ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

বেশ আগে প্রফেসর ইউনূস নিয়ে একটি লেখায় তুমুল বিতর্ক চলছিল আমার সঙ্গে অনেকের। অনেকে আমার অবস্থানকে সমর্থন করছিলেন। আবার অনেকে বলছিলেন বৃথাই আমি সময়ের অপচয় করছি ইউনূস সাহেবের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে! আসলে বিতর্ক উস্কে দিয়ে আমি বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। আর দেশে অনুপস্থিতির কারনে আমার জানা, উপলব্ধি এবং তথ্যগত সীমাবদ্ধতাও পুষিয়ে নিচ্ছিলাম পাঠকের মন্তব্য পেয়ে।

প্রফেসর ইউনূসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় মুখর ছিলেন জাহেদ-উর-রহমান নামের একজন ব্লগার (ডাঃ জাহেদ)। জাহেদ এখন যেমনটা নিয়মিত হয়েছেন, তখনও ছিলেন তেমনি। তার পাঠক নেটওয়ার্কও যথেস্ট শক্তিশালী। তার মন্তব্যের জবাবে আমি কটাক্ষ করে বলেছিলাম- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে!’ আমি উপলব্ধি করেছি আমার এ পালটা মন্তব্য পেয়ে জাহেদ যথেষ্ট মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন। এর জবাবে জাহেদ লিখেছিলেন- ‘এই যে ব্লগ লিখছি, এটা কি কাজ নয়?’ আমি জানি- এটা সত্যিই কাজের কাজ। কিন্তু সেদিন আমি আর কথা বাড়াইনি। হ্যাঁ, পরে আমি হাড়কষ্ট পেয়েছি- তরুণ ব্লগারটিকে যথেষ্ট তিরস্কার করেছি বলে।

তারপর জাহেদের মাস তিনেকের অনুপস্থিতি। আমার কষ্টের মাত্রা বাড়লেও আকাশের ঠিকানায় চিঠি দেয়ার সুযোগ নেই! দেখলাম, আমি নিজেই আমার অজান্তে তার লেখার ভক্ত ছিলাম। যেমন আমি অনেকের লেখা মনোযোগে পড়ি। নাম বলতেই হয়- যেমন দীর্ঘ তুষার ঘুমে যাওয়া পাগল মন, অথবা আকাশের তারাগুলি, নাহুয়ান মিথ ইত্যাদি নামের ব্লগারের লেখা। আর এখন যারা লিখছেন, তারা তো আছেনই। প্রায় সবার লেখা পড়ি। কিন্তু সব বিষয়ে মন্তব্য ছোঁড়ার সুযোগ হয় না। এটা একান্তই আমার জানা-বোঝার সীমাবদ্ধতা!

ইতোমধ্যে ব্লগার কমিউনিটি হয়েছে। সাগর-রুনি নিয়ে ব্লগাররা মাঠে নেমেছেন। আবু সুফিয়ান কমিউনিটি ব্লগিং-এ আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়েছেন। ব্লগিং-এ আস্তিক-নাস্তিক প্রসঙ্গে প্রায়ই বাতাস ভারি হয়। আবার হালকা হয়ে যায়। নিজ-নিজ দর্শনকে আলগে রেখেও ব্লগাররা আবার আড্ডা কিংবা সিরিয়াস আলোচনায় মিলিত হন। এটাই তো হওয়া উচিত। এসব আড্ডায় থাকতে না পারলেও নিজেকে তাদের একজনই মনে হয়! তারুণ্যের হাওয়া গায়ে মাখতে কার না ভাল লাগে!

জানতাম- আরো দশ-বারোটি ব্লগ আছে, যেখানটায় অনেকে লেখেন। এবং সে সব ব্লগের পাঠক সংখ্যাও অনেক বেশি। তা হউক। এখানে আছি, থাকি। জীবনে এক জায়গায় চাকরির অভ্যাস কম, রাজিব হায়দারের মতো। তথাপি এখানে অনেকের সঙ্গে মেলামেশা হয়ে গেছে। আর সব জায়গায় যে ‘রেজুমি’ গ্রান্টেড হবে এর নিশ্চয়তা কই? এখানে তো এখন মাঝে মাঝে ধমকও দেই। কিন্তু অন্য জায়গায় গেলে তো ‘মিউ মিউ’ দিয়ে শুরু করতে হবে! অফিসের পুরনো কর্মচারি যেমন নতুন বস পেলে প্রথম দিনই শুনিয়ে দেয়- ‘স্যার পুরান চাউল ভাতে বাড়ে’!

যাই হউক, লিখে যে কিছু একটা হয় তা জানিয়ে দিয়ে গেল শাহবাগ। আর জানিয়ে দিয়ে গেল রাজিব হায়দার এবং তরিকুল ইসলাম শান্ত। এরা এই প্রজন্মের নেতা, পথ প্রদর্শক। জাতিকে আলোড়িত করে দিয়ে গেল। সেদিন আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্টে ঢুঁ মেরে বাংলাদেশ টাইপ করতেই বেড়িয়ে এলো এক গাদা সংবাদ-চিত্র। সবই শাহবাগকে নিয়ে। ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশ প্রসঙ্গ!

শাহবাগের ঘটনা নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্নার একটি লেখা পড়লাম দু’দিন আগে। তিনি বেশ আশ্চর্যান্বিত! কি করে তরুনরা এটা পারলো! আমি কখনো আশ্চর্য হইনি। কারন তরুনরাই তো পারবে। সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস, আর স্বৈরাচার, সমাজের এসব দুষ্ট ক্ষতের বিরুদ্ধে তরুণরাই তো জাগবে! তারাই তো দিগমন্ত্র দেবে! কারন তরুনরা এটা করে কোন পুরস্কারের আশায় নয়! ক্ষমতার জন্যে তো নয়ই!

স্যার খেতাব নিয়ে, দু-চারটি পিএইচডি মাথায় নিয়ে, নোবেল, ম্যাগ সাঁই সাঁই, অস্কার, গ্র্যামি এসব গলায় ঝুলিয়ে কি লাভ যদি তা মানুষের কোনই কাজে না আসে? তারচেয়ে বরং গলির মুখে দাঁড়িয়ে সেই দূরন্ত কিশোরটিকে দু’টি ভালো কথা শোনানোও অনেক বড় কাজ!

নিউইয়র্ক, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩