ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ছবিটি ১৯৭১ সালে যশোরের রণাঙ্গণ থেকে তোলা

ভোলা মন আমার! অবশ্য মানুষ মাত্রেই ভূলো মন। মেমোরিতে জায়গা কম। অনেক কিছুই ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, কিছু ভাষা, কিছু গান, কিছু কবিতা, কিছু শ্লোগান মেমোরিতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। কিছুতেই মুছে ফেলা যায় না। যখন সুযোগ পায় জেগে উঠে।

যেমন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। পাওয়া-না পাওয়ার বেদনায় সর্বক্ষণ সংগ্রাম করে। যখনই ভোরের আলো দেখে, তখনই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে জানিয়ে দেবে তার অস্তিত্ব! গত ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ‘শাহবাগ’ আমার কাছে ভোরের সূর্যের মতো। আমার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার। মুক্তিযুদ্ধের ঘাত প্রতিঘাতে বেড়ে ওঠা আমার প্রজন্ম আজ সব দায় বুঝিয়ে দিতে চায় নতুন প্রজন্মের কাছে। বিকশিত এই নতুন প্রজন্মের শক্তি আর উদ্যামের কাছে সঁপে দিতে চায় নেতৃত্বের সব দায়ভার!

অথচ, এদিকে দেখি শাহবাগের অস্তিত্বকে খাটো করতে একটি পক্ষ উঠে পড়ে লেগেছে। তারা বলছে- শাহবাগ নাস্তিক, অনুগত, দেউলে, বিজাতীয়, বিধর্মী ইত্যাদি! তারা সহজে মেনে নিতে পারছে না শাহবাগের আবাহন! কেন তাদের এই তৎপরতা? কেন তারা মসজিদ থেকে দল বেঁধে ছুটে আসে শাহবাগকে গুড়িয়ে দিতে? শাহবাগ তাদের কী এমন ক্ষতি করেছে?

মনে পড়ে আজ থেকে প্রায় তেত্রিশ বছর আগে, ১৯৭৮-৭৯ সাল। আমাদের ছোট্ট শহর হবিগঞ্জে শিশুদের একমাত্র ক্রীড়া উদ্যান ‘চিলড্রেন পার্ক’। এক চিলতে এই পার্কটিতে এক সন্ধ্যায় ইসলামী জলসার নামে বক্তৃতা করতে এসেছেন আমাদের ‘সাড়ে সাত ইঞ্চি’ দেলোয়ার হুসেইন সাঈদী এবং আবুল কালাম আযাদ। উভয়ে তখনই মওলানা টাইটেল লাগাতে শুরু করেছেন।

১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী রাজাকারের বাংলাদেশ। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন সারা দেশ ঘুরে মানুষকে ‘পায়বন্দ’ বানাতে! তখন এরা মনের সুখে কোরআনের কয়েকটি মুখস্ত আয়াত তরজমার পাশাপাশি মানুষকে স্বাধীনতা বিরোধী ভাবাদর্শে উজ্জিবিত করতে লাগলেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করলেন শেখ মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা, সংখ্যালঘু হিন্দু আর আওয়ামী লীগকে। মানুষ ভুলতে বসলো স্বাধীনতার অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা। মুক্তিযুদ্ধের মহান প্রেরণা- সব নাগরিকের জন্য সাম্য, তথা সমান সুযোগ-সুবিধার কথা! ইসলাম ধর্মের বাতাবরণে একটি গোষ্ঠী পথ খুঁজে পেলো সুযোগে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার। আর বাদ বাকি ৯৯ ভাগ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের কলা মুখে পুড়েই শান্ত থাকার চেষ্টা করলো। এই সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনে রাস্টের উদাসীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা চরমে পৌঁছল।

আমি তখন স্কুলের ছাত্র। আমিও সন্ধ্যার নামাজের পর গেলাম চিলড্রেন পার্কে। দেখলাম বেশ কয়েকটি আন্তঃজেলা বাস ভর্তি হয়ে লোকজন এসেছে সমাবেশে। নিয়ন আলোয় উদ্ভাসিত চিলড্রেন পার্ক যেন উপচে পড়ছে মানুষে! আমাদের শহরের আঠারো-কুড়ি বয়সের ইমরান ভাই মাথায় টুপি পরে আরো জনা পনেরো তরুণ-যুবকসহ মাঠের দেয়ালের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘বয়ান’ শুনছিলেন। যেই না সাঈদী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কথা বলা শুরু করলো, ওমনি শ্লোগান তুললেন ইমরান ভাই। তার পুরো নাম আজও মনে করতে পারছি- চৌধুরী ইমরান নূর। না আমার আত্মীয় নয় মোটেও। তবে তার বাবাও ছিলেন একজন পাকিস্তান পছন্দ লোক!

সেদিনের সেই শ্লোগান ছিল- ‘দেলোয়ার হুসেন সাঈদী, বাংলার ইহুদী; সাঈদী-আযাদ রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়!’ জনা পনেরো তরুণ জোয়ানের শ্লোগান যেন কামানের গর্জনের মতো শোনা গেল। মুহূর্তে মাঠ খালি হয়ে গেল। সাঈদী-আযাদকে পুলিশ পাহাড়ায় বাসে তোলে দেয়া হলো। আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। সাড়ে সাত ইঞ্চি সাঈদী এবং আযাদ যে মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তা পুরোপুরি সাঙ্গ করার আগে ইমরান’রা আবার শ্লোগান তুললো। এই শ্লোগান সেই শ্লোগান নয়!

শাহবাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের উদেশ্য কি?

অপপ্রচারের উদ্দেশ্য খুঁজতে গেলে যেতে হবে পেছনে। ১৯৪১ সালে আবুল আলা মদুদি’র নেতৃত্বে জামাতে ইসলামী গঠিত হলে দলটি পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করতে থাকে। তাদের অভিমত ছিল- মুসলিম লীগ যথেষ্ট ‘ইসলামী’ নয়। এদের নেতৃত্বে পাকিস্তান কখনো নিরাপদ হবে না। অতঃপর যখন পাকিস্তান সৃষ্টি হলো মদুদি দাবি করতে থাকেন- পাকিস্তানকে ইসলামী রাস্ট্রে পরিণত করতে হবে। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মদুদি জামায়াতের আমীর ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়ও মদুদি এর বিরোধিতা করেন। এবং পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী সরাসরি পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে স্বাধীনতাকামী বাঙালীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই মদুদির জায়গা কিন্তু পাকিস্তানেও হলো না।

হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এবং সাহাবীদের সম্পর্কে কটুক্তির কারনে মুসলিম রাস্ট্র হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান তার মতবাদ ও রাজনীতিকে গ্রহণ করেনি! আর ব্যক্তি জীবনে মদুদি নিজের সন্তানদের মাওলানা বা ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে গড়ে তোলেননি। এদেরকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। ১৯৭৯ সালে নিউইয়র্কের বাফেলো’তে ডাক্তার সন্তানের বাড়িতে চিকিতসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জামায়াতে ইসলামী নিঃসন্দেহে একটি সংগঠিত দল। কিন্তু দলটি জন্মলগ্ন থেকে ধার্মিক মুসলমানদের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত।

পাশ্চাত্য এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে উতসাহিত করে এরা ইসলামকে সাম্য ও প্রগতির পথ থেকে দূরে সরিয়ে ঠেলে দিয়েছে গহবরে। ইসলামের মনগড়া ব্যাখ্যায় এরা ইসলামের যতটা ক্ষতি করেছে, তেমন ক্ষতি মুশরিকরাও করতে পারেনি। অথচ যারাই এদের সমালোচনা করেছেন, তারাই এদের কোপানলে পড়ে ইসলাম বিদ্বেষী অথবা মুরিতাদ, নাস্তিক খেতাব পেয়েছেন।

একজন সামান্য ব্লগার রাজিবকে জবাই করে এর নামে ছড়িয়ে দিল নাস্তিকতার অপবাদ। এর যে লেখাটিকে এরা ফেইসবুকে এবং পত্রিকায় ছাপিয়ে মানুষকে উস্কে দিয়েছে, সে লেখাটি আমি পড়েছি। সেটি কোন মৌলিক লেখা ছিল না। বাংলাদেশে প্রকাশিত একটি বই থেকে হুবহু লেখাটিকে উদ্ধৃত করে তার নামে চালিয়ে দিয়েছে! এদের অপপ্রচারের জালে কেউ কেউ যে ধরা দেবে না তা নয়। তবে প্রচার যত স্থায়ী হয়, অপপ্রচার ততটা হয় না। এটাই শাশ্বত সত্য!

কেউ কেউ ভুলে!

অতীত দিনের স্মৃতি কেউ ভুলে, কেউ ভুলে না। আমার মেজো বোনটি মুক্তিযুদ্ধের সময় অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। তার পরের বোনটি সপ্তম শ্রেণীর। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে ‘গদা রাইফেল’ নিয়ে ট্রেনিং দিয়েছে। তাদেরকে যিনি ট্রেনিং দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন শহরের সবচেয়ে খ্যাতনামা মৌলানা সাহেবের ছেলে আব্দাল ভাই। আমি শিশু হলেও সেদিন আমার বোনদের লেফট-রাইট করা দেখে বাড়িতে আমিও এসে তা অনুকরণ করেছিলাম।

সেদিন কথা বলার সময় আমার মেজো বোনটি প্রথমেই আমাকে তিরস্কার করা শুরু করলো- ‘ধুর, শাহবাগের এই পোলারা সব নাস্তিক’। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এসব তুমি কোথায় পেলে? উত্তরে বললো- কেন, আমি এর লেখা ফেইসবুকে, ব্লগে পড়েছি। আমি পালটা জিজ্ঞেস করলাম, ওর সব লেখার সঙ্গে আমিও একমত নই। কিন্তু এর সঙ্গে শাহবাগের আন্দোলনের কি হলো? আর ওর তো ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে, তাই নয় কি? এছাড়া মানুষের চিন্তা দর্শন কি সব সময় এক রকম থাকে? তারুণ্যে যা ভাবে ও করে, যৌবনে তা বদলায়, বার্ধক্যে তা আমূল পালটে যায়! কে জানে, ভবিষ্যতে ছেলেটি হয়তো বড় ইসলামী চিন্তাবিদও হতে পারতো! আমার বোনকে বললাম- তুমি কি পীরানে পীর আবদুল কাদের জিলানীর কথা ভুলে গেছো? ডাকাত সর্দার থেকে হয়ে গেলেন দরবেশ-ফকির!

বোনটিকে দমানো যায় না কিছুতেই। তারপর রগে ধরে টান দিলাম। তার অতীতের ঢাকনা সরাতে লাগলাম। জিজ্ঞেস করলাম- তুমি কি ভুলে গেছো গদা রাইফেল হাতে তোমার মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং-এর কথা? সেদিন আব্দাল ভাই তোমাদের কি শিক্ষা দিয়েছিল? তখন আমার বোনটি তার অতীতকে ছাইপাশ থেকে টেনে তুলতে চেষ্টা করলো। বলে- হ্যা-হ্যা, আব্দাল ভাই বলেছিল, আর কিছু না পারলে একটি ঢিল ছুঁড়ে হলেও রাজাকার-আলবদদের খতম করতে!

এরও মাস ছয়েক আগে আমার সেজো ভাইকে টেলিফোন করেছিলাম। তিনি ছিলেন ১৯৭২-৭৩ সালে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্র লীগের সেক্রেটারী। প্রায় দুই দশক সৌদী আরবে কাটানোর পর তিনি তার অতীতকে মরুভূমিতে কবর দিয়ে এসেছেন। তখন সাঈদীর সাক্ষী সাবুদের জেরা চলছে। হঠাত আমাকে বলে বসলো- জানিস, পুলিশ দেখেছে ফজরের নামাজের সময় সাঈদী সাহেবের পেছনে নাকি ফেরেশতারা এসে নামাজ পড়ে! আমি আকাশ থেকে পড়লাম, এ কি কথা? জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এসব কোথায় পেলে? ভাইটি জানালেন- এসব পত্রিকায় উঠেছে। হ্যাঁ, পত্রিকায় তা হলে এসব গাঁজাখুরি কাহিনীও আজকাল ছাপা হচ্ছে! বললাম, পত্রিকায় যে সাড়ে সাত ইঞ্চির কাহিনী ছাপা হয়েছে, এটা দ্যাখোনি?

উপরে যে দু’টো ঘটনার কথা বললাম, এসবই বাংলাদেশের বাস্তবতা। চিন্তায়, কর্মে, সৃষ্টিশীলতায় পশ্চাদপদ বাংলাদেশকে আজ টেনে তুলবে এখনকার তরুণ প্রজন্ম। এই প্রজন্মের সঙ্গে আমি আছি রাত জেগে। কেউ ভুলে, কেউ সন্দিহান, বীতশ্রদ্ধ হয়। আমি ভুলবোনা। আমার জন্ম যদি সত্য হয়, আমার অস্তিত্ব যদি নড়বড়ে না হয়, আমি অন্তত ভুলবো না। যারা আমাদের পাড়ার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মামুন ভাইকে বেয়নটের খোচায় হত্যা করেছে, যারা অগণিত মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করেছে, বাংলাদেশকে শ্মশানে পরিণত করেছে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি তাদের পেতেই হবে। বাংলাদেশের আজকের পশ্চাদপদতা, শোষণ, গরীব মানুষকে ফতোয়া দিয়ে হত্যা এবং ধর্মের নামে ভণ্ডামির পরিণাম তাদেরকে ভোগ করতেই হবে! এটিই বাংলাদেশের দ্বিতীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ। এ মুক্তি সংগ্রামের মন্ত্রে যদি আমার ঘুম ভাঙ্গে, আমি তাতে সাড়া দিতে পেরে গৌরবান্বিত!

নিউইয়র্ক, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩