ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

দেশের পরিস্থিতি ভাল নেই। রেমিটেন্স এবং গারমেন্টসের কল্যাণে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে না পড়লেও কোনো দিকে আশার বাণী নেই। দেশে আইন শৃঙ্খলা আছে বলে মনে হয় না। ইচ্ছে ছিল এই শীতে প্রবাসের বাঁধন ছিঁড়ে ফিরে যাবো মায়ের কোলে। কিন্তু প্রতিদিনের গুম, অপহরণ আর ছিনতাই-রাহাজানি’র ঘটনায় মনে হয় দেশে নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়ার মতো কেউ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যারা ভীড় করে আছে, তারা তাকে ভুল বোঝাতে ব্যস্ত। এমন কি নিকট অতীতকেও তারা ঢেকে দিতে চায় তোষামোদির চাদরে। প্রধানমন্ত্রী দিবা স্বপ্ন দেখছেন- মানুষ তাকে আবার ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। গত ফেব্রুয়ারিতে সাগর রুনি হত্যার পর এ পর্যন্ত যত অপহরণ, গুম এবং ঠাণ্ডা মাথায় খুনের ঘটনা ঘটেছে, এর একটিরও জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, পুলিশ, প্রশাসন এমনকি র‍্যাবও। মানুষ তাহলে কার কাছে বিচার চাইবে, কে দেবে তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস?

সামাজিক নিরাপত্তা ভেঙ্গে পড়েছে

বাংলাদেশে গর্ব করার মতো ছিল সামাজিক নিরাপত্তা। মানুষ মানুষকে শ্রদ্ধা, সমীহ করতো। নিছক লোভের বশবর্তি হয়ে মানুষ মানুষকে খুন করতো না। আজ আর সে সুবর্ণ দিন নেই। সামান্য লোভে মানুষ মানুষকে খুন করতে দ্বিধা করছে না। সাম্প্রতিক কয়েকটি খুনের ঘটনায় ১৫-২০ বছর বয়েসি খুনে তারকাদের মুখ থেকে যে সব পরিকল্পনার কথা বেড়িয়ে এসেছে, তাতে শিউরে উঠতে হয়! কোথায় চলেছি আমরা?

সামাজিক শাসন ভেঙ্গে পড়া নিয়ে কোন উদ্বেগ চোখে পড়ে না। বরং রাজনৈতিক প্রয়োজনে তরুণদের উস্কে দেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন ক্ষমতাবান, এবং ক্ষমতাহীন উভয়ে। রাজনীতিবিদদের অসংলগ্ন এবং বেপরোয়া আচরনে খোদ আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিতরা পর্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত। এরা কি চাকরি বাঁচাবে, না পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে?

ইলিয়াস আলী, রফিকুল এবং তারও আগে চৌধুরী আলম গুমের ঘটনায় র‍্যাবের নাম এসেছে। কিন্তু এই বাহিনীটির পক্ষ থেকে জনমনের শঙ্কা দূর করার কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। খুনী ধরা পড়া দূরের কথা কোনো পেশাগত দায়িত্বশীলতাও চোখে পড়ে না।

পরিস্থিতি যখন এতোটাই নাজুক, তখন দায়িত্ব নিতে হয় জনগণকে, জনগণের প্রতিষ্ঠানকে। দেশে ‘রাজাকার আলবদর’ প্রশ্নে মানুষ আজ দ্বিধা বিভক্ত। মানুষ মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, কিন্তু একইভাবে অপশাসন চায় না। আমার মতো যারা কস্টার্জিত ডলার দেশে পাঠায়, তারা চায় দেশে স্বজনদের নিরাপত্তা, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিশাপ মুক্ত পরিবেশ। প্রতিটি মানুষ যেন নির্ভয়ে দিন গোজরান করতে পারে। ভূমি দস্যু, জল দস্যু আর চেনা জানা রাজনৈতিক দস্যু যেন মানুষের রুটি-রুজি বিপর্যস্ত করতে না পারে! কিন্তু এর কোন গ্যারান্টি নেই!

অপেক্ষা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের

প্রতিটি সরকার যখন ধরাকে সরা জ্ঞান করে তখনই সব বাঁধন আলগা হতে থাকে। কোন বজ্র আঁটুনিই আর কাজ করে না। সে সুযোগে সব দস্যু নেমে পড়ে মাঠে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে, যেন লুটপাটের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। দেশে ব্যবসায়ী অপহরণ এবং খুনের ঘটনায় মনে হয় ‘মাফিয়া’রা নেমে পড়েছে, এবং তারা যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। সাগর-রুনি থেকে শুরু করে রফিকুল পর্যন্ত প্রতিটি খুনের ঘটনায় মনে হয় মাফিয়াদের একটি শক্তিশালী বলয় দাঁড়িয়ে গেছে। এবং এ বলয় ভেদ করা র‍্যাবের পক্ষেও অসম্ভব!

মানুষ এই অরাজকতা থেকে প্রতিকার পেতে অপেক্ষা করছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ভাবমূর্তি গত কুড়ি বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা কেবল নির্বাচনী দায়িত্ব পালন নয়। দুস্টের দমন, শিষ্টের লালনও। কারন রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার প্রয়োজনে কালো টাকার পাশাপাশি পেশি শক্তির উপরও ভর করে। সাধারণ মানুষ তত্ত্বাবধায়কের কাধে কিছুদিন দেশের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে দিন পার করতে চায়। রাজনৈতিক পীড়ন যত বেশি হয়, আইন শৃঙ্খলার যত বেশি অবনতি হয়, তত্ত্বাবধায়কের মেয়াদ কালও তত দীর্ঘ হয়।

গত তত্ত্বাবধায়ক দুই বছরের মেয়াদে এসেছিল। ধারণা করা যেতে পারে পরবর্তি তত্ত্বাবধায়কের মেয়াদ হবে তিন কি চার বছর। কারন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দলীয়করন এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাত্রা দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না! ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়কের সময় পরবর্তীতে ২০১০ সালে রাজনৈতিক সরকারের সময় দু’বার দেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। এমন অভিজ্ঞতা প্রতিটি দেশবাসীর। বিমান বন্দরে দুর্নীতি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন যাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অরাজকতা ও অব্যবস্থাপনার দৃশ্য চোখে পড়ে তা ঢাকবেন কোন রাজনৈতিক মন্ত্রে?

এই দুর্নীতি, অরাজকতা এবং অপশাসনকে রোধ করতে পারতো যে রাজনৈতিক সমঝোতা, গত চার বছরে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয়নি। এ যদি বলে ডানে, তো ও বলবে বাঁয়ে। জনগণের প্রয়োজনের বিষয়টি গৌণ! তাই তো জাতীয় সংসদ একটি অকেজো এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী হলে জনগণ শক্তিশালী হতো। মানুষকে বিভক্ত এবং দুর্বল করার এই সাঁড়াশী আয়োজন থেকে মানুষ মুক্তি পাবে কবে?

সংবাদপত্র কেন নীরব?

সংবাদ পত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। গণ মাধ্যম চালিকাশক্তিও। কিন্তু সম্ভাব্য বিপর্যয় অবলোকনের জন্য সবাই যেন হাত গুটিয়ে বসে আছে। সংবাদপত্র পারে মানুষকে সংগঠিত করতে। সঠিক সময়ে, যথাযথ ভূমিকা নিয়ে সংবাদপত্রও নেতৃত্ব দিতে পারে মানুষকে। আজ এ রকম একটি ঘটনার কথা বলে এ লেখার ইতি টানবো।

নিউইয়র্কের একটি মধ্যম মানের ট্যাবলয়েড “ডেইলি নিউজ”। আমেরিকার একটি সাংবিধানিক কালো আইনের বিরুদ্ধে গত এক সপ্তাহের অব্যাহত প্রচারণায় পত্রিকাটি ব্যাপক মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে ওবামা প্রশাসনকে সহযোগিতার কাজে নেমেছে তারা। পত্রিকাটির আজকের শিরোনামে তারা বলছে- গতকাল পর্যন্ত তারা ১ লাখ ২৬ হাজার ৯’শ ৫২টি সাক্ষর সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ৯৩,৪০০ জন অনলাইনে, এবং ৩১,৬০০ জন ছাপা কূপন ডাকে পাঠিয়ে।

অনলাইনে সাক্ষরদাতাদের মধ্যে আমিও একজন। তাই সংবাদটি আমারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই পিটিশন তারা সংগ্রহ করেছে সংবাদপত্রের কোনায় একটি কূপনের মাধ্যমে এবং অন লাইনে। মানুষ হোয়াইট হাউজে আবেদন জানিয়েছে- সরকার যেন আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী ১৬ বছরের বেশি যে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারে। ওয়ালমার্ট, কে মার্ট প্রভৃতি চেইন সুপার মার্কেটে আইডি দেখালেই অস্ত্র কেনা যায়। এই অস্ত্র গত ১৪ ডিসেম্বর কেড়ে নিয়েছে সেন্ডি হুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কুড়িটি শিশুসহ ছাব্বিশ জনের প্রাণ!

আমাদের সংবাদ পত্রগুলোও পারে গুম, হত্যার প্রতিবাদে জনমত তৈরি করতে। পারে সাধারন মানুষের আবেদন সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে। প্রতিবাদেও মানুষের মনে সস্থি জাগে, বেদনার ভার হালকা হয়।

নিউইয়র্ক, ১৪ জানুয়ারি ২০১৩