ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

অনেকে মনে করেছিলেন কালো টাকা আর অপরাজনীতির কাছে বাংলাদেশ জিম্মি হয়ে গেছে! বাংলাদেশে বুঝি মাথা তুলে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। সবাই যেন ক্রিকেট খেলার দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে। দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের সেঞ্চুরি দেখে হাততালি দেয়াই যেন এই দর্শকের একমাত্র কাজ! কিন্তু তা নয়। শাহবাগ বদলে দিয়েছে দৃশ্যপট।

শাহবাগের আওয়াজ যারা এখনো শুনতে পাননি, তাদের কাছে অনুরোধ কান পেতে শুনুন। পল্টন নয়, নয়া পল্টনও নয়, নয় প্রেস ক্লাব কিংবা নূর হোসেন স্কোয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় যাদুঘরের পাশে বোহেমিয়ান অথবা সৃষ্টিশীল তরুণদের আড্ডা’র শাহবাগ। এরা কারো খায় না, কারো পরে না। চাঁদা তুলে না, ধাপ্পাবাজী করে না। এদের আওয়াজ তাই গগণ বিদারি। এদের জোয়ার তাই গণজোয়ার। এদের আওয়াজ না শুনে যদি এখনো বধির থাকেন, উপযুক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা নিন! আর শুনুন এই তরুন যুবারা কি বলছে!

এই আমার পাশে ‘উড স্টক’ নামে একটি গ্রাম বিখ্যাত হয়ে আছে পুরো আমেরিকায়। ১৯৬৯ সালের আগস্টের মাঝামঝি এই গ্রামের উন্মুক্ত মাঠে জমায়েত হয়েছিল পাঁচ লক্ষাধিক তরুণ যুবক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমিতে, যুদ্ধ বিরোধী আমেরিকা মুক্তির পথ খুঁজছিল। এই উড স্টক তাদের সেই মুক্তির পতাকা উড়িয়েছিল। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এ উৎসবে জড়ো হয়েছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত সব অভিনেতা অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকা। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে উপস্থিত হয়েছিলেন বিখ্যাত সেতারবাদক, আমাদের পণ্ডিত রবি শঙ্করও। গাছ কেটে জড়ো করার মাঠটি এখনো আইকন হয়ে আছে যুদ্ধবিরোধী শ্লোগান নিয়ে। উডস্টকের শ্লোগান সম্বলিত টি শার্ট পরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এখনো বহু মানুষকে।

আজকের শাহবাগ তাই আমাদের ইতিহাসের মাইল ফলক। আমাদের চেতনা থেকে মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সামান্যতমও মুছে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের অহংকার নিয়ে কেউ ভণ্ডামি করুক, মুক্তিযুদ্ধকে কেউ রাজনীতির বাজারে বিক্রি করুক তা এই নতুন প্রজন্মের কাছে ভণ্ডামির সমতুল্য। আজ যখন ঘরে ঘরে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা জেগে উঠেছে তখন শঙ্কা আর ভয়ের কিছু নেই! অনেক নামী দামী মুক্তিযোদ্ধাও আজ রাজাকারের তালিকায় নাম লেখাতে পারেন। তাতে নব প্রজন্মের এই মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু আসে যায় না!

বাঘা যখন বেড়াল

সম্ভবত হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন, এক সময়ের মুক্তিযোদ্ধা চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নাও থাকতে পারে। কিন্তু এক সময়ের রাজাকার চিরকাল রাজাকার। আজ দেখি বাঘা কাদের সিদ্দিকীও মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। কিছুদিন আগে “মোসাহেবীর ভীড়ে বীরের নির্বাসন” শিরোনামের একটি লেখায় আওয়ামী লীগের প্রতি তার অভিমানের কারন অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলাম। সে সময় অনেক ব্লগার বন্ধু সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন- পদ্মা-মেঘনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। রাজাকারের প্রসাদে সন্তুষ্ট হয়ে অনেকেই রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার বিকল্প পথ খুঁজছেন!

শাহবাগের আন্দোলনে শামিল না হয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বিড়ালে পরিণত হতে পারেন, তাতে কিছু যায় আসে না। বীরের জন্ম হয় বার-বার, প্রতিবার। কাপুরুষ মরে শতবার! এই শাহবাগের তরুণ তরুণীরা ক্ষমতার জন্য গত পাঁচ দিন নাওয়া খাওয়া ভুলে অবস্থান করছে না। তারা অবস্থান করছে বদলাবার জন্য। যে দুর্নীতি, অপশাসন, কালো টাকা এবং পেশি শক্তির নিষ্কণ্টক প্রবাহে মৌলবাদী জামাত-শিবির রাজনীতির দিক নির্দেশকে পরিণত হয়েছে তার গতি উলটে দিতে প্রস্তুত শাহবাগ। শাহবাগের আন্দোলনের স্রোতে ভেসে যাবে এ সব ময়লা আবর্জনা!

নিউইয়র্ক, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩