ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মিস্টিরি এট দ্যা মিউজিয়ম

মানব সভ্যতার ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করার উপায় আছে কি? সম্ভবত নেই। আর মানব সভ্যতার মূলে যা কাজ করেছে, তা হলো মানুষের জ্ঞান পিপাসা। ধর্ম বলুন, দর্শন বলুন সবার অস্তিত্বে রয়েছে মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষা। হাজার বছর ধরে মানুষের এই জানার আকাংখাকে মিটিয়ে চলেছে বই। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সাধারণ শিক্ষা আর চিকিৎসার অভাব মেটানোর পাশাপাশি তাই জ্ঞান পিপাসা মেটানোও সভ্যতার অনুষঙ্গ।

যুক্তরাস্ট্রে আসার পর যে ঘটনাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছিল তা হলো, এখানকার পাঠাগার ব্যবস্থা। অবস্থানের ঠিকানা দেখিয়ে যে কোন মানুষ যে কোন পাঠাগার থেকে বিনে পয়সায় বই, ভিডিও, পত্রিকা পাণ্ডুলিপি ঘরে নিয়ে পড়তে পারে। লোকালয়গুলোতে অন্তত দুই মাইলের মধ্যে পাওয়া যায় কমিউনিটি লাইব্রেরি। এসব লাইব্রেরিতে প্রাপ্ত বয়স্ক এবং শিশুদের পৃথক পৃথক আয়েশ করে পড়ার ব্যবস্থা। চার হাজার থেকে দশ হাজার বর্গফুটের এসব লাইব্রেরির সংখ্যা যুক্তরাস্ট্রে ২৬ হাজার ৭’শ ৭১টি। আর জাদুঘরের সংখ্যা রয়েছে সাড়ে সতেরো হাজার।

যুক্তরাষ্ট্রে যে কতো শত বিষয় ও রকমের জাদুঘর রয়েছে তা এখানে না এলে আমার অজানাই থেকে যেত। এখানকার কিছু জাদুঘরে হাটতে হাটতে আমি আমার মানস পটে বাংলাদেশে অনেকগুলো জাদুঘরের অস্তিত্ব এঁকে ফেলেছি। এ নিয়ে শেষে কথা বলবো। আজকের আলোচনার বিষয় ভিন্ন। তা হলো ‘মিস্টিরি এট দ্যা মিউজিয়ম, অর্থাৎ জাদুঘরের ভেতরের কিছু রহস্য। এ নিয়ে ধারাবাহিক টিভি সিরিজ করছেন ট্রাভেল চ্যানেলে ডন ওয়াইল্ডম্যান। আজ তার কয়েকটা উপস্থাপন করবো।

চ্যাং এবং অং

পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া নগরীর কেন্দ্রস্থলে মুটার জাদুঘরটি দান করেছেন ঠমাস মুটার নামে এক ডাক্তার। এটি আসলে মেডিকেল মিউজিয়ম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কৌতূহলী বিষয় এই জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। এখানেই স্থান পেয়েছে চ্যাং এবং অং-এর দেহের যকৃৎ (লিভার)। আর তাদের ব্যবহার্য জিনিশপত্র।

চ্যাং এবং অং জন্মেছিলেন শ্যাম দেশে (আজকের থাইল্যান্ডে) ১৮১১ সালে। এক দরিদ্র জেলে’র ঘরে পেটে জোড়া লাগা জমজ হিসেবে। জন্মের পর গ্রামবাসী তাদের মেরে ফেলতে উদ্যত হয় ভৌতিক কাণ্ড বিবেচনা করে। কিন্তু সে সময় শ্যাম ভ্রমণ রত এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী তাদের কিনে নেন এই আশ্চর্য শিশু দুটিকে প্রদর্শন করে পয়সা কামানোর উদ্দেশে। তবে শর্ত ছিল আঠারো বছর পর তাদেরকে মুক্ত করে দেয়ার।

১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যলিফোর্নিয়া ভ্রমণের সময় তারা সেখানে বসবাসে আগ্রহী হন। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীর হাত থেকে ছাড়া পেয়ে উভয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় ১১১ একর জায়গার উপর বাড়ি ঘর নির্মাণ করে, বাজার থেকে ক্রীতদাস কিনে কৃষিকাজে মনোযোগী হন। ১৮৪৩ সালে তারা দু’টি শ্বেতকায় বোনকে বিয়ে করেন। চারজনের উপযোগী খাটে শোয়ার ব্যবস্থা করেন। দু’জনে একত্রে ২১টি সন্তানের জনক হন। চ্যাং-এর ১০টি এবং অং-এর ১১টি। বিয়ের অল্প কয়েক দিনের মধ্যে তারা পৃথক আরেকটি বাড়ি নির্মাণ করেন। এবং দুটি বাড়িতে দুই ভাই তিন দিন করে অবস্থান করতেন তাদের স্ত্রীর সঙ্গে।
চ্যাং এবং অং জোড়া হলেও তাদের মধ্যে চিন্তা এবং কাজের পার্থক্য ছিল। যেমন চ্যাং মদ্যপান করতেন নিয়মিত। কিন্তু অং তা সহ্য করতে পারতেন না। এ নিয়ে দু ভাইয়ের মধ্যে বিতণ্ডা হয়েছে বহুবার। এমনকি একজন আরেকজনকে চাকু দিয়ে মেরে ফেলারো চেষ্টা করেন। কিন্তু চাকু তাক করেই তারা আবার থেমে গেছেন অজ্ঞাত কারনে। কারন কে কাকে মারবেন?

১৮৭৪ সালের জানুয়ারিতে চ্যাং আক্রান্ত হন নিউমোনিয়ায় এবং এক রাতে মারা যান। সকালে অং-এর ঘুম ভাঙলে চ্যাং-কে ধাক্কা দেন। কিন্তু চ্যাং মৃত। অং ডাকতে থাকেন চ্যাং-এর স্ত্রী এবং সন্তানদের। তারা আসে, এবং অং সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার ডাকেন ভাইয়ের শরীর থেকে তাকে পৃথক করার জন্য। ডাক্তার আসতে কয়েক ঘন্টা বিলম্ব হয়, আর এর মধ্যেই মারা যান অং।

দুই ভাইকে একই সঙ্গে সমাহিত করার আগে তাদের দেহের ময়না তদন্ত হয়। তাতে ধরা পড়ে দু’জনের হৃদপিণ্ডসহ শরীরের অভ্যন্তরীণ সবগুলো ‘অর্গান’ পৃথক হলেও যকৃৎ পৃথক ছিল না। যে কারনে চ্যাং-এর সঙ্গে অং-ও মারা যায়। আর সে সময়ে যকৃৎ পৃথক করার মতো উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল না। কাজেই ঠিক সময়ে ডাক্তার এলেও অং-কে বাঁচানোর কোন সুযোগ ছিল না। ‘সিয়ামিজ টুইন’ নামে মার্ক টোয়েনের একটি ছোট গল্প আছে। এছাড়াও হলিউডে নির্মিত হয়েছে ডকুমেন্টারি।

দুষ্কৃতকারীর চামড়ায় জুতো

ওয়াইল্ড ওয়েস্ট বলে আমেরিকার পশ্চিমাংশের কুখ্যাতি আছে। তারই একটি নমুনা ওয়াহিও’র কার্বন কাউন্টি জাদুঘরে। ১৮৭০ সালের দিকে আমেরিকায় রেলপথ স্থাপনের বছর দশেক পরের ঘটনা। দুই দুষ্কৃতকারী স্থানীয় রেলপথের ফিশ প্যালেট খুলে রেলগাড়ি উলটে দিতে গিয়ে পুলিশের নজরদারিতে পড়ে। পুলিশ তাদের খুঁজতে গেলে তারা পিস্তলের গুলিতে দুই পুলিশ সদস্যকেও হত্যা করে। এর বছর দুয়েক পর তাদের একজন ধরা পড়ে। আর বছর দশেক পর ধরা পড়ে প্যারট জর্জ (অথবা বিগ নোজ জর্জ) আরেকটি হত্যাকাণ্ডের সুবাদে। প্যারট জর্জকে কয়েদ করা হয়।

স্থানীয় গারদ থেকে পালিয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কায় অধিবাসীরা রাতের অন্ধকারে তাকে গারদ থেকে নিয়ে যায়। এবং টেলিগ্রাফের তার গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। সকালে স্থানীয় একমাত্র ডাক্তার টি জি ম্যাগে মরদেহটি নিয়ে যান দুষ্কৃতকারীর মগজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন বলে। কিন্তু মগজ পরীক্ষার বদলে ডাক্তার এর চামড়া কেটে কয়েক দিনের মধ্যে জুতো তৈরি করেন। তবে এ জুতো তৈরির বিষয়টি তিনি একটি কাগজে লেখে বোতলের মধ্যে রেখে যান। তার মৃত্যুর পর এটি আবিষ্কার হয়। তবে জুতো জোড়া এখনো প্রদর্শিত হচ্ছে সে জাদুঘরে।

জাদুঘরঃ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

আমাদের ষোল কোটির দেশে জাদুঘরের সংখ্যা হাতে গোণা। বাংলাদেশের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। আমাদের ন্যূনতম প্রয়োজনের অনেকটাই মিটেছে। আমরা বিদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্রও কিনছি। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে, মানুষকে সচেতন ও সয়ম্ভর করে তোলার জন্য আমরা কতোটা ব্যয় করছি? আমাদের অতীত অনেক বর্ণাঢ্য। বাঙালী জাতি একদিনে বেড়ে উঠেনি। হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য আমরা কতোটা যত্নবান?
আমরা এটা ওটা নিয়ে অনেক বেশি বিতর্কে মগ্ন। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার এবং স্থানীয় ভিত্তিতে জাদুঘর গড়ে তোলার ব্যাপারে আমরা যদি এখনি সজাগ না হই, তাহলে আমাদের অতীত হারিয়ে যাবে ধুলির আস্তরণে!

ঢাকা শহরে এখন কোটিপতির সংখ্যা কয়েক লক্ষ। আমরা কি পারি না প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ফ্রি পাঠাগার গড়ে তুলতে। মানুষকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠিত না করলে মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়বে কিভাবে? যে কিশোর-তরুণটিকে আমরা মন্দ কাজে নিরুতসাহিত করি, সাজা দেই, তাকে ভাল পথে নিয়ে আসার জন্য আমরা কি করেছি?

গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে যে কিছু হয়নি তা নয়। আক্কু চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়েছে। শেখ হাসিনার গত আমলে ভাষা জাদুঘরও হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রতিটি জেলা শহরে কি একটি করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হতে পারে না? আমাদের প্রতিটি জেলা শহরের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে পৃথক জাদুঘর কি হতে পারে না? এসব পদক্ষেপে কি বিত্তবানরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন?

দুটি জাদুঘর করা আমাদের দেশে এখনি প্রয়োজন। এর একটি ‘নদী জাদুঘর’। আরেকটি ‘শিল্প জাদুঘর’। অসংখ্য নদ-নদীর এই বাংলাদেশে বহু নদী নানা কারনে বিখ্যাত। অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে। এসব নদীর তীরে হাজার বছরের পরিক্রমায় বহু সভ্যতার জন্ম হয়েছে। তিব্বতের মানস সরোবর থেকে নির্গত হয়ে সাংপু নদী ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে চীন ভারতের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কিভাবে পদ্মা মেঘনার স্রোতধারা হয়ে বঙ্গপোসাগরে মিলিত হলো, এর বর্ণনা আমাদের তরুণ-কিশোরদের প্রত্যক্ষভাবে প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে। এই নদ-নদীর সঙ্গে আমাদের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসও যুক্ত। নিউইয়র্কে মাত্র এক’শ মাইলের দীর্ঘ ‘হাডসন রিভার মিউজিয়ম’ দেখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে একটি নদী মিউজিয়ম করা আমাদের কত জরুরি!

আমাদের ‘শিল্প জাদুঘরে’ থাকতে পারে আদমজীর মতো বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠানের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী। আবার থাকতে পারে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল শিল্পের উত্থানের কাহিনী। থাকতে পারে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে আমাদের বড় লোক হয়ে উঠার কাহিনী!

রাজনীতিসহ ইত্যাকার বড় বড় কাজের জন্য আমরা অনেক বেশি মরিয়া। ভারতীয় নর্তকীদের নৃত্য দেখার জন্য লাখ টাকা দামের টিকেট কিনতে আমরা কার্পন্য করি না। কিন্তু অনেক ছোট ছোট কাজও যে আমাদের সমাজে শান্তি ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে পারে, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি?

নিউইয়র্ক, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩