ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

যে বিচারের দাবী নিয়ে তুমি কেঁদেছিলে দ্বারে-দ্বারে সে বাণী আজ পৌঁছে গেছে গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে। মানুষ আজ জেগেছে, বিচারের দাবি নিয়ে ফুঁসে উঠেছে। একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদরদের বিচার চাই। যারা সেদিন আমার দেশকে অঙ্গারে পরিণত করেছিল, বেয়নেটের খোঁচায় জন্তু জানোয়ারের মতো হত্যা করেছিল স্বাধীন বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে পুরো দেশ আজ সোচ্চার। শত্রুর বারুদের স্তূপে অগ্নি প্রজ্জলন করে হায়েনার বংশ নিপাত করে দিতে প্রস্তুত বাংলার মানুষ।

১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে বাংলাদেশের বিপরীত যাত্রা শুরু হয়েছিল, সে যাত্রার গতি রোধ করে দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। এই গতি রোধের সম্মুখ কাতারে যে নারী বুকে পাথর বেঁধে সন্তান হত্যার বিচার দাবি করেছিলেন তিনিই আমাদের জননী, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

’৯১ এর শুরুতে আমার সাংবাদিকতার শুরু স্বৈরাচার পতনের অব্যাবহিত পর। ঠিক একই সময় শুরু হয় বাংলার জারজ সন্তান জামাত-শিবিরের আলখেল্লাধারী রাজাকার আলবদরদের বিচার দাবির আন্দোলন। ১৯৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হলে শহীদ ক্যাপ্টেন রুমি’র মা অধাপিকা জাহানারা ইমাম হন এর আহবায়ক। জামাতে ইসলামী এবং তার পত্রিকা সংগ্রাম এই আন্দোলনকে প্রহসন করে বলতো ‘ঘাদানিক’।

বেশ কিছু তরুণ সাংবাদিক সে সময় নির্মূল কমিটির সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য যেতেন অধ্যাপিকা জাহানারা ইমামের ইলিফেন্ট রোডের বাসায়। আসিফ নজরুল, ফজলুল বারী, জাহিদ নেওয়াজ, আমান উদ-দৌলাসহ অনেকে। আমিও গিয়েছি কয়েক বার। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনার প্রথমটি ছিল চট্টগ্রামে লালদীঘি ময়দানে তার বিশাল জনসভা এবং পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সামনে স্থাপিত গণ আদালত।

মুখে কর্কট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় অধ্যাপিকা জাহানারা ইমাম স্পষ্ট করে কথা বলতে পারতেন না। মুখ খুললেই বের হতো লালার স্রোত। কিন্তু এই মারাত্মক ব্যধি নিয়েও বাংলাদেশের প্রান্ত থেকে প্রান্তে চষে বেরিয়েছেন এ নির্ভিক জননী। তার মুখের দিকে তাকালে এক রাশ বেদনা এবং প্রত্যয়ে সিক্ত হতো যে কোন তরুণ মন।

যারা রুমি’র মতো অসংখ্য মুক্তি পাগল মানুষকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদের ক্ষমা করা মানে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা! চট্টগ্রাম থেকে সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে যে সংবাদটি পাঠিয়েছিলাম, তাতে প্রথম তাকে আমি উল্লেখ করেছিলাম “শহীদ জননী” হিসেবে।

আশ্চর্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী এই মহিলা অল্প কয়েক দিনের মধ্যে আন্দোলনকে নিয়ে গেলেন একেবারে তুঙ্গে। এই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে আশ্রয় করে অনেকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলেও তৎপর হয়। কিন্তু শহীদ জননীর ত্যাগ আর সঙ্কল্পের কাছে সব ভেসে যায় তৃণের মতো। সেদিন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপি’র মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতা কর্মী এসে ভীড় করেছিলেন গণ আদালতে। কারন রাজনীতি সচেতন মাত্রই জানেন “মীরজাফর” কখনো মিত্র হতে পারে না।

এই রাজাকার-আলবদরদের নব্য সংস্করণ ইসলামী ছাত্র শিবির সম্পর্কে আমার জীবনে হাড় কষ্টে উপার্জিত অভিজ্ঞতা আছে। কি করে এরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে জিম্মি করে হাজার হাজার ছাত্রের শিক্ষা জীবনকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছিল, তা ভূক্তভোগী মাত্রই জানেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে এ সংক্রান্ত একটি লেখা ছিল- “বিশ্ববিদ্যালয় না জেলখানা” শিরোনামে।

তখনই আশঙ্কা করেছিলাম- বাংলাদেশ এক অবধারিত সঙ্ঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু সঙ্ঘাতকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তাদের হাতে দেশের মানুষের জীবন কখনো নিরাপদ নয়। অথচ কি দূর্ভাগ্যের বিষয়- এই অপরাজনীতির হাত ধরেই জামাত-শবির আজ অর্থ-বিত্ত ও সংগঠনে মহীরূহে পরীনত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হরতাল-অবরোধ-যানবাহনে আগুণ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আক্রমণের মাধ্যমে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

দশ-বারো বছর আগেও ফেব্রুয়ারি, মার্চ মাসে জামাত-শিবির লেজ গুটিয়ে বসে থাকতো। অথচ আজ এই ফেব্রুয়ারি মাসেও তারা শক্তি প্রদর্শনের ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। তারা মনে করেছে বর্তমান প্রজন্ম বাঙালীর মহান আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস ভুলে গেছে। মাফিয়া অর্থনীতির যে রাজনীতিতে মানুষ ক্রমে অভ্যস্থ হয়ে উঠছে, জামাত-শিবির মনে করেছে এটাই বোধ হয় বাংলাদেশের নিয়তি।

সবাই যার যার মতো কুড়িয়ে, লুটে নিয়ে আখের গোছাবার তালে মত্ত! সম্ভবত এখানেই তারা ভুল করেছে। অর্থ-বিত্ত কুড়ানোর হাজারো গলি-চোরাগলি’র আজ এক মোহনা- “শাহবাগ”। আর এই শাহবাগ রচনা করেছে এ প্রজন্মের তরুণ ব্লগার, আর ফেইসবুকিরা। এরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অহংকার। এদের রক্তে প্রবাহমান শহীদের রক্ত। এ রক্ত কোনোদিন পরাভব মানে না! এই তেজি প্রজন্মটিকে চিনতে ভুল করেছে জামাত-শিবির।

ফেইসবুক-ব্লগে

গত দু’দিন থেকে মনটা বড়ো অস্থির। তাপ মাত্রা যখন হিমাঙ্কের নীচে, গভীর রাতে গলা থেকে স্ত্রীর হাতটি আলগা করে ছুটে আসি কম্পিউটারে। সর্বশেষ কী ঘটছে শাহবাগে, বাংলাদেশে! কাল লন্ডনের একটি বাংলা বেতারে সংবাদ পেলাম, সেখনকার বাঙালীরা এই প্রথম মিছিল, মানব বন্ধন করবেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাসি দাবিতে।

নিউইয়র্কের বাঙালীরা জ্যাকসন হাইটসে সমাবেশ, মানব বন্ধন করছেন। জাতিসঙ্ঘ সদর দপ্তরের সামনেও সমাবেশ করে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরবেন বাংলাদেশের এই প্রজন্মের মুক্তিযদ্ধের আরেকটি কাহিনী। ইতিহাসের এই কালিমা মুক্তি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে গৌরব আর ত্যাগের!

ফেইসবুকে সচিত্র-সংবাদঃ বিয়ানী বাজার, মুক্তাগাছা, লাঙ্গলবন্দ, ঝিকর গাছা কোথাও তরুণ প্রজন্ম আর ঘরে বসে নেই। বেড়িয়ে পড়েছে মুক্তির মশাল হাতে নিয়ে। বাংলাদেশের এ মুক্তি সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাট, দুর্নীতি আর অপশাসনের বিরুদ্ধে। এ সংগ্রামের পথ ধরেই বেড়িয়ে আসবে আমাদের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব।

নিউইয়র্ক, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩