ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

মনোজগতের স্বাধীনতা

মনোজগতে উপনিবেশ নামে মফিদুল হকের লেখা একটি বই পড়েছিলাম আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে। প্রায় বছর কুড়ি আগে প্রেসক্লাব চত্বরে ঠাট্টাছলে এক বন্ধু বলেছিলেন ‘বিবাহ’ নামক বিষয়টাও মনোজগতে উপনিবেশের মতো। জীবনের এই বাঁকে এসে দেখি ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা তার পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিকতার অধীন। আর সব বিশ্বাস ও উপলব্ধির মতো স্বাধীনতাও রঙ বদলায়! মানুষ নিজের মতো করে স্বাধীনতার সংজ্ঞা উপস্থাপন করে! রাস্ট্র নামক সংস্থাটি ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে পুলিশের ছড়ি ঘুরিয়ে কত নির্মমভাবে যে নিয়ন্ত্রণ করে তা এই যুক্তরাষ্ট্রে না এলে হয়তো আমার অজানাই থেকে যেত। সমাজ আর সমস্টির সার্থে আমরা ফ্রীডমকে বলি দিয়েছি, যতই আমরা এর পক্ষে তালি বাজাই না কেন!

এখন আসি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে। রাষ্ট্রটি গত তেতাল্লিশ বছরে যতটা সাবলম্বি হয়েছে, তা সম্ভব হয়েছে নাগরিকদের অর্থনৈতিক সাচ্ছন্দ্য ও ত্যাগের বিনিময়ে। একটি তলাবিহীন ঝুড়ির দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশ বার বার স্বাধীনতা হারানোর হুমকিতে থেকে থেকে এক পর্যায়ে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখেছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই হুমকি যে তার আজন্মের শত্রু পাকিস্তানের তরফ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে তা নয়। ভারত নামক এক সর্বভূক প্রতিবেশিও বাঙালীর মনোজগতে সৃষ্টি করেছে স্বাধীনতা হরণের আতঙ্ক। দূরের শত্রুতা ও বিদ্বেষকে চিহ্নিত করা যায় সহজেই। কিন্তু নিকটের শত্রুতাকে চিহ্নিত করা একটু কঠিন। অবশ্য ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ এতো মহাভারতেরই শিক্ষা!

মানুষকে স্বাধীনতাহীন করে রাখার যতগুলো প্রপঞ্চ আছে, তার অন্যতম অর্থনীতি। এটা বুঝার জন্য মার্ক্সবাদ পড়ার দরকার পড়ে না। গত তেতাল্লিশ বছরের চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে বাঙালী বুঝতে শিখেছে কিভাবে সাবলম্বি হওয়া যায়। এজন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে কতগুলো এনজিও’র ভূমিকা এবং বাঙালীর বিদেশ মুখীনতা অবদান রেখেছে সবচেয়ে বেশি। আজ যেসব সামাজিক সূচকের উর্ধগামিতাকে বুক ফুলিয়ে উচ্চারণ করা হয়- তার মূলে ছিল এনজিওগুলোর অবদান। আর কৃষিতে যে উৎপাদন ও কর্ম চাঞ্চল্যের জোয়ার এসেছে, তার মূলেও আছে এনজিও এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রণোদনা। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইত্যাদি দেশ থেকে কেবল পেট্রোডলারই আসেনি, এসেছে শ্রমে ঘামে অর্থ উপার্জনের মন্ত্রণা। চিরকালের ক্লিষ্ট বাঙালী দারিদ্রের জাল ছিন্ন করার মন্ত্র শিখে ফেলেছে। ১৯৭১ সালে ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জনের এটাই সবচেয়ে বড় তাতপর্য!

পরাক্রমশালী ভারত ও পাকিস্তানের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো এই দারিদ্রের জাল ছিন্ন করতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশ কতোটা পেরেছে, দীন-হীন করিমুদ্দী রহিমুদ্দী’রা কতোটা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে শিখেছে? সে সম্পর্কে পশ্চিম বঙ্গের প্রয়াত বামপন্থী নেতা জ্যোতি বসুর একটি মন্তব্য আমি এখনো ভুলতে পারিনি। খুব সম্ভব ১৯৯৭ সালে নারায়নগঞ্জের বারদি গ্রামে শেষ বারের মতো পৈত্রিক ভিটেয় এসেছিলেন জ্যোতি। সেখানে এক বিশাল জনসভায় বলেছিলেন- বাংলাদেশকে রুখে দাড়াবার শক্তি পৃথিবীর কারও নেই। কারন বাংলাদেশ সকল জঞ্জাল পায়ে মাড়িয়ে দাঁড়াতে শিখেছে। তার নমুনা কেমন? তিনি বলেছিলেন- বাংলাদেশে কাদামাটি মাখা কোনো কৃষক ক্ষেতমজুর যখন বাসে উঠে, তখন সে ভীড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু ভারতে কিংবা পশিম বঙ্গে এখনো কোনো কৃষক ক্ষেতমজুর বাসে চড়লে জড়সড় হয়ে পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঋদ্ধ এই রাজনীতিক বলেছিলেন, এখানেই ভারত এবং বাংলাদেশের মানুষের পার্থক্য। ১৯৯৭ থেকে ২০১৪, সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের মানুষ এগিয়েছে তারচেয়েও দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতের এই স্বাধীনতাই তাকে ব্যতিক্রমি করে রেখেছে পুরো ভারতবর্ষে।

আমার এই লেখাটি এ পর্যায়ে এসেই শেষ করার কথা। কিন্তু দুর্ভাবনা তাড়া করে। বাংলাদেশ কি এই স্বাধীনতা হারাতে বসেছে? সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও পরিবেশের সার্বভৌমত্ত রক্ষায় বাংলাদেশ কি ক্রমেই ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে? আজ যখন বাংলাদেশের চলচিত্র মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনা, নবীনের সৃজনশীলতাকে লালন করার পরিবর্তে যখন তার ঘারে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ব্যর্থতার বোঝা, তখন কি স্বাধীনতা বিপণ্ন হয় না? চিরায়ত বাঙালী সংস্কৃতির উপর যখন ভারতীয় উচ্ছিষ্ট মুম্বাই সংস্কৃতি দাপিয়ে বেড়ায় তখন কি স্বাধীনতা বিপণ্ণ হওয়ার আলামত চোখে পড়ে না? বাংলাদেশকে ইথিওপিয়া, সুদান বানাবার ষড়যন্ত্রে যখন সবগুলো নদীর উৎসে ভারত বাঁধ দিয়ে পানি শোষণের আয়োজন করে তখন কি স্বাধীনতা বিপণ্ণ হয় না?

আমরা জানি- ভারতের অন্তর্গত হায়দরাবাদ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পরও এক বছর স্বাধীন ছিল। কাশ্মীরও প্রায় স্বাধীন রাজ্যই ছিল। এই কিছুদিন আগেও সিকিম একটি স্বাধীন রাস্ট্র ছিল। তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আজ কেবল ইতিহাস! এই সময়ের ক্রিমিয়াও ছিল স্বাধীন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। কিন্তু মানুষ যখন মনোজগতের স্বাধীনতা হারায়, তখন বাকি সব স্বাধীনতা বিলীন হয়ে যায় কালের গর্ভে। আমরা যেন আমাদের এই মনোজগতের স্বাধীনতাকে কখনো না হারাই।

নিউইয়র্ক, ২২ মার্চ ২০১৪