ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মধ্যবিত্তের সংসারে আমাদের কোনদিন প্রতিক্রিয়া বাসা বাঁধতে পারেনি। স্বাধীনতার জন্যে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জীবনে যে প্রস্তুতি দরকার তার ষোল আনাই ছিল আমাদের নয় ভাইবোনের পরিবারে। কেউ রাজনীতিতে, কেউ খেলাধুলায়, কেউবা কবিতা-গানে-সাহিত্যে। বঙ্গবন্ধু আর মৌলানা ভাসানী নিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে ভাইবোনদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হত। একাত্তরের প্রথম দিনগুলোতে আমাদের অন্তত তিনটি ভাইবোন রাইফেল হাতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল, কিন্তু তাদের আর যুদ্ধে যাওয়া হয়নি।

যুদ্ধের সময় আমরা পালিয়ে বাঁচলাম শ্রীমঙ্গলের প্রত্যন্ত কোনো চা বাগানে। যুদ্ধ শেষ হলে আমরা ফিরে এলাম। বাবার একমাত্র রুজির কায়ক্লেশের সংসারে আনন্দ-ফূর্তির ঘাটতি ছিল না। একুশে, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে আমাদের বাড়ি অন্যরকম ভাবে জেগে উঠত। কবি-সাহিত্যিকের আনাগোনা ছাড়াও গান-বাজনার রিহার্সেল বসত। নিছক বাঙালী ঘরানার এই বাড়িটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ভেতর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। বাড়ির প্রতিটি যুবক-যুবতী খেই হারালো সব কর্মকাণ্ডে, যেমনটা পথ হারালো বাংলাদেশ। আমাদের সবাই নিমজ্জিত হল গভীর হতাশায়। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের সব স্বপ্ন। শুধু তাই নয়- চুয়াত্তুরের দুর্ভিক্ষ আর তার পটভূমিতে অর্থনৈতিক দুর্দশা গ্রাস করল আমাদের সব্বাইকে। বাড়ির বড়রা সেই আটাত্তুর-উনসত্তুরে বাঁধা আয়ের চাকরি ফেলে ছুটল মধ্যপ্রাচ্যে।

আমাদের জীবনে অর্থের প্রাচুর্য এলো, কিন্তু বিদেয় নিল সেই সন্ধ্যার গানের জলসা, সাহিত্যের আসর, লিটল ম্যাগাজিন। বোনটি আর গান করে না, ভাইটিও আর তবলা বাজায় না, স্টেডিয়ামে ফুটবল-ক্রিকেট খেলাতেও আর কারো তাড়া নেই! চারদিকে ছন্দপতন, আর হাহাকার। বাঙালী আটপৌরে জীবন-যাপনে এলো রঙ্গিন টেলিভিশন, স্টেরিয়ো ক্যাসেট প্লেয়ার। তার সঙ্গে ইসলামী জীবন-যাপনের আব্রু ভর করতে লাগল। একুশ আসে, স্বাধীনতা-বিজয় দিবস আসে, কিন্তু আমাদের প্রাণে আর ঝঙ্কার তুলে না! এই দেশ, এই ভাষা, এই সংস্কৃতি সবই যেন কেউ কেড়ে নিচ্ছিল আমাদের মানসতন্ত্রী থেকে!

একদিন লক্ষ্য করলাম আমার যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া বোনরা কবিতা লিখত “একুশের কাড়ানাকাড়” শিরোনামে, যে বোনটি নারী অধিকার নিয়ে সাহিত্য রচনা করত, তারাও নীরব ধরাশায়ী হয়ে গেল মৌলবাদের কাছে। বাঙালী মধ্যবিত্ত তার জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলল, যেমনটা হারালাম আমরা, আমাদের পরিবার! ‘৭৫ এর পট পরিবর্তনের পরে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি যেভাবে ক্ষমতার প্রভাব ও পক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাতে ভুলে গিয়েছিলাম এদেশে একদিন রাজাকারদের বিচার হবে। যারা জল্লাদ খানায় নিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল, যারা মা-বোনদের সম্মান হরণ করেছিল- সে ইতিহাস স্মরণ করাও ছিল কস্টের। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটিই হয়ে পড়েছিল বিকৃতি, বিভ্রান্তি আর ধোঁয়ার জালে!

স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পর, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার চল্লিশ বছর পর আজ এক-এক করে একাত্তুরের সেই পরাজিত শক্তির ফাঁসি হচ্ছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও দাঁড়িতে মেহেদী্র রোশনাই মেখে টিভি পর্দায় যেসব রক্ত পিচাশ আমাদেরকে ধর্মের ফতোয়া দিত, আজ তারা ফেরারি!

অনেককেই আজ বলতে শুনি ’শেখ হাসিনা বাপের বেটি’। বঙ্গবন্ধুর কোনো পুত্র সন্তানও হয়ত এততা দৃঢ়তা, সাহস আর কৌশল একত্র করে এমন অসাধ্য সাধন করতে পারত না! অথচ কি আশ্চর্য- বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ও এই বিচারের জন্য এতোটা প্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয় না! কারন টিভি টক’শো গুলোতে সাংবাদিক নুরুল কবীর্ ভাইয়ের মত বহু বুদ্ধিজীবীকেও বলতে শুনেছি যুদ্ধাপরাধী বিচারের পুরো প্রক্রিয়াটিই আওয়ামী লীগের দূরভিসন্ধিমুলক রাজনৈতিক কৌশল! এসব প্রচারণায় আমি সাময়িক স্তম্ভিত হলেও কখনো বিচার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক হইনি। কিন্তু আমি স্থির নিশ্চিত বহু মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে। এবং এই বিভ্রান্তির সুযোগে জামায়াত-বিএনপির মিলিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেশের মানুষকে পুড়িয়ে মারার মত ধৃষ্টতা দেখাতে পেরেছে।

দোষটা আমাদেরও। ‘৭৫-এর পর এদেশে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ক্রমশ বিভক্ত হয়েছে, মুষড়ে পড়েছে দারিদ্র আর পশ্চাদপদতার কষাঘাতে। লক্ষ্য করুন আমার মত যারা ৫০-৬০-৭০ বছরের কোঠায়, তাদের সবার স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ সদা জাগরূক। কিন্তু আমরা কেবল বিচ্ছিন্ন, আশাহত আর বিভ্রান্ত। কিন্তু আমি স্থির নিশ্চিত- আর ক’টি রাজাকারের ফাঁসি হলেই এদেশে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি দ্বিগুণ আশা বুকে বেঁধে দেশ সেবায় নিবিষ্ট হবে। আজ যে আমরা দেখি এই দেশে সেচ্ছাসেবকের অভাব, মানুষ রাজনীতি বিমুখ, এই দুর্দশাও কাটবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ মানেই আওয়ামী লীগ, এমন ভাবনারও অবসান হবে। নিশ্চয় মানুষ পথ হারাবে না। গত কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি ঝড়ের পর ঝরঝরে বাতাস যেমন আমাদের হৃদয়-মন সিক্ত করে, আমরা নতুন ভাবে জেগে উঠি, আজ যেন তেমনিভাবে আমাদের পুনর্জন্ম হতে চলেছে।

 

নিউইয়র্ক, ১০ এপ্রিল ২০১৫