোখ ছানাবড়া। কোনমতে টাল সামলে চুমোয় চুমোয় বিভোর করে তুলে গোলামকে। এমনটি তার সপ্নে ছিল। বাস্তবে হবে, কোনদিন তা ভাবেনি।

গোলাম-ডনা’র বিয়ে হলো মুসলিম এবং খ্রীস্ট দুই মতেই। দুজনেই পরস্পরের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। আবার কিছু সার্বজনীন আমেরিকান উৎসবকে নিজেদের করে নিয়েছে। সাধ্যমত ডনা জেনে নিল গুজরাটী রন্ধণ প্রণালী। বন্ধু প্রিয় দুজনেই বাড়িতে দাওয়াত করে ভারতীয় রেসিপিতে মানুষকে আপ্যায়ণ করে। ডানা মেলে বাড়িময় ঘুরে বেড়ায় ডনা।

ডনা পড়ুয়া মেয়ে। তার উপর গোলামের নিবিড় আগ্রহ। প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলার খরচ করে, তিন বছরে ডনা নার্সিং এর সার্টিফিকেট নিল। টাকা খরচেই গোলামের আনন্দ। এ যেন হায়দরাবাদের নিজাম। ‘নিজামী’র অতীত জেনে নিজেকে ‘নিজাম’ ভাবতে অভ্যস্থ। যেমন পুরনো ঢাকার অধিকাংশ বাসিন্দা নিজেদের নবাবের বংশধর ভাবতেই অভ্যস্থ।

ডনা চাকরি করে একই মেডিক্যাল সেন্টারে পেশাদার নার্স হিসেবে। গোলামের কাজে সাহায্য করে। মেয়ের মন। গোলাম কখনো তার রোগীনীর গায়ে হাত দিলে ডনা’র হৃদপিণ্ডে ঠোকা পড়ে। গোলামের প্রতি ভালবাসায় ছেদ পড়তে পারে আশংকায় এক সময় ডনা সেন্টারের কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতেই বসে থাকে। বাড়িতেও সময় কাটে না। পরে চাকরি নেয় আরেকটি মেডিক্যাল সেন্টারে।

চার
একটি সন্তানের জন্য কাঙ্গাল হয়ে পড়ে ডনা। কিন্তু গোলাম কোন সন্তান চায় না। এ কথা স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে ডনাকে। অথচ কী আশ্চর্য, এই উম্নুক্ত আমেরিকান সমাজে ডনা অন্য কোন পুরুষের ধার ধারে না। গোলামকে নিয়েই পড়ে থাকতে চায়। এদিকে গোলাম কখনো রাত করে ঘরে ফেরে। সন্দেহের জাল ঘনীভূত হয় ডনা’র চারপাশে।

এক সময় ডনা’র মারাত্মক পিটের ব্যাথা অনুভূত হয়। ব্যথা নাশকে আকৃষ্ট হতে হতে ‘নারকোটিক্স’-এর দরজায় টোকা দেয়। একদিন নারকোটিক্স চুরি করতে যেয়ে পুলিশে ধরা পড়ে ডনা, হাতকড়া পরে হাজতবাসী হয়। খবর পেয়ে ছুটে আসে গোলাম। হাজত থেকে কুড়ি হাজার ডলারের জামিনে ছুটিয়ে আনে ডনাকে।

মাদক মুক্তির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ডনাকে ভর্তি করা হয় ‘রিহ্যাবে’। কয়েক সপ্তাহের অবস্থানে রিহ্যাবে পরিচয় হয় চব্বিশ বছর বয়েসী ড্রাগ ডীলার ব্রাডফোর্ডের সঙ্গে। রিহ্যাবেও গোপনে ড্রাগের কেনা বেচা চলে। সৌখিন সেবীও রিহ্যাবে গিয়ে পাকা সেবীতে পরিণত হয় বলে অভিযোগ আছে। আমাদের দেশে যেমন সৌখিন অপরাধী কারাবাসের পর পাকা অপরাধী হিসেবে বেড়িয়ে আসে?

সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনে ডনা’র প্রতি গোলামের ভালবাসা ও বিশ্বাসে মোটেও ঘাটতি নেই। তাইতো গোলাম রাতেও ঘরে ফেরেন। কারো প্রতি যদি গোলামের কোন পরকীয়া দানা বাঁধেও, ডনা’র তা অজানা। সম্ভবত অধিকাংশ মধ্য বয়সী পুরুষ এ ভুলটিই করেন। শরীরে যখন ‘বিএমআরই’ করার প্রয়োজন, তখনই তারা জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। আর স্ত্রী যদি যৌবনা হন, তাহলে তো কারখানাটিকে ‘অবসিলিট’ ঘোষণা ছাড়া উপায় থাকে না। ডনা’ও বসে নেই। এর মধ্যে গোপনে ড্রাগ কেনা বেচার সূত্রে ব্রাডফোর্ডের সঙ্গে ডনার বেশ কয়েক বার ‘ডেটিং’ও হয়ে গেছে। বসন্ত আর শীতের পার্থক্যও বুঝে গেছে ডনা। কিন্তু কেউই কারো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ের ত্রিসীমানা মাড়ায় না।

ইতোমধ্যে গুজরাট থেকে গোলামের ভাগ্নে ফারুক এসেছে আমেরিকায় ডাক্তারি পড়তে। ডনা আমেরিকায় পড়া এবং চলাফেরার সব কায়দা কানুন শিখিয়ে দিয়েছে ফারুককে নিজের সন্তানের মতো। এই প্রথম যেন মাতৃত্ব অনুভব করলো ডনা। ফারুক যেদিন বাড়ি ছেড়ে মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির ডর্মের উদ্দেশে রওয়ানা দিল, ডনা’র সেদিন হৃদয় চিড়ে কান্নার জোয়ার বইল।

ডনার যেন আর দিন কাটে না। এর মধ্যে একদিন ডনা’র প্রেমময় বাবাটির’ও মৃত্যু ঘটলো। এই প্রাসাদ আর প্রাবল্যের বিশ্ব সংসারে গোলাম ছাড়া ডনা’র আর কেউ নেই! কিন্তু গোলামও যেন এখন এক অজানা পুরুষ! ডনা এখন ৪১-এর ভরা যৌবনা। আর গোলাম ৬৫-এর খানিকটা নেতিয়ে পড়া ভারতীয় গোবিন্দ।

পাঁচ
২০০৫ সালের মে’ বসন্তের এক সকালে পাশের রাজ্যের মিশিগান লেকের উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়লো গোলাম পরিবার। মিশিগান লেকের উপর প্যারাস্যুট রাইডিং, বোটিং করে কাটালো। বিকেলে রিসোর্ট ছেড়ে রওয়ানা দিল। জাগুয়ারটি ড্রাইভ করছিল গোলাম। পেছনের সীটে ডনা’র মা। ডনা’র জন্য পানির বোতল কিনতে গাড়িটি থামালো ওয়াহায়ো টার্ণ পাইকের কাছে একটি গ্যাস ষ্টেশনে। ফিরে এসে দেখে ডনা বসে আছে ড্রাইভিং সীটে। বাকি পথটা ড্রাইভ করতে চায় ডনা, সেটা অবশ্য আগেই সে বলেছিল। ড্রাইভের কয়েক মাইলের মধ্যে ডনা বলল- চাকায় যেন কিছু একটা আটকে গেছে। গাড়িটি থামাতে চায় ওহায়ো টার্নপাইকের কাছাকাছি আরেকটি গ্যাস ষ্টেশনে।

গাড়িটি যেই গ্যাস স্টেশনের পার্কিং লটে ঢুকল, ওমনি পেছনে আরেকটি পিক আপ ভ্যান এসে থামলো। গোলাম যেই দরোজা খুলে গাড়ি থেকে বের হতে চাইল, অমনি পিস্তল হাতে ছুটে এলো এক ছোকরা ‘ডাকাত’। সাধারণত ওয়ালেট দিয়ে দিলে সশস্ত্র ডাকাত চলে যায়। কিন্তু ওয়ালেট হাতে দেয়ার পরও ডাকাতটি মাত্র দেড় হাত দূর থেকে মাথা বরাবর গুলি করলো গোলামকে। ডনা ৯১১ কল করে ত্বরিতে এম্বুলেন্স আনালো। আধা ঘন্টার মধ্যে চলে এলো ফারুকও। কিন্তু এর মধ্যে হত্যাকারী উধাও। ফারুক যখন এম্বুলেন্সের ভেতরে, ততক্ষণে গোলামের প্রাণ বায়ু বেড়িয়ে গেছে। ব্যর্থ হলো ইমারজেন্সি মেডিক্যালের প্যারামেডিকস’রা। এমনকি ডনাও তার নার্সিং পেশায় শেখা সব কায়দা প্রয়োগ করে বাচাতে পারলো না। ডনা’র মার আর্ত চিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে এলো।

গোলামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হলো মুসলিম ধর্ম মতেই। আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢেকে ডনাও হাজির হল। কিন্তু সমাধি পর্যন্ত যেতে পারলো না শারিরীক অক্ষমতার কারনে। পুরো পেন্সিলভানিয়া জুড়ে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধিক্কার নিক্ষিপ্ত হল খুনী এখনো গ্রেফতার না হওয়ায়। সাত দিনের মাথায় স্থানীয় সব টিভি চ্যানেলে ডনা কান্না জড়ানো কন্ঠে আবেদন জানালো খুনিকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য প্রত্যক্ষ সাক্ষ্মীর। কিন্তু সে কালো সন্ধ্যায় সাক্ষ্মী কেবল ডনা আর তার মা। কিছুই তাদের মনে নেই। অন্ধকারে সব আবছা। কেবল ডনা’র মায়ের মনে আছে গুলি করার সময় ড্রাইভিং সীটে বসা ডনা উচ্চারণ করেছিল- ‘ওহ ব্রাডি’ ধরণের কিছু। কিন্তু এটাও এখন সে বলতে ভুলে গেছে।

কোন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায় না। তবে পুলিশ তক্কে-তক্কে থাকে। নজরদারীতে রাখে ডনাকে। পুলিশের তদন্তে ধরা পড়লো মাস খানেকের মধ্যে ডনা টেলিফোনে কেবল কথা বললো ব্রাডি নামের রিহ্যাব ফেরত এক তরুনের সঙ্গে। ‘লাভ ইউ হানি’ ধরণের বাক্য ছাড়া তেমন কোন সংলাপ পেল না। তরুণটির পেছনের ইতিহাস ঘেটে পুলিশ জানতে পারলো অবৈধ অস্ত্র এবং মাদক রাখার দায়ে ব্রাডি ইতোমধ্যে জেল খাটা।

কিন্তু অপরাধী সনাক্তের জন্য এটাই যথেস্ট নয়। একদিন গোপনে পুলিশ হানা দেয় ব্রাডির এপার্টমেন্টে। ড্রয়ারে পাওয়া গেল ১৯টি পঞ্চাশ ডলারের নোট আর রক্তমাখা সার্ট। ফিনকি রক্তের ফোঁটা ফুল হাতা সার্টের হাতায়। এখন ব্রাডিও পুলিশের নজরদারীতে। কিন্তু গ্রেফতারের জন্য ব্রাডির মুখ থেকে হত্যার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু শুনতে চায় পুলিশ। একদিন টেলিফোন সংলাপে ডনা সেই বীভৎস বিকেলের কথা স্মরণ করে। ব্রাডির স্বগতোক্তি- ডনাকে পাওয়ার জন্য সে সব করতে পারে।

ব্রাডি গ্রেফতার হয়। সঙ্গে ডনা’ও। ২০০৭ সালে মামলার রায় হয়। তাতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয় ডনা, আর সাড়ে সতের বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয় ব্রাডি। গোলাম হাবিব মুন্ডা খুব জনপ্রিয়, অকৃতদার, পরপোকারী মানুষ। এলাকার প্রচার মাধ্যমে তিনি পরিচিত ছিলেন মিলিয়নেয়ার ডাক্তার হিসেবে। তার বিশাল ম্যানসন এবং জমির মূল্য তিন মিলিয়ন ডলারের বেশি।

গোলাম হাবিব মোণ্ডা আর হত্যাকারী স্ত্রী ডনা


হন্তারক ব্রাডি

সব সম্ভবের দেশে
ভাগ্য বিড়ম্বিত গোলাম আজ কেবল ইতিহাস। এই আমেরিকায় অর্থ দিয়ে পরিমাপ হয় মানুষের মূল্য। তেমনি জীবন-মৃত্যুও। অর্থ দিয়ে মানুষ এখানে যেমন প্রেম কেনে, তেমনি কেনে বিরহও। আরেকটি তথ্য জানা দরকার- এই আমেরিকায় প্রতিদিন ৩৪ জন নাগরিক নিহত হয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে। ছয় মাসে যে পরিমান মারা যায়, তার পরিমান পুরো ইরাক এবং আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত সৈনিকের চেয়ে বেশি। এ দেশে সাধারন নাগরিকদের কাছে যে পরিমান বৈধ এবং অবৈধ অস্ত্র, তা পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। লোভের সঙ্গে অর্থ এবং অস্ত্রের সম্মিলন ঘটলে যা ঘটতে পারে, তার প্রকাশ এই সত্যিকার ঘটনায়।

নিউইয়র্ক, ৭ জানুয়ারি ২০১৩