ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

একবার এক জাগরণ, রেনেসাঁর জন্ম হয়েছিল অবিভক্ত বাংলায়। হিন্দুদের নেতৃত্বে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ভারত উপমহাদেশে। ১৯৫২ সালে বাঙালী মুসলমানের হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তানে যে রেনেসাঁ’র জন্ম হয়েছিল, তা আজ পরিপূর্ণতা পেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়, এই শাহবাগে। এক দল প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, উঁচু মানবিক মূল্যবোধের তরুণদের হাত ধরে বাংলাদেশ আজ জেগে উঠেছে। আমি এই প্রবাসে বসে কান পেতে শুনছি এরই জয়ধ্বনি!

এই রেনেসাঁর বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র বিশ্বে। এর জের ধরে বিশেষত পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে তরুণদের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের পূর্বাভাস শোনা যাচ্ছে। আপোষ করা ছাড়া এই জাগরণ ঠেকাবার কোন শক্তি নেই কোন রাষ্ট্রশক্তির! এই জাগরণ পুরো ভারত উপমহাদেশকে নিয়ে যাবে বিশ্ব মানচিত্রে এক মর্যাদার আসনে। মেধা-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, একই সঙ্গে সমাজের পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর বিকাশে এই নবজাগরণ অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে!

প্রাক কথা

রাজা রাম মোহন রায়কে বলা হয় ভারত মাতার শ্রেষ্ঠ সন্তান। যিনি মাত্র কয়েক জন সাথী নিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বাংলায়, পরে ভারত জুড়ে। রাম মোহনের কুড়ি বছর বয়েস, অর্থাৎ ১৭৯২ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু অবধি ১৯৪১ সাল পর্যন্ত এই সময়কালকে বলা হয় বাংলার রেনেসাঁ। এই রেনেসাঁর সূত্রে আমরা পেয়েছি বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্র, নজরুল, শরৎচন্দ্র আর জীবনাননন্দকে। এর পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে যত কবি, সাহিত্যক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার কিংবা সংগীতকার, চিত্রকর আমরা পেয়েছি তাদের উপরও ছিল বাংলার রেনেসাঁ’র প্রভাব।

রাজা রাম মোহনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে যে বাঁধাগুলো ছিল, আজকের বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে একই বাঁধা ও সীমাবদ্ধতার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, শ্রী অরবিন্দ প্রমুখ এই বাঁধাগুলো অতিক্রমের জন্য ভারতবাসীকে সাহসী আর উদ্যমী করে তোলেন। তখনও গোঁড়াপন্থি হিন্দুরা এঁদেরকে ধর্ম বিদ্বেষী অথবা ‘এথিস্ট’ বলে একঘরে করার চেস্টা করেছিল। আজ যেমনটি দেখা যায় শাহবাগীদের ক্ষেত্রে। শাহবাগের উদ্যাম তারুণ্যকে এরা গাঁজাখোর, ধর্ম বিদ্বেষী ইত্যাদি নানা অভিধায়ে ভূষিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! কায়েমী স্বার্থবাদী একাত্তরের পরাজিত রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে সমাজের উচ্ছিষ্টভোজী পীর ফকির’রাও হাত মেলাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই!

হিন্দু সমাজের সতীদাহ, বাল্য বিবাহ, বর্ণ প্রথা, ছুঁতমার্গ, বর্ণ বিদ্বেষ দূর করার কাজে রাজা রাম মোহন’রা ধর্মকে বিসর্জন দেননি। বরং উপনিষদের মর্মবাণী এরা প্রচার করেছেন সকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে! এরা প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্থাৎ উপনিবেশের গণ্ডিতে থেকেই উপনিবেশের মূলে আঘাত করেছেন। হিন্দু ধর্ম আজ যতটা কুসংস্কার মুক্ত হয়েছে, তা এদের কল্যাণেই। এদের স্নেহ ছায়ায় বড় হয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, নেহরুরা।

এরা বলেছিলেন- বহু দেবদেবী নয়, এক ঈশ্বর। এরা আরও প্রচার করেছেন- ঈশ্বরের উপাসনায় কোন মসজিদ-মন্দির কিংবা সময় বেঁধে দেয়ার প্রয়োজন নেই! দুর্ভাগ্যবশত ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁ মুসলমান সমাজে সামান্যই প্রভাব ফেলেছিল। তাই মুসলমানদের অন্ধত্ব, কুসংস্কার আর কূপমণ্ডূকতা পরিহারে শাহবাগীদের এই আন্দোলন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

জাগরণ কেন জরুরি?

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরিণতিতে আমরা পেয়েছি কবি শামসুর রাহমান, কবি রফিক আজাদ, আল মাহমুদ এবং নির্মলেন্দু গুণকে। চিত্রকলায় আমরা পেয়েছি জয়নুল আবেদীন, মর্তুজা বশির, হামিদুর রহমানসহ অনেককে। সাহিত্যে আমরা পেয়েছি আবুল ফজল, আহমেদ শরীফ, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আজাদসহ অনেককে। কিন্তু ১৯৭১-এ ক্ষমার সুযোগে এরা ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজের প্রগতিকামী আমাদের প্রতিটি কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকরের টুঁটি চেপে ধরার দুঃসাহস দেখিয়েছে। হত্যা করেছে হুমায়ুন আজাদের মতো মানবতাবাদী সাহিত্যিককে!

জামায়াতি আলবদর এবং তাদের বংশবদ শিবির আমাদের প্রতিটি কবি, সাহিত্যিক উপনাস্যিককে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে বৃহত্তর পরিধি থেকে একঘরে করে দিয়েছিল। এরা পৌঁছুতে পারতেন গ্রাম বাংলার ঘরে-ঘরে। নিরন্ন কূটিরের বাঙালী মুসলমানকেও দিতে পারতেন আলোর দিশা, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির দিগমন্ত্র। অথচ এরা কেবল বিচরণ করেছেন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আজকের তরুণ প্রজন্ম সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করেছেন সমাজের উন্নয়ন এবং প্রগতির শত্রু আসলে কারা? কিছু শিক্ষিত জ্ঞানপাপী তারুণ্যের এই জোয়ারের বিরোধিতা করবে এটাই স্বাভাবিক। তারপরও এই জাগরণ আজ অবশ্যম্ভাবী। এবং সুনামির মতো জাগরণ ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সব অজ্ঞানতা আর কূপমণ্ডুকতার দেয়ালকে। এর ব্যাপ্তিও হবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা থেকে সিন্ধু অব্দি!

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরিণামে বাঙালী মুসলমানের যে জাগরণ শুরু হয়েছিল, এর হাত ধরে আমরা পেয়েছিলাম জ্ঞান তাপস ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ডঃ কুদরত-ই-খুদা’র মতো বিজ্ঞানীকে। এরপর আর কোন বিজ্ঞানীর মুখ আমরা দেখিনি কেবল ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির কারনে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থে লালিত-পালিত রাজাকার-আলবদররা আমাদের সমাজ ও জনজীবনকে করে দিয়েছিল জ্ঞান বিমুখ এবং পরনির্ভর! রাজনীতিতেও এনে দিয়েছে দুর্নীতি, অসততা আর সর্বগ্রাসীতা! অথচ উনবিংশ শতকের বাংলার রেনেসাঁ হিন্দু সমাজে এনে দিয়েছিল জগজিৎ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, মেঘনাদ সাহা’র মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বাঙালী বিজ্ঞানীকে!

মুখ পানে তাকিয়ে

আমরা তাই মুখ পানে তাকিয়ে আছি সে সব বীর বাঙালী তরুণদের। এই শাহবাগীরা, এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের নিয়ে যাবে গন্তব্যে! এরা টেনে হিঁচড়ে বের করে আনবে সে সব নরপশুদের! যারা সভ্যতা ও নির্মাণের গতি টেনে ধরেছে! যারা আমার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর সব মানবিক উদ্যোগকে ধর্মের অপব্যাখ্যায় কালিমালিপ্ত করে রেখেছে!

ইতিহাস কখনো পেছনে ধাবিত হয় না। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কখনো দেখা যায়। আবার এই পুনরাবৃত্তি কখনো একই রকমের হয় না। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি দার্শনিক এঙ্গেলস তার বন্ধু প্রতিম কার্ল মার্ক্সকে লেখা একটি পত্রে লিখেছিলেন ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে। জবাবে মার্ক্স লিখেছেন, হ্যাঁ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কখনো দেখা যায়। তবে প্রথমবার ট্র্যাজেডি হলে পরবর্তী বার এটি হয় প্রহসন (ফার্স)!

নিউইয়র্ক, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩